ঘুরে দাঁড়াতে সামনে বহু চ্যালেঞ্জ

কঠোর পদক্ষেপে ক্ষত সারছে অর্থনীতির


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:০৯

॥ উসমান ফারুক ॥
নজিরবিহীন লুটপাট ও সীমাহীন আর্থিক দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত অর্থনীতিকে রেখে পালিয়ে যায় আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকার। পথ হারানো সেই অর্থনীতিকে সামলে নিতে সব ধরনের অনিয়ম বন্ধের পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সংস্থার পরামর্শ দিয়ে সাজানো হয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো। যার সুফল পেয়ে এক বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্যে উন্নতি, ডলারের দর স্থিতিশীল হওয়া ও পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত সম্ভব হয়েছে বিভিন্ন দেশে। পাচার হওয়া অর্থ শনাক্তের মতো ঘটনা পৃথিবীতে বিরল, সেই কাজটি করতে পারছে সরকার। এভাবে নীরবে ঘুণেধরা অর্থনীতির বাঁক বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নতুন বাংলাদেশে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে আগামীর অর্থনীতিকে। ঐতিহাসিক এ ঘটনার সাক্ষী থেকে যাচ্ছে দেশের বর্তমান নাগরিকরা। অর্থনীতির এ কল্যাণমুখী যাত্রা টেকসই করতে চলছে বহুমুখী সংস্কারের পদক্ষেপ। যার প্রভাবে পুঁজিবাজারেও স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন মূলধন হারানো লাখো ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত অরাজনৈতিক সরকারের এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকবে কিনা নির্বাচনের পরে। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনীতি কীভাবে চলবে, সংস্কার অব্যাহত থাকবে কিনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে কিনা, এখনকার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারবে কিনা রাজনৈতিক সরকারের সময়ে- সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জোরালোভাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অপ্রিয় হলেও দেশের কল্যাণ ও জনগণের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিকভাবে না দেখে পতিত সরকারের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেবে রাজনৈতিক দলগুলো। জনগণের জন্য কাজ করবে আগামীর নির্বাচিত সরকার, তাই প্রত্যাশা করেন নাগরিকরা।
লুটপাটকারীরা ফেরত এলে ভেঙে পড়বে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা : রাজনৈতিক ছত্রছায়া না থাকায় আর্থিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হওয়ারা এখন পলাতক জীবনযাপন করছে। এতদিন সামাজিক কাজ করে আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল না তাদের। এ কারণে আর্থিক দুর্নীতি করতে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে সহযোগিতা না পাওয়ায় হুন্ডির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না।
একইভাবে তদবির করে কোনো অনৈতিক সুবিধাও নিতে পারছে না তারা। রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে এসব ব্যক্তির যোগাযোগ থাকে মন্তব্য করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, এখন তো আর্থিক খাত অনেকটা প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারছে। প্রশ্নটা হলো- এ প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নির্বাচনের পর থাকবে কিনা, অতীত অভিজ্ঞতা তো আমাদের ভালো না। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ বিষয়ে কঠোর প্রতিশ্রুতি না দেয়, তাহলে তারা যেকোনোভাবে ফেরত আসার চেষ্টা করবে। এটি যদি হয়, তাহলে হুন্ডি সক্রিয় হবে। টাকা পাচার হবে। টাকা পাচার করা গেলে তখন দুর্নীতি এমনিতেই হবে। এটা আপনি-আমি চাইলেও বন্ধ করতে পারবো না। কারণ দুর্নীতি এখন সিস্টেম হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি হওয়ার কারণেই আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। লাগামহীন অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভ সংকট দেখা দেয়। একসময়ে যে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা তো নেমে গিয়েছিল ১৮ বিলিয়নে। অর্থনীতির এ ফুটোটা তো বন্ধ হয়েছে। সেটি যদি আবার চালু হয়, তাহলে আর্থিক বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।
মাফিয়াদের দখলে যেভাবে সর্বস্বান্ত হয় অর্থনীতি
উন্নয়নের গল্প গেলাতে ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে এসে ২০২১ সাল থেকে হঠাৎ করেই আমদানি কয়েকগুণ বাড়ানো শুরু করে আওয়ামী সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীরা। নামে ব্যবসায়ী হলেও তাদের আয়ের মূল উৎস ছিল লুটপাট ও দুর্নীতি। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার করে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করে আয়েশি বাড়ি বানাতে। এমন নজিরও রয়েছে এক হাজার টাকার পণ্য আমদানিতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করেছে। এভাবে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দুই থেকে তিনশতগুণ বেশি অর্থ পাচার হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ করেছে।
সেই অর্থ চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, অস্ট্রিয়া, ডমেনিকা, গ্রেনেডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, সেন্ট লুসিয়া এবং তুরস্কসহ দ্বীপরাষ্ট্রগুলোয়। পানামা পেপার্সে বহু বাংলাদেশির নাম প্রকাশ হয়েছে।
