ভারতের শাসকদলের যৌন কেলেঙ্কারি, অভিযোগের তীর মোদি পর্যন্ত
২৮ মার্চ ২০২৬ ২৩:৩৮
মেহেদী হাসান পলাশ
বিশ্ব যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ নিয়ে তোলপাড় ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক যৌন কেলেঙ্কারি অভিযোগে। কেবল অভিযোগ বললে হয়তো কম বলা হয়। কেননা একেবারে তথ্য প্রমাণ সহ একটার পর একটা করে অসংখ্য ঘটনা সামনে আসছে। ঘটনা শুরু হয়েছে মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী জ্যোতিষী ও ধর্মগুরু অশোক খারাটকে দিয়ে। বিজেপির রাজনৈতিক অন্দরমহলের অত্যন্ত প্রভাবশালী এই জ্যোতিষীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মহিলাদের হিপনোটাইজ করে ও নিকটাত্মীয়ের বিপদের ভয় দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন। পুলিশ তার ডেরায় অভিযান চালিয়ে এরকম ৫০ জন মহিলার সাথে যৌন সম্পর্কের ভিডিও উদ্ধার করেছে এবং তাকে আটক করেছে।
একই সময়ে মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন মন্ত্রী নরহরি জিরওয়ালের সাথে একজন ট্রান্সজেন্ডার নারীর যৌন সম্পর্কের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স- ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে তোলপাড় চলছে।
অন্যদিকে গোয়াতে নাবালিকাদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ এবং তার ভিডিয়ো তুলে ব্ল্যাকমেলের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এক বিজেপি নেতার ছেলেকে। ধৃতের নাম সোহম সুশান্ত নায়েক। কুরচোরেম পুরসভার বিজেপি কাউন্সিলার সুশান্ত নায়েকের ছেলে তিনি। অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন নাবালিকা তাঁর লালসার শিকার হয়েছে। যৌন সংসর্গের সময়কার ভিডিয়ো তুলে রাখত ২০ বছরের সোহম। নির্যাতিতাদের মুখ বন্ধ রাখতে সেই ভিডি প্রকাশের ভয় দেখানো হত।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে যৌনতার বিনিময়ে নারীদের সাংসদ ও মন্ত্রী বানানোর অভিযোগ তুলেছেন খোদ বিজেপি নেতা ও সংসদ সদস্য সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সুব্রহ্মণ্যন স্বামী অভিযোগ করেন, কিছু নারী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে রাজনীতিতে উন্নতি করেছেন এবং সাংসদ ও মন্ত্রী হয়েছেন।
এদিকে সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর অভিযোগ সমর্থন করে এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী, মোদীর প্রশস্তি করে বই লেখা এবং মোদীকে গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করা লেখিকা মধু পূর্ণিমা কিশ্বর। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেন, ” এ ঘটনাই প্রমাণ করে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে কেন আমি মোদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতাম।” এসব অভিযোগ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আওয়াজ তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজেপি ও মোদি বিরোধীরা সোচ্চার।
ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে নির্ভরযোগ্য হ্যান্ডেলে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিকে স্বঘোষিত ধর্মগুরু ও জ্যোতিষী অশোক খারাটকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ‘ক্যাপ্টেন’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তিকে ঘিরে ৫৮ মহিলার সাথে যৌন সম্পর্কের ভিডিও প্রকাশসহ একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসায় ভারত জুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৬৭ বছর বয়সী খারাট একসময় মার্চেন্ট নেভির কর্মকর্তা ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি সংখ্যাতত্ত্ব ও জ্যোতিষচর্চার মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। নাসিকের মিরগাঁও এলাকায় ‘শ্রী শিবনিকা সংস্থান ট্রাস্ট’ গড়ে তুলে তিনি একটি বিস্তৃত আধ্যাত্মিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ধীরে ধীরে তাঁর কার্যকলাপের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ বছরে তিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। জমি, ফার্মহাউস ও আবাসন মিলিয়ে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। ধনী ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য তিনি একেকবারে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই ‘আধ্যাত্মিক’ কর্মকাণ্ডের আড়ালেই গুরুতর অপরাধ চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ৩৫ বছর বয়সী এক মহিলা অভিযোগ করেছেন, স্বামীর প্রাণ সংশয়ের ভুয়ো আশঙ্কা দেখিয়ে খারাত তাঁকে নিজের দফতরে ডেকে নিতেন। সেখানে নেশাজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে পানীয় খাইয়ে তাঁকে বারবার ধর্ষণ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নির্যাতন চলেছে। তদন্তে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। একটি পেনড্রাইভ থেকে ৫৮টি ভিডিও উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটিতে মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতনের দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। ফলে আরও একাধিক মহিলা এই চক্রের শিকার হয়েছেন বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মহারাষ্ট্র সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে। এই তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পুণে রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের কমান্ড্যান্ট তেজস্বী সাতপুতে। অশোক খারাটের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে, পাশাপাশি ব্ল্যাক ম্যাজিক বিরোধী আইনেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে, খারাতের সঙ্গে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগাযোগ নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এবং রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন রূপালী চাকনকরের নামও আলোচনায় এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে চাকনকরকে খারাতকে ‘গুরু’ হিসেবে সম্মান জানাতে দেখা গেছে। ঘটনার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সরব হয়েছে এবং রূপালী চাকনকরের পদত্যাগের দাবি তুললে তিনি দায়িত্ব থেকে পর ত্যাগ করেন। পুরো ঘটনাকে ঘিরে অন্ধবিশ্বাস, ক্ষমতার প্রভাব এবং সমাজে তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরুর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম বর্তমান জানিয়েছে, নাবালিকাদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ এবং তার ভিডিয়ো তুলে ব্ল্যাকমেলের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হল এক বিজেপি নেতার ছেলেকে। ধৃতের নাম সোহম সুশান্ত নায়েক। কুরচোরেম পুরসভার বিজেপি কাউন্সিলার সুশান্ত নায়েকের ছেলে তিনি। অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন নাবালিকা তাঁর লালসার শিকার হয়েছে। যৌন সংসর্গের সময়কার ভিডিয়ো তুলে রাখত ২০ বছরের সোহম। নির্যাতিতাদের মুখ বন্ধ রাখতে সেই ভিডিয়ো প্রকাশের ভয় দেখানো হত। এতদিন সোহমের কুকীর্তি নিয়ে কানাঘুষো ছিল। গত সপ্তাহে এক পার্টিতে আকণ্ঠ মদ পান করে মত্ত অবস্থায় বন্ধুদের সেই ভিডিয়োগুলি দেখিয়ে দেয় সে। এরপরেই আগুনে ঘি পড়ে।
গত লোকসভা ভোটের আগেই মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছিল এনডিএ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। জেডিএস-এর বিদায়ী সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেভান্নার লালসার শিকার হয়েছিলেন কয়েকশো মহিলা। তাঁদের যৌন নির্যাতনের ভিডিয়ো পর্যন্ত রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেল করতেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়ার নাতি। কংগ্রেস গোয়ার ঘটনাকে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে দাবি করেছে। যৌন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ওই নেতা প্রজওয়াল রেভান্না। তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার নাতি ও সংসদ সদস্য। রেভান্না দক্ষিণ কর্ণাটক রাজ্যের জনতা দল (ধর্মনিরপেক্ষ) বা জেডি(এস)-এর নেতা। উৎস: দৈনিক ইনকিলাব
অভিযোগের তীর মোদি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ভারতের শাসকদলের যৌন কেলেঙ্কারি