ক্ষমতার মোহে ফ্যাসিবাদের ফাঁদে?


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৫৯

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক সংকটময় মোড়ে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মোহ দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে ফ্যাসিবাদের ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্কার প্রক্রিয়া, গণহত্যার বিচার এবং কার্যকর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপন- সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে।
নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট কাটছে না
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন সবসময়ই উত্তেজনার বিষয়। কিন্তু প্রতি ভোটের আগ মুহূর্তে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে- ভোট ঠিকঠাক হবে তো? হলে সেটা কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে? গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো ভোটাধিকার, অথচ এটিকেই ঘিরে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস ও বিতর্ক।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল অংশ নেয়নি। ফলে একতরফা ভোট হয়েছিল। ২০১৮ সালের ভোটে কেন্দ্র দখল, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি, প্রশাসনের পক্ষপাত- এসব অভিযোগ দেশি-বিদেশি মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালে হয়েছে তামাশামূলক ডামি ভোট। এর ফলে ভোট নিয়ে মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হলো- ভোটকালে সরকার কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রশাসনের সর্বত্র বিএনপিপন্থী এবং সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের অনুকূল্যপ্রাপ্তদের প্রাধান্য লক্ষণীয়। এ ধরনের পক্ষপাতমূলক প্রশাসনের আবহে নির্বাচন কতটা অবাধ ও মুক্ত হতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছে।
এখন একদিকে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত হয়ে সর্বত্র অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে। অন্যদিকে বিএনপি তার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই দ্বিমুখী টানাপড়েনে নানা ধরনের গুজব আস্থাহীনতাকে বাড়িয়ে তুলেছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সাক্ষাৎ করেছেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও দেখা করেছেন প্রধান বিচারপতির সাথে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূস ও প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাথেও দেখা করেছেন সেনাপ্রধান।
এ অবস্থায় এ সরকার নির্বাচন পর্যন্ত দেশকে নিয়ে যেতে পারবে কিনা, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় দেখা দিচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রিভিউ মামলা
বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রিভিউ মামলাটি নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অতি আলোচিত বিষয়। ১৯৯৬ সালে ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হওয়া এ ব্যবস্থা ২০১১ সালে আপিল বিভাগের রায়ে বাতিল হয়। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও একতরফা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চে রিভিউ শুনানি শুরু হওয়ায় এ প্রশ্ন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদ স্পষ্ট করেছেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি পুনঃপ্রবর্তন হয়, তবে তা কোনো সাময়িক বা অস্থায়ী সমাধান হতে পারবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যাতে টেকসই হয়, তার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন। কেবলমাত্র সংকটকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হলে আবারও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদ একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘যদি আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দিই, তা কার্যকর হবে কবে থেকে?’ এ কারণে আদালত শুধু আইনি বৈধতা নয়, বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সময় ও প্রক্রিয়াও বিবেচনা করছেন। কারণ আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা সম্ভব কি না, সেটিও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
রাজনৈতিক অভিঘাত
এ রিভিউ শুনানি মূলত বিএনপি ও অন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী পক্ষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের সুযোগ তৈরি করেছে। তারা মনে করেন, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগপন্থীদের অবস্থান ছিলো- তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানসম্মত নয় এবং তা অনির্বাচিত শক্তিকে ক্ষমতায় আনে। ফলে রিভিউ রায় যেদিকে যাবে, সেটি দেশের আগামী নির্বাচনী রাজনীতিকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে।
