দুটি জানাযা : অন্তর্নিহিত বার্তা জনতার ঐক্য ও প্রেরণা

প্রিন্ট ভার্সন
৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৯

Sarder Abdur Rahman

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
একই মাসে দুটি জানাযা। কমবেশি দুটিই বৃহদাকার- জনতার উপস্থিতির দিক দিয়ে। প্রথমটি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির জানাযা এবং দ্বিতীয়টি বিএনপি’র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার। এ দুটি সমাবেশকে পরস্পরের মধ্যে তুলনা করা নয়, বরং এ দুটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা এবং কোন কোন কারণে বাংলাদেশের জনগণ তাদের আবেগের সবটুকু উজাড় করে দিলো, সেটি পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। এ জমায়েতে লাখ লাখ মানুষ হাজির হন অত্যন্ত আবেগ নিয়ে। কিন্তু এ আবেগ এবং উপস্থিত জনতার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরের ভাষা কী বার্তা দেয়?
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কী?
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (শরীরী ভাষা) হলো এমন এক ধরনের অমৌখিক যোগাযোগ, যা কথা না বলেও শরীরী ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ইশারা এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আমাদের অনুভূতি, মনোভাব ও উদ্দেশ্য প্রকাশ করে, যা মানুষের মধ্যে গভীর সংযোগ স্থাপন করে। এটি যোগাযোগের একটি অপরিহার্য অংশ, যা আমাদের মানসিক অবস্থা ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় এবং পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে। এটি একক ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন বোঝায়, তেমনি কোনো সমবেত জনতার বেলায়ও বোঝা যায়। জনতার আবেগ প্রকাশ এবং লক্ষ্যবস্তুর প্রতি বিশেষ মনোযোগ নিবদ্ধ করে তাদের ইতিবাচকতা প্রকাশ করে। যারা এর মূল্যায়নে আগ্রহী, তাদের জন্য জনতার শরীরী ভাষা পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি তাদের বার্তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বুঝতে সাহায্য করে এবং সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ ও পরিবর্তন করতে সহায়তা করে।
বেগম জিয়ার পরিচয়
প্রায় ৮০ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কয়েকবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ১৯৯১-১৯৯৬ সাল এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে একজন রাজনীতিক হয়ে ওঠার পাশাপাশি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ছিল এক বিস্ময়কর উত্থান। কোনো নির্বাচনেই পরাজিত হওয়ার রেকর্ড ছিল না তাঁর। অতঃপর একজন আপসহীন নেত্রী, স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী, দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াকু সৈনিক, ভারতপন্থি বলে কথিত শেখ হাসিনা ও তার ক্ষমতার প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিতি অর্জন এবং তাদের হাতে চরম নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও দেশের জনগণের সঙ্গেই থাকা প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত একজন সফল মানুষ ছিলেন তিনি। তার জীবনাবসানও ঘটে ফ্যাসিবাদী সরকারের অবহেলা ও উপেক্ষায় অসুস্থতার দরুণ। দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে গত বছর ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়া হয়। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরের দিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাযা ও গার্ড অব অনার দেয়ার পর জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
জনতার অভিভাবক
বেগম জিয়ার জানাযা ছিল অভূতপূর্ব, রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থক ছাড়াও এতে অংশগ্রহণ করেন সর্বস্তরের লাখ লাখ মানুষ। তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিলেন একজন অভিভাবকের মতো। পরিচিতি পান দেশনেত্রী, আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের মা প্রভৃতি শব্দবন্ধের দ্বারা। রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দুর্যোগপূর্ণ ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের পথে লড়াই করার এক প্রেরণার উৎস। তিনি রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা এবং অঙ্গীকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি ছিলেন একটি পরিবারের মায়ের মতো, যে পরিবারটি ‘বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত। যার উপস্থিতি সন্তানদের শক্তি জোগাতো। ঠিক তেমনি তিনি নানা হুমকির মুখেও দেশ না ছেড়ে গোটা জাতির অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি যা বলতেন, তা-ই করার চেষ্টা করতেন এবং কখনো অসত্য ওয়াদা করেননি, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষা। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করতেন এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও উপজাতি সবার। তাঁর আশ্রয়ে প্রতিটি ধর্মের মানুষ নিরাপদবোধ করতো। প্রতিপক্ষের শত বিদ্রƒপ ও কটু কথার মুখেও খালেদা জিয়া কখনো পাল্টা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য না করে নিজের সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক উচ্চতা বজায় রেখেছিলেন। এটি বিস্ময় জাগায় যে, ক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও তাঁর জানাযা ও দাফন প্রক্রিয়ায় উপস্থিত হন বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণও। এমনকি বর্তমান বিরূপ সময়ের প্রতিবেশী ও সংক্ষুব্ধ ভারতও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করতে না পেয়ে একেবারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে প্রেরণ করে। অন্যদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র, কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুংগেল এবং মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা ও শ্রমমন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ। সফররত বিশিষ্টজনরা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং গণতন্ত্রের জন্য তার আজীবন সংগ্রাম ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। তারা বলেন, জানাযায় রেকর্ডসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখে তারা অভিভূত। এ থেকে বোঝা যায় যে, তিনি কেবল বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে আবদ্ধ ