মক ভোটিংয়ে ‘হযবরল অবস্থা’ ইসি সানাউল্লাহর ক্ষোভ
৩০ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪০
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই সঙ্গে সংসদ ও গণভোট আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে ভোটের দিনের অভিজ্ঞতা অর্জনে গতকাল দুই রঙের ব্যালটে মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অভিজ্ঞতা ও যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে এদিন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একসঙ্গে দেয়ায় প্রতি ভোটে গড়ে অনেকটা সময় লেগে যায়। ফলে ভোটের শুরুর দিকে কেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা ও অরাজকতা দেখা দেয়। এ সময় ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে আসা নির্বাচন কমিশনারের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ পরিস্থিতিকে ‘হযবরল অবস্থা’ বলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সরজমিনে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় যে বাইরে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ কিছুটা বিশৃঙ্খল ছিল। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক দুটি করে চারটি ভোটকক্ষ করা হয়েছে। কক্ষের সামনে ভোটারদের ভিড়ে ভোট কার্যক্রমে জট পেকে গেছে।
এ নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘কিছুই হচ্ছে না।’ তিনি কমিশনের কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। পরে আবার নতুন করে ভোটারদের সারিতে দাঁড় করানো হয়। মক ভোটার, মক পর্যবেক্ষক, মক সাংবাদিকদের কে কোথায় থাকবেন, কী কী দায়িত্ব পালন করবেন, সেসব বুঝিয়ে দেন। এরপর কেন্দ্রে শৃঙ্খলা আসে।
অবশ্য বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। শুরুতে ভোটারদের অংশগ্রহণ একদম নগণ্য ছিল। ধীরে ধীরে তা বাড়ে। ভোটগ্রহণ শুরুর ১ ঘণ্টা পর নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ মক ভোটিং পরিদর্শনে এলে ভোট কেন্দ্রের অগোছাল পরিবেশ দেখে এটিকে ‘হযবরল অবস্থা’ বলে কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ভোট দিতে কত সময় লাগে তা পুনরায় নিজে তদারকি শুরু করেন। সরজমিনে অবস্থা দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুততার সঙ্গে কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস করেন এবং ভোটারদের উপস্থিতির বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য সংখ্যায় নিয়ে আসেন।
পরিদর্শন করার সময় নির্বাচন কমিশনার অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভোটের লাইনে দাঁড়ানো থেকে ভোট দেয়া পর্যন্ত কত সময় লাগে তা দেখতে হবে। কারণ এ সময়টার ওপর ভিত্তি করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে অনেক কিছু। ভোটকক্ষের সংখ্যা ঠিক আছে কিনা, গোপন কক্ষের সংখ্যা ঠিক আছে কিনা, ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে কিনা ইত্যাদি। শুধু এখানে নাটক করার জন্য এ কাজটা নয়, কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম হযবরল ও অরাজকতা থাকতে এ কাজ করে লাভ নেই।’
ইসি সানাউল্লাহর ভোট পরিদর্শনের বিষয়ে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইসি মহোদয় একটি বুথে নানা ধরনের ভোটারদের নিয়ে টাইম পর্যালোচনা করেছেন। এটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন আসবে। এ মক ভোটিংয়ে ৫০০ ভোটারের মধ্যে ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পড়েছে, অর্থাৎ ৩৫২ জন ভোট দিয়েছেন। চার ভোট কক্ষে মক ভোটিং নেয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রতিটি ভোট দিতে কত সময় লেগেছে তা নির্ধারণ করা যাবে না। এছাড়া ভোট ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করা সম্ভব হয়েছে।’
তার মতে, গোপন কক্ষে ভোট দেয়ার আগে ভোটার তালিকা যাচাই, ব্যালট পেপার সরবরাহ, সিল, কালি দেয়া সব মিলিয়ে প্রতি ভোটারের ১ মিনিটের মতো সময় লাগে।
মক ভোটিংয়ে আসা বেশির ভাগ ভোটারই জানেন না যে কেন তারা এসেছেন। এছাড়া ইসি সূত্রে জানা গেছে যে প্রাথমিকভাবে ১১০০ জন নিয়ে মহড়া দেয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে শেষমেশ ৫০০ জন ভোটারকে দিয়েই মহড়া চালানো হবে।
মক ভোট দিয়ে আসা প্রিয়া খাতুন বলে, ‘অনেক দিন পর নিজের ভোট নিজে দিচ্ছি। যাকে খুশি তাকে দিয়েছি। কিন্তু গণভোটের বিষয়টি বুঝতে পারিনি।’
গণভোট প্রসঙ্গে ভোটার মুন্সি রইছ উদ্দীন বললেন, ‘হ্যাঁ-না জানি না। লেখাও বুঝি নাই। লেখা পড়ার টাইমও নাই। এমনিই হ্যাঁ ভোট দিয়া আসছি।’
গণভোট বিষয়ে ভোটারদের বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘এখনো গণভোট নিয়ে প্রচারণা শুরু হয়নি। ইলেকশন কমিশন ও সরকার যৌথভাবে শিগগিরই ব্যাপক প্রচার চালাবে। গণভোট আইনি অনুমোদন পাওয়ার পরই কমিশন এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রচারে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানচ্ছি।’
সিইসি বলেন, ‘৪২ হাজার ৫০০টির বেশি পোলিং স্টেশন যথেষ্ট কিনা বা অতিরিক্ত বুথ ও স্টেশন প্রয়োজন হবে কিনা তা আজকের রিয়েল-টাইম মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ঠিক করা হবে। নতুন বুথ মানে অতিরিক্ত লোকবল, সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনা—এসবই বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে নির্ধারণ করা হবে। এটা শুধু ভোটের অনুশীলন নয়—পোলিং সেন্টারের সামগ্রিক পরিবেশ, ভোটারদের কিউ, পোলিং ও প্রিজাইডিং অফিসারদের অবস্থান, সাংবাদিকদের ভূমিকা—সবকিছু বাস্তবে কেমন হবে তা যাচাই করাই এ অনুশীলনের মূল লক্ষ্য।’