আসছে জামায়াত-বিএনপির ইশতেহার
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে শিগগিরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার প্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে পৃথকভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দলটির চিন্তা ও পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে সম্ভাব্য ইশতেহারে। প্রিন্ট ও ভার্চুয়ালি দেশবাসীর কাছে নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরবে দলটি। দলটির পক্ষ থেকে যা যা করা সম্ভব নয়, নির্বাচনী ইশতেহারে সেসব বিষয়ে জাতির কাছে তুলে ধরবে না জামায়াতে ইসলামী, অর্থাৎ যা যা করতে পারবে, তা-ই তুলে ধরবে দলটি। ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে পারে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে বিএনপিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করতে চারটি বিষয় সামনে রেখেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, দলটির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশন ও জুলাই সনদে দেওয়া বিএনপির ইতিবাচক প্রস্তাবনাগুলোর (নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া) সমন্বয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত হচ্ছে। তবে দলটি ঠিক কবে এ ইশতেহার প্রকাশ করবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তখন তিনি জানিয়েছেন, আগামী দু-একদিনের মধ্যেই ইশতেহার প্রস্তুত করবে তার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তার দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবারের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ১/২ তারিখের দিকে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হতে পারে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, কয়েকদিন আগে ঢাকার একটি হোটেলে জামায়াতে ইসলামী ‘পলিসি সামিট’ করেছে। সেখানে দলটির আগামী দিনে দেশ নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে, তার একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে। এ পলিসি সামিটের সঙ্গে ইশতেহারের একটা মিল থাকবে। তিনি জানান, পলিসি সামিট ছিল প্রায় ৬ হাজার পৃষ্ঠার, আর ইশতেহার হবে ৪০ থেকে ৫০টি পয়েন্টে।
তিনি জানান, সরকারের যে ক’টি মন্ত্রণালয় রয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিয়ে আলাদা আলাদা পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। শর্ট (ছোট) এবং ব্রড (বৃহৎ) আকারে বিভাগভিত্তিক ধারণা দেওয়া হবে। জনগণের কাছে প্রিন্ট ও ভার্চুয়ায়ি দলীয় ইশতেহার তুলে ধরা হবে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আরও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও নারীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে ইশতেহারে। বিনামূল্যে শিক্ষা, মেধাবীদের বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষায় স্পন্সর করার ঘোষণা থাকবে। আর যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন, তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট করতে প্রয়োজনীয় কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে- যাতে শিক্ষাগ্রহণের পর কেউ বেকার না থাকেন।
স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার দেবে জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে রোগীদের যাতে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে না হয়, সেজন্য দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ বিশেষায়িত চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। নাগরিকদের যাতে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে না হয়, এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে, রোগী এবং তার স্বজনরা হয়রানি ও বাড়তি খচর এড়াতে পারবেন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের সব ধরনের ঝামেলা ও জটিলতামুক্ত ব্যবসা করার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এমন কিছুই থাকবে না জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। পলিসি সামিটে বিভিন্ন প্যানেল ডিসকাশনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পলিসি ঘোষণা করা হয়। ওই পলিসি সামিটের সঙ্গে ইশতেহারের সমন্বয় থাকবে।
ঘোষিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’ এ জামায়াতে ইসলামী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। পলিসি সামিটে দলটির ঘোষণায় বলা হয়, ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে)। আগামী ৩ বছরে কোনো শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান করা হবে। ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি করা হবে। সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারী কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা দেয়া হবে।
গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান করা হবে। মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেয়া হবে। প্রতি বছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে। গরিবের মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজে পড়তে পারে। ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বড় কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। সকল নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক।
এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, তরুণদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, আইসিটি ও রেমিট্যান্স নিয়েও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দলটি। দলটি চাচ্ছে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করতে। অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে।
এদিকে জাতীয় নির্বাচনে কৃষি, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধাসহ আটটি প্যাকেজকে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি। তবে ঠিক কোন তারিখে সম্ভাব্য ইশতেহার প্রকাশ করবে, বিএনপি সেই সম্পর্কে এখনো কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০-কে ধারণ করে ২০২৩ সালে জনগণের সামনে ৩১ দফা উপস্থাপন করে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই ৩১ দফার আলোকেই ৮ প্যাকেজে ইশতেহার সাজাচ্ছে দলটি। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মমুখী শিক্ষা, পেশা হিসেবে ক্রীড়াকে প্রতিষ্ঠা, বাসযোগ্য পরিবেশ, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনা দলটির। থাকছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। বিএনপির পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল বিষয়গুলোও ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা এবং বিএনপি নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, বিএনপির এবারের ইশতেহারে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি থাকবে। দলটি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড চালু করবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন কৃষকরা। প্রত্যেকের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াসহ শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ক্রীড়াকেও পেশা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করতে সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে বিএনপি। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা হবে। কর্মসংস্থানে এসএমই, বস্ত্র অর্থনীতি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে আরও বেশি তরুণকে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানির ব্যবস্থা করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয় গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে। এ সময় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, তারেক রহমানের ৩১ দফার সঙ্গে জুলাই সংস্কারের বিষয়গুলোর সমন্বয়ে ইশহেতার প্রস্তুত করছে বিএনপি। কবে ইশতেহার ঘোষণা করা হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে ইশতেহার ঘোষণার সঠিক দিনক্ষণ জানাতে পারেননি বর্ষীয়ান এই বিএনপি নেতা।