দুইশত কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ পাচার করেছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা এখন ১০১ জনে দাঁড়িয়েছে। শুধু ৫টি দেশেই ৩৫২ জন পাচার করেছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা পাচারকারীরাই দেশের আর্থিক খাতে মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। গত বছরের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট সরকার ও তাদের দোসরদের পরাজয় হলে দেশ থেকে তারা রাতের আঁধারে পালিয়ে যায় প্রভুদেশ ভারতে। অনেকে চলে যায় ইউরোপের দেশগুলোয়। সেখানে আয়েশি জীবনযাপন করছে তারা।
লুটপাটের প্রমাণ পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ
অর্থ পাচার করতে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ১৫ লাখ কোটি টাকা ধার করা হয়। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও ঋণ করে পাওয়া ডলারের বড় অংশই এখন পাচার হয়ে গেছে। প্রায় পুরো অর্থ ব্যাংক থেকে চলে যাওয়ায় লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের ২৩ ব্যাংক এখন চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না এসব ব্যাংক। এফডিআর ভাঙাতে না পেরে অনেকের চিকিৎসা আটকে গেছে। মেয়ের বিয়ের খরচ ব্যাংক থেকে তুলতে অভিভাবকরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
অর্থ লুটপাট ও পাচারের মতো কাজে মদদ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রত্যক্ষ মদদে পাচার হওয়ায় এখন প্রমাণসহ বেরিয়ে আসছে সব তথ্য। জুলাই বিপ্লবের পর সরকারে নতুন নেতৃত্ব এলে সক্রিয় হয় বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলেজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশের আর্থিক অপরাধ তদন্ত বিভাগ।
তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন দেশে তা পাঠানোর পর যুক্তরাজ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রমাণ, নথিপত্র জমা দেয়ার সরকারের অনুরোধে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত শুরু করে যুক্তরাজ্য। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শেখ রেহানা, টিউলিপ ও সালমান এফ রহমান, নাফিজ শরাফাতের অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এখন বাংলাদেশ আশা করছে খুব দ্রুত এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। এজন্য আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছে সরকার। ভবিষ্যতে অর্থ পাচার ঠেকানো ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের সংস্থার ব্যক্তিদের দেশে আনা হয়েছে। দলটি বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কীভাবে মামলার প্রমাণ সংগ্রহ ও দালিলিক উপস্থাপন করা হয়। আর্থিক লেনদেন আরো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করতে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের।
কঠোর পদক্ষেপে ক্ষত সারছে অর্থনীতির
অর্থ পাচার বন্ধ করার প্রধান হাতিয়ার হুন্ডি বন্ধ করেছে সরকার। এটি করতে কঠোর নীতিতে যেতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে হুন্ডি বন্ধ করা ও প্রবাসীদের সহযোগিতা পাওয়ায় ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এতেই বৈদেশিক বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে শুরু করে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এখন পণ্য আমদানিতে কোনো দেশের কাছে সহায়তা চাওয়া হয় না। দরকষাকষি করে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এতেই জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও ভোগ্যপণ্য সবরাহ এখনো ঠিক রয়েছে। যার ফলে মূল্যস্ফীতিও কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম কমানো ও দ্রুত সময়ের মধ্যে এতবার কমানোর কোনো নজির নেই।
যার ফলে গত চার বছরের বেশি সময় ধরে থাকা ১২ শতাংশের উপরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে পারে সরকার। পণ্য আমদানিতে মূল্য যাচাই-বাছাই শেষে ব্যাংকের পক্ষ থেকে এলসি (ঋণপত্র) খোলার বাধ্যবাধকতা শুরু করে। ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুসরণ করতে বলা হয়। বড় এলসির চাহিদা আসলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।
বেসরকারি খাতের দেড় ডজন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে লুটপাটের সহযোগিতাকারীদের সরিয়ে দেয়া হয়। আর্থিক খাতের মাফিয়াদের ব্যাংক হিসাব তলব, জব্দ ও স্থগিতের মত সাহসী সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কয়েকশত ব্যক্তি ও বড় গ্রুপের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তাদের অর্থের উৎস তদন্তে নামে সরকার।
সেই তালিকায় রয়েছে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, আমলা, অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মচারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর, ছয় ডেপুটি গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান, কয়েকজন এমডি, পুলিশের বর্তমান ও সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মচারী, শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারী এসব গ্রুপ ও ব্যক্তি আর্থিকভাবে সবসময়ই শক্তিশালী। নিজেদের অপরাধ ঢেকে রাখতে প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এ কারণে কোনো রাজনৈতিক সরকারই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সাহস করেনি। বেশিরভাগ সময়েই তাদের সঙ্গে অনৈতিকভাবে সমঝোতা করে চলেছে। এ কারণে কোনো সরকারের সময়েই অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আরেকটি কারণ হলো, আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া বাকিদের সময়ে এরকম নজিরবিহীন লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেনি বাংলাদেশে।
