গণপ্রত্যাশা একটি কল্যাণ রাষ্ট্র
১৩ জুন ২০২৫ ০০:১৭
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া॥
দেশে একটি সরকার আছে যেটি অন্তর্বর্তী সরকার, দশমাস ধরে এ সরকার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তবে এটি নির্বাচিত সরকার না এবং বলা যায় দেশে ‘কথিত’ নির্বাচিত সরকার নেই। অনেকেই ভ্রু কুচকে বলতে পারেন আমি কথিত নির্বাচিত সরকার বলছি কেন। নির্বাচিত সরকার মানে তো নির্বাচিত সরকার। কিন্তু নির্বাচিত সরকার নিয়ে আমাদের অতীত ইতিহাস খুব সুখকর নয়। তাই কথিত নির্বাচিত সরকার বা অকথিত নির্বাচিত সরকার বা শুধু নির্বাচিত সরকার নিয়ে এ প্রশ্নের অবতারণা। বিগত দিনে বাংলাদেশের জনগণ ভোট ও নির্বাচনের নামে অনেকগুলো নির্বাচিত সরকার দেখেছে যেগুলো অনির্বাচিত সরকারের চেয়েও অধিক স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল। আমাদের পৃথিবী নামক যে গ্রহটি আছে, সেটা কিন্তু এ কয়েক বছর আগে শুরু হয়নি। বহুকাল আগে শুরু হয়েছে আমাদের এ গ্রহ। তারপর বহু বিবর্তন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক দেশ, রাষ্ট্র ও রাজ্য। আর এসব দেশ ও রাষ্ট্র শাসন করেছে বহু কিসিমের শাসক, রাজা, বাদশাহ, খলিফা ও আমীর। তারা যুগ যুগ ধরে বহু দেশ শাসন করেছেন। কেউ কেউ যুগের পর যুগ শাসন করেছেন। এসব রাজা-বাদশাহ যেমন বিভিন্ন কিসিমের ছিল তেমনি তাদের শাসন পদ্ধতিও ছিল বিভিন্ন কিসিম ও রকমের। তাদের মধ্যে যেমন ছিল রাজতন্ত্র তেমনি ছিল পোপতন্ত্র। অপরদিকে মুসলিম দেশগুলোয় ছিল আমীর ও সুলতানদের শাসন। আধুনিক বিশ্বেও একদিকে যেমন আছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থা অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। যেমন আছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা তেমনিভাবে আছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা। অতীতেও যেমন সবগুলো রাষ্ট্র ও সরকার একই প্রকৃতির ছিল না; তেমনি বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও সবগুলো রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা ও সরকার একই কাঠামো ও প্রকৃতির নয়। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার যেমন বিভিন্ন পদ্ধতির তেমনি শাসন পদ্ধতিও একই প্রকৃতির নয় বরং বিভিন্ন প্রকৃতির। দার্শনিক এরিস্টটল রাষ্ট্রকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলেন। ক. রাজতন্ত্র খ. অভিজাততন্ত্র গ. গণতন্ত্র।
বর্তমান বিশ্বে মোটা দাগে দুই ধরনের রাষ্ট্র আছে বলা যায়। এক ধরনের হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর এক ধরনের হচ্ছে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও কয়েক ধরনের আবার অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও কয়েক প্রকার। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইত্যাদি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আর অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সরকার গঠিত হয়ে থাকে। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের নির্দিষ্ট ও বিধিবদ্ধ কোনো নিয়মনীতি নেই।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলি, আর অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলি, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলি বা রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলি সবই চলছে এবং শাসনকাজও চলছে। এসব বিভিন্ন নীতি ও প্রকৃতির এসব সমাজ ও রাষ্ট্র চলছে এবং লাখকোটি মানুষ এসব রাষ্ট্রের অধীনেই তাদের জীবনযাপন করে যাচ্ছে। শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের জীবনমানই উন্নত ও নিরাপদ তাই শুধু হলফ করে বলা যাবে না। বিশ্বের অনেক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মানও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে কম নয়। বরং আধুনিক বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের জীবনমানের চেয়েও তাদের জীবনমান অনেক উন্নত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারতের সাধারণ জনগণের