এ মামলার আইনি ও সাংবিধানিক তাৎপর্য হলো, ২০১১ সালের রায়কে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়া মানে আদালত নিজের পূর্ব সিদ্ধান্ত নতুন বাস্তবতায় পুনর্মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত। এ রায় যদি পাল্টায়, তবে সংবিধান সংশোধনের দরকার হবে, যা একটি বড় রাজনৈতিক সমঝোতা দাবি করবে। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী কাঠামো প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্থায়ী গণতন্ত্র সম্ভব নয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রিভিউ মামলা কেবল আইনি লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদের মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আদালত কেবল পূর্বের রায় পর্যালোচনা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা তৈরি করার দিকে নজর দিচ্ছেন। আগামী ২১ অক্টোবর নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ শুনানির ফলাফল শুধু আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেবে।
নিরপেক্ষ নির্বাচনে আশঙ্কা: নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব। কিন্তু ইসি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না- এমন ধারণা ভোটারদের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। ভোটের দিন মাঠে থাকে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। জনগণের মনে প্রশ্নÑ তারা নিরপেক্ষ থাকবে, নাকি ক্ষমতাশালীদের স্বার্থে কাজ করবে? অতীত অভিজ্ঞতা এ সন্দেহকে আরও বাড়িয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনকে একটি বোঝাপড়ার নির্বাচন হিসেবে দেখা হয়।
এছাড়া উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো- অর্থ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট। মনোনয়ন থেকে শুরু করে ভোট কেনাবেচা পর্যন্ত অর্থশক্তি ও প্রভাবশালীদের আধিপত্য সর্বত্র। যোগ্য কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল প্রার্থীরা এ পরিবেশে টিকে থাকতে পারেন না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও চাপ: বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত- সবার বক্তব্য নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এতে অভ্যন্তরীণ আস্থাহীনতা আরও ঘনীভূত হয়।
জনগণের আস্থাহীনতা একটি বড় সংকট। অনেকে মনে করেন, ভোট দিলেও ফলাফল বদলে যাবে। এতে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। জনগণের আস্থাহীনতার প্রধান কারণ হলো- অতীত অভিজ্ঞতা ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোট নিয়ে বিতর্ক আস্থা নষ্ট করেছে। দ্বিতীয়ত, নিরপেক্ষ সরকারের প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র নিয়েই রয়েছে দ্বন্দ্ব। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রয়ে গেছে। চতুর্থত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণের নিশ্চয়তা নেই। অর্থ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র অসম অবস্থা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর বক্তব্য অনেক সময় দ্বিধা বাড়ায়। জনগণের ধারণা হলো, ফল বদলে যেতে পারে। এমন বিশ্বাস ভোটার উপস্থিতি কমায়।
প্রধান উপদেষ্টার বার্তা: এটা সাহসের নির্বাচন
সাম্প্রতিক এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব। এ নির্বাচন হবে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর, সাহস অর্জনের নির্বাচন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিজের ভূমিতে দেশ পরিচালনার নির্বাচন। এ নির্বাচনে কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাবের সুযোগ যেন না থাকে।’
প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোকে বলেছেন, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন করতে হবে। আগে যারা ভোট দিতে পারেননি কিংবা ভোট দিতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তাদের এবার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দিতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা সতর্ক করেছেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের পথে বাধা আসবেই। বিভ্রান্তির চেষ্টা হবে। আমাদের স্থির থাকতে হবে, একসাথে কাজ করতে হবে।’
ডাকসু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের বার্তা
ডাকসু ও অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে বার্তা পাওয়া যায়। এসব নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করা গেলে তাতে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বরাবরই ছাত্ররাজনীতিকে জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রদূত। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ জুলাইয়ের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি জাতীয় সংগ্রামে ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই ডাকসু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে প্রায়ই জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা হয়।
এবারের নির্বাচনকে রাজনৈতিক শক্তির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ডাকসু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন মাঠপর্যায়ে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা স্পষ্ট হয়। যে ছাত্র সংগঠনগুলো ভালো ফলাফল করে, তারা ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে জনমত সংগঠনের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পায়।
