তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় বিশ্বে বাংলাদেশ চতুর্থ

স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না ৮ কোটি মানুষ


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৫২

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বিগত ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশ সাধারণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং বাংলাদেশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একের পর এক সরকার আসছে-যাচ্ছে, কিন্তু সরকারগুলো জনগণের মিনিমাম চাহিদা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং বিগত সরকারগুলো পরিসংখ্যান ব্যুরোকে দিয়ে মনগড়া তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাচ্ছে, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য আছে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা নেই। কিন্তু দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ সাধারণ খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন একটি দেশ। বাংলাদেশের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে। প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র মানুষের হার বাড়ার সাথে সাথে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে- এমন পরিবারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অপরদিকে দেশের ৪৪ শতাংশের বেশি তথা ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না।
বৈশ্বিক খাদ্যসংকট নিয়ে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস-২০২৫’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে; বিশ্বের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থা এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ মিলে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠেছে। এ তালিকায় শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, সুদান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়া।
এদিকে দেশের রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে- এমন পরিবারের সংখ্যা হচ্ছে ৪৬ শতাংশে বেশি। বিবিএসের জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছিল ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ আর ২০২৪ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অপরদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক ধারণা জরিপে জানা গেছে, দেশে দারিদ্র্যের হার এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আগের চেয়ে বেড়েছে। গত বছর বিআইডিএস পরিচালিত এক ধারণা জরিপ বা পারসেপশন সার্ভেতে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গত ২৪ মার্চ সোমবার বিআইডিএসের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক পৃথক এক প্রতিবেদনে তীব্র খাদ্যসংকটের তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ।
দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু খাদ্য নিরাপত্তার সংকটেই নয়, স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে গত সাত বছরে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনো দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার।
দুটি প্রতিবেদনই গত এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিবেদন দুটি বাংলাদেশের খাদ্যসংকটের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছে। এ প্রতিবেদনগুলো ভাবনার সৃষ্টিকারী।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা
জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৫৩টি খাদ্যসংকটপীড়িত দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। যেখানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বলতে বোঝানো হয়েছে ব্যক্তি বা পরিবারের পর্যায়ে অর্থ বা অন্যান্য সম্পদের অভাবে খাদ্যপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ।
দেশে ৪৪ শতাংশের বেশি বা ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না এখনো। ২০১৭ সালে এ অনুপাত ছিল ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সাত বছরে উন্নতমানের খাদ্য না পাওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুষম খাদ্য না পাওয়ার দিকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।
জনসংখ্যার ১০ ভাগ অপুষ্টির শিকার
দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো অপুষ্টির শিকার। তবে গত দুই দশকে এ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অপুষ্টির শিকার মানুষের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ভারত ও পাকিস্তানে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।
প্রতিবেদনে ২০০৪ থেকে ২০০৬ এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অপুষ্টির শিকার মানুষের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার মানুষের হার ছিল মোট জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। এটি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে এসে হয় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। এখন ভারতের মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ অপুষ্টির শিকার, পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৫ আর আফগানিস্তানে ২৮ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপালে অপুষ্টির শিকার দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৩ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সুষম খাদ্যের জন্য ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা অনুসারে জনপ্রতি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৯ ডলার। আগের বছর এটি ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এক্ষেত্রে শীর্ষে আছে ভুটান। সুষম খাদ্য গ্রহণের খরচ বলতে বোঝানো হয় একজন ব্যক্তির দৈনিক ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তির চাহিদা পূরণ করে এমন খাদ্যের জন্য স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এবং সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবার কেনার ব্যয়।
২০২২ সালে বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিআইডিএসের ধারণা জরিপে এ হার হয়েছে ২৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
বিবিএসের জরিপে ২০২২ সালে গ্রামে দরিদ্র মানুষের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিআইডিএসের জরিপে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বিবিএসের জরিপে শহরে দরিদ্র মানুষের হার ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বিআইডিএসের জরিপে এসেছে ২০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের ২ কোটি ৩৬ লাখ বা ২৬ শতাংশ মানুষ উচ্চমাত্রার খাদ্যসংকটে ভুগছেন।
জাতীয় ও আর্šÍজাতিক সংস্থাগুলোর বিভিণ্ন তথ্য ও পরিসংখ্যানে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে যেমন তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, তেমনিভাবে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তথা প্রায় অর্ধেক মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় যে পাঁচটি দেশের নাম এসেছে, বাংলাদেশ ছাড়া সে চারটি দেশ হচ্ছে আফ্রিকার নাইজেরিয়া, সুদান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও ইথিওপিয়া। খুবই দুঃখজনক যে, বিগত পাঁচ দশকেও বাংলাদেশ তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদার অন্যতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারল না। বরং তার নাম অন্তভুক্ত হচ্ছে আফ্রিকার চারটি গরিব দেশের সাথে। বিশ্লেষকদের অভিমত, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ যেমন রাজনৈতিক সংকটে, তেমনি দেশটি অর্থনৈতিক সংকট থেকেও বের হতে পারছে না। দেশে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনীতির প্রতি সেক্টরেই সমস্যা ও ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ একটি গোষ্ঠী লাখকোটি টাকা পাচার করে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে বেগমপাড়া তৈরি করছে। আর এসব দুর্নীতি হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন, তারা ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা একদল দোসরের মাধ্যমে। অপরদিকে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারসহ অতীতের সরকারগুলো জনগণের প্রধান চাহিদা খাদ্যসহ মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের চেয়ে বিভিন্ন দিবস ও চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশে সরকারগুলো সাধারণ জনগণের মিনিমাম মৌলিক প্রয়োজন পূরণের চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকেই নজর বেশি দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশ বিগত পাঁচ দশকেও সাধারণ জনগণের খাদ্যের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এটা খুবই দুঃখজনক ও বাংলাদেশের জন্য কলঙ্কজনকও বটে। সাধারণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তাসহ মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক- এটাই সাধারণ জনগণের কামনা ও প্রত্যাশা।