জীবনমান কি চীনের অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়ে উন্নত মানের? এর উত্তর অবশ্যই না। অথচ ভারত দাবি করে আসছে বিগত ৮০ বছর যাবৎ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার গঠিত হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত তার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দিয়ে তাদের দেশের উন্নয়ন করতে পেরেছে বা তার দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পেরেছে কি? অপরদিকে চীন আধুনিক পাশ্চাত্য মডেলের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় এবং তারা দাবিও করে না কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক মডেলকে কাজে লাগিয়ে দেড় শত কোটি জনসংখ্যার দেশে চীন তার দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। চীন ও ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তানে কয়েক বছর আগে একটি তালেবান গ্রুপ রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন বার্তা সংস্থার খবরে জানা গেছে, মাত্র দুই বছরে তারা আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন করেছে। বিভিন্ন রিপোর্টে জানা গেছে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। আফগানিস্তান নামক রাষ্ট্রটিও পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে না বরং শরিয়াহ আইনেই রাষ্ট্রটি পরিচালনার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আমার দেশ বাংলাদেশ তথা আমার জন্মভূমিতে বিগত ৭০ বছর ধরেই জনগণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই অনেক আন্দোলন ও সংগ্রাম করে আসছে। রাজনীতিবিদরাও পাশ্চাত্য ধাঁচের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করে দেশের উন্নয়নের অনেক কোশেশ করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য গণতান্ত্রিক শাসন যেন এক অধরা বিষয়। বিগত ৫৪ বছরে দেখা গেছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনের মাধ্যমে একবার একটা সরকার আসে, কিছুদিন চলে। তারপর এক দৈত্যের মতো চেপে বসে স্বৈরশাসক। স্বৈরশাসক দেশ কিছুদিন চালায়, ছাত্র-জনতা তাদের বুকের রক্ত দিয়ে স্বৈরশাসককে হটায়। তারপর আবার কথিত গণতন্ত্রের নামে এক দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে আবার চেপে বসে আরেক স্বৈরাচার। এ যেন বাংলাদেশের জনগণের নিয়তির নির্মম পরিহাস। এই যেমন বিগত ২০০৭ সাল থেকে একের পর এক অবৈধ ভোট ও নির্বাচনের মাধ্যমে ১৮ বছর স্বৈরাচার চেপে বসেছিল এদেশের জনগণের ওপর। বিগত ১৮ বছরে কিন্তু চার চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, অনেকগুলো স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে কিন্তু দেশে কি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থা ছিল বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ বলতে পারবে না বিগত ১৮ বছরসহ ৫৪ বছর বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থা ছিল। বরং গণতন্ত্রের নামে এক চরম স্বৈরাচার দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল।
বিগত ১৬ বছর শুধু স্বৈরতন্ত্র ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ছিল বললে ভুল হবে, বলা যায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ দেশটাকে একটা নরকে পরিণত করেছিল। একদল ছাত্রের নেতৃত্বে আপামর জনগণ বিশেষ করে ছাত্র-যুবকদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে এবং ফ্যাসিস্টদের কবল থেকে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ মুক্তি পেয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনাসৃষ্ট নরক থেকে মুক্তির পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার এখন বাংলাদেশ পরিচালনা করছে। তাদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যারা দেশটা পরিচালনা করছেন তারা নির্বাচিত সরকার নয়। তবে নির্বাচিত না হলেও গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটের সরকার বলতে কোনো বাধা নেই। অতীতে কথিত ভোট ও কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব