জলবায়ু অর্থায়নে জাতীয় তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দুর্নীতিতে নষ্ট হয়েছে
৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:০৩
রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন
জলবায়ু তহবিলে ১৪ বছরে ২১১০ কোটি টাকার দুর্নীতি
জাতীয় জলবায়ু তহবিলে ১৪ বছরে ২ হাজার ১১০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু অর্থায়নে জাতীয় তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দুর্নীতিতে নষ্ট হয়েছে।
জাতীয় জলবায়ু তহবিলে ১৪ বছরে ২ হাজার ১১০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু অর্থায়নে জাতীয় তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দুর্নীতিতে নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০-২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি) থেকে অনুমোদিত ৮৯১ প্রকল্পের মধ্যে ৫৪ শতাংশ বরাদ্দে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাক্কলিত এ পরিমাণ প্রায় ২৪৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ২ হাজার ১১০ কোটি টাকার বেশি। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি বছর জলবায়ু ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৩-২৪ সাল পর্যন্ত পেয়েছি মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা একেবারেই নগণ্য।’
জাতীয় তহবিলের অর্থ লুটপাট করেছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘জবাবদিহি, সুশাসন ও দক্ষতার অভাবের কারণেই এ লুটপাট হয়েছে। আমরা এ অবস্থার পরিবর্তন চাই। জলবায়ু অর্থায়নে প্রকৃত উপকারভোগীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটি থেকে মোট ৪৫৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অনুমোদিত হয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ দুর্নীতিগ্রস্ত। রাজনৈতিক বিবেচনা, যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদনের প্রবণতা স্পষ্ট। অথচ তহবিল ব্যবস্থাপক হিসেবে বিসিসিটির কর্মকর্তারা অনিয়ম রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
টিআইবি জানায়, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলায় প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রয়োজন ১০-১২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০১৫-২৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তহবিল মিলিয়ে বছরে গড়ে বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার, প্রয়োজনের মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
জাতীয় তহবিল থেকে বরাদ্দ প্রতি বছর গড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হারে কমেছে, বিপরীতে আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বরাদ্দ বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। তবু বরাদ্দের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অতি সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় তহবিলের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতা নিয়মিত ঘটনা। ৮৯১ প্রকল্পের মধ্যে ৫৪৯টির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, গড়ে ৬৪৮ দিনের প্রকল্প শেষ হতে লেগেছে ১ হাজার ৫১৫ দিন, অর্থাৎ ১৩৩ শতাংশ সময় বৃদ্ধি। কোনো কোনো চার বছর মেয়াদি প্রকল্প শেষ হতে লেগেছে ১৪ বছর পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক তহবিলেও একই চিত্র, ৫১ প্রকল্পের মধ্যে ২১টির মেয়াদ গড়ে ৫২ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের চাহিদার বিপরীতে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ বরাদ্দ হয়নি। জাতীয় তহবিল বা বিসিসিটির অর্থ বরাদ্দে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই, আবার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টে নানা সংকট রয়েছে।
তহবিলে অনিয়ম দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়, অর্থ বরাদ্দে অধিক বিপদাপন্ন এলাকা কম গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থে সাফারি পার্ক, ইকো পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। নিম্নমানের কাজ সম্পাদন করা হয়েছে এবং অর্থ জালিয়াতি করা হয়েছে, এমনকি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতীয় তহবিলের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ৮৯১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৪৯টির (৬১ দশমিক ৬ শতাংশ) মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গড়ে প্রকল্পের মেয়াদ ৬৪৮ দিন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫১৫ দিনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জলবায়ু অর্থায়ন এবং এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য বাজেট বরাদ্দ, চাহিদা, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও পরিকল্পনা নীতির সঙ্গে সংগতিহীন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।