এর মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের উত্থান হয়। ডাকসু ও অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে উদীয়মান নেতৃত্ব পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতির কাণ্ডারি হয়। সাম্প্রতিক ডাকসু বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে সব পক্ষের প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান দেখা গেছে, তরুণ ভোটাররা মূলধারার দলগুলোর বাইরে বিকল্প খুঁজছে। এটি জাতীয় নির্বাচনে তৃতীয় শক্তি বা বিকল্প ধারার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘসময় পর ডাকসু বা ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে তা দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের বার্তা দেয়। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, যুবসমাজ পরিবর্তন চায় এবং তারা সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় হতে প্রস্তুত।
বিষয়টি জাতীয় নির্বাচনের জন্য তাৎপর্য হলোÑ যদি ডাকসু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তি সাফল্য পায়; জাতীয় নির্বাচনে সেই পক্ষের জন্য এটি ‘মনস্তাত্ত্বিক বিজয়’ হবে।
ডাকসু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এগুলো জাতীয় রাজনীতির ‘ট্রায়াল রান’। শিক্ষার্থীদের ভোটের প্রবণতা, নতুন নেতৃত্বের উত্থান, স্বাধীন প্রার্থীদের সাফল্য- সব মিলিয়ে এগুলো দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের মানসিকতা ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
এবারের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সর্বশেষ এক নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় সম্ভাবনাকে অন্য রাজনৈতিক শক্তি মেনে নিতে পারছে না। ফলে এ নিয়ে নানা ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে। এসব বাধা বিজয়ী হলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে।
অস্থিরতার মূলে কি ভারত?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভারত সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। ভারতের এখনকার নেতৃত্ব অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার ডকট্রিন প্রকাশ করে এসেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের লক্ষ্য শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়- অর্থনীতি, পানি, কূটনীতি; এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব বজায় রাখা। ভারত নানা কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রক আসন বজায় রাখতে চায়। ভারতের প্রধান স্বার্থ হলো নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দমন, অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ। পানি ও নদী ব্যবস্থাপনায় আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা; বিশেষ করে তিস্তার পানির একতরফা অধিকার ও আন্তঃনদী-সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন। বাণিজ্য ও ট্রানজিট ভারতের আরেকটি এজেন্ডা। বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য ট্রানজিট সুবিধা অব্যাহতভাবে খরচ ছাড়াই পেতে চায় দিল্লি। বাংলাদেশের জ্বালানি ও অবকাঠামো ব্যবহারের অব্যাহত সুযোগ চায় ভারত। বিদ্যুৎ রপ্তানি, পাইপলাইন, বন্দর ব্যবহারের সুযোগ এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভূরাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হিসেবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বাংলাদেশের ভূমিকা সীমিত রাখাও দিল্লির অন্যতম এজেন্ডা। এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ভারতপন্থী সরকারকে ক্ষমতায় রাখার নেপথ্য প্রচেষ্টা চালায় অবিরতভাবে। ভারত বাংলাদেশ থেকে চায় নিরাপত্তা, পানি ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ট্রানজিট ও বাজার, জ্বালানি ব্যবহার, চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ভারতপন্থী সরকার। এ চাওয়াই এখনকার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ
বাইরের আধিপত্য থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভারতের প্রভাব মেনে নিয়েও স্বাধীন সিদ্ধান্ত বজায় রাখা ঢাকার জন্য এক প্রকার অসম্ভব। পানি ব্যবস্থাপনায় ছাড় দিলে বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। ভারতের সাথে একপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারসাম্য রক্ষা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ছে। ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপে জাতীয় গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখনো আস্থাহীনতার ঘেরাটোপে। নির্বাচনকে ঘিরে অবিশ্বাস ও সংশয় না কাটলে রূপান্তরের পথ রুদ্ধ হবে। একই সঙ্গে ভারতের কৌশলগত চাপও বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ হলো- স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং প্রতিবেশীর স্বার্থের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা।
বাংলাদেশের রাজনীতির এ সংকটময় মোড়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মোহ গণতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদের ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপন এখন অনিশ্চয়তায়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে না পারলে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বিপর্যয়।