সরকার গঠিত হয়েছিল সেগুলোর চাইতে এ অন্তর্বর্তী সরকার জননন্দিত। এখন এ সরকার কতদিন দেশ পরিচালনা করবে, তারপর কবে কীভাবে পরবর্তী সরকার গঠিত হবে, কারা পরবর্তী সরকারে আসছে, ইত্যাকার প্রশ্ন আসছে জনগণের মধ্য থেকে। সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে যেমন এসব প্রশ্ন আসছে তেমনি রাজনৈতিক মহলেও এসব প্রশ্ন উঠছে জোরেশোরে। যদিও ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা আগামী এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তারপরও একটি গোপন বিষয় রয়েছে সেটা হচ্ছে আগামী মাসে জুলাই সনদ ঘোষণা করা হচ্ছে। ঐ জুলাই সনদ কী রকম হবে এবং ঐ সনদে দেশের পরবর্তী সংবিধান নিয়ে কী ঘোষণা থাকবে তা একটি বড় প্রশ্ন। সব মিলিয়ে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তা নিয়ে সাধারণ জনগণের একটি প্রত্যাশা যেমন আছে তেমনি একটি প্রশ্নও আছে।
তবে জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে আমরা যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার চাই, বাক স্বাধীনতা চাই, ভোট দিতে চাই তেমনিভাবে এমন একটি সরকার চাই যারা সুখী সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ গড়তে পারবে। আবার নির্বাচন আসলো জনগণ ভোট দিলো, ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হলো। সেই সরকার যদি অতীতের মতোই লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থপাচার করে তাহলে এ ধরনের সরকার দরকার নেই। জনগণ এমন একটা রাষ্ট্র প্রত্যাশা করে যেখানে মানবজীবনের যে প্রত্যাশা তা যেন পূরণ হয়। রাষ্ট্র সম্পর্কে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল এমনটাই বলেছেন, ব্যক্তিজীবনের পরিপূর্ণতার জন্য রাষ্ট্র অপরিহার্য।
কারা রাষ্ট্রের দায়িত্বে গেলে সাধারণ জনগণের সার্বিক উন্নয়ন হবে এ ব্যাপারেও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেছেন যে, ‘রাষ্ট্রের শাসনভার এক হস্তে ন্যস্ত থাকাই উত্তম, কেননা তার ফলে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি পাবে ও রাষ্ট্রের উন্নতি সর্বাধিক হবে। ক্ষমতা বহুহস্তে বিন্যস্ত হলে শাসনকার্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।’ এখানে এক ব্যক্তি বলতে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি তথা প্রেসিডেন্ট বা আমীর ও প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদকেই বুঝানো হয়েছে। ইবনে খালদুন তার ছোট একটি বাক্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি এবং সর্বাধিক উন্নয়নের কথাই বলেছেন।
রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্দেশ্য কি এ নিয়েও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাদের মতামত দিয়েছেন। মার্কিন অধ্যাপক বার্জেস বলেছেন, রাষ্ট্রের চরম উদ্দেশ্য মানবতার পরম বিকাশ, বিশ্ব সভ্যতার উৎকর্ষ সাধন এবং সমগ্র পৃথিবীতে ন্যায় ও নীতির শাসন কায়েম করা।
বিগত ৫৪ বছরেও এ ভূখণ্ডের জনগণ একটি আদর্শ রাষ্ট্র কিংবা তার কাছাকাছি রাষ্ট্রের স্বরূপ দেখতে পায়নি। রাষ্ট্র ছাড়াই এক সময় মানুষ জীবনযাপন করেছে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে একটি মানবকল্যাণের জন্য মানবতার মুক্তির জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মাধ্যমে মানবিক রাষ্ট্রের বদলে পেয়েছিল একটি নরকসম দেশ। এ দেশের জনগণ এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় যেটি হবে মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। যেখানে সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চিকিৎসাসহ জানমালের নিরাপত্তা থাকবে, বাক স্বাধীনতা থাকবে এক কথায় মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। দরকার সর্বোপরি একটি সমৃদ্ধ ও কল্যাণ রাষ্ট্র। মুসলিমরাই পৃথিবীতে কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। আর এটা হয়েছিল ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলাদেশও ইসলামী আদর্শকে ধারণ করেই একটি সমৃদ্ধ ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।