অর্থ পাচার বন্ধ করতে সরকারের ইতোমধ্যে লুটপাটকারীদের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব আটকে রেখেছে। এসব ব্যাংক হিসাব থেকে কোনো টাকা বের করতে পারবে না তারা। অনেকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, দুর্নীতির তদন্ত করছে দুদক।
পুঁজিবাজার থেকে আলোচিত ও প্রকাশ্যে আসা কারসাজি চক্রকে নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও আমূল সংস্কার করার পদক্ষেপ নেয়ায় ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতি। পুঁজিবাজারের সূচকগুলো বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে বাজার মূলধনও। বিনিয়োগকারীরা এখন দুষ্টুচক্রের ভয়াল থাবার ভয় করছেন না।
সামষ্টিক অর্থনীতির ১৯টি সূচকের মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণ ছাড়া সবগুলোই ইতিবাচক অবস্থায় এসেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণ একটু কম হওয়ার প্রকৃত কারণ হচ্ছে, মন্দমানের ঋণ দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকৃত ঋণ আবেদন যাচাই বাছাই শেষে বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। মাফিয়া গ্রুপের যে চেয়েছে সেই ঋণ নিয়েছে। এমনকি কাগজপত্র ছাড়াও ঋণ নেয়ার নজির রয়েছে।
শুধু প্রকৃত ঋণ যাওয়ায় অর্থনীতির চাহিদা মিটে যাচ্ছে। এ কারণে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী ঋণ যাওয়ায় আগের তুলনায় অনুপাত কমে গেছে। আরো বছর দুয়েক পর তুলনামূলক এ চিত্র আরো উন্নত হবে।
রাজনৈতিক সরকার এলে কি থমকে যাবে সংস্কারের এসব উদ্যোগ
নির্বাচন এলেই সবদিকে নগদ টাকার ছড়াছড়ি শুরু হয়ে যায়। রাজনৈতিক কর্মসূচি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক দলের সেই বাড়তি অর্থের বড় অংশ জোগান দেয় ব্যবসায়ী ও অর্থ লোপাটকারীরা। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠন করে অর্থ পাচারকারী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করে। কোনো উদ্যোগ নিলেই তা আটকে দেয় বিভিন্ন তদ্বির করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচারকারীদের নাম পত্রিকায় প্রকাশ পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি শেখ হাসিনার পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে তথ্য সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তিনি। রাজনীতির আড়ালেই সালমান এফ রহমান, সাইফুজ্জামান, টিউলিপ, শেখ রেহানারা অর্থ পাচারের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
সেই দুঃসাধ্য কাজটি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ আকারে বিদেশে উপস্থাপন করা হয়। কে কোন নামে, কত টাকা, কোন দেশে পাচার করেছে, তার একটি খতিয়ানসহ পরিসংখ্যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৈরি করতে পেরেছে। আগামীতে যাতে অর্থ পাচার না হয়, সেজন্য নীতি সংস্কারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছে। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে সেই সংস্কার কার্যক্রম বাজায় রাখবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা বলছেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নুয়ে পড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সঠিক ব্যবস্থাপানার দিকে যাচ্ছে। এখন স্থিতিশীলতা ধরে রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এটি ধরে রাখতে না পারলে মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দর ফের লাগামহীন হয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। আর্থিক খাতের সংস্কারের ধাপগুলো একটি রোডম্যাপ আকারে জনসম্মুখে প্রকাশ করা যেতে পারে। তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে একটি প্রতিশ্রুতি চাইবে দেশের নাগরিকরা। সব রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারে এমন বিষয়গুলোও নির্বাচনী ইশতেহারে আনলে একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও শীর্ষনেতৃত্বে নিয়োগ চূড়ান্ত করার পূর্বে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করলে জনগণ আগাম জানতে পারবে। কারো বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা জানাতে পারবে। সরকার ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন করলে তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। সেই বিবেচনা নিয়ে দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে- যাতে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দল সরকার ক্ষমতায় এলে আর্থিক খাতে একটা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেটি দূর করতে রাজনৈতিক সরকার ও আমলাদের ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার কৌশল বের করার সময় হয়েছে। এ ভারসাম্য আনতে না পারলে আগামীতেও ফিরে আসবে অর্থনীতির পুরনো চ্যালেঞ্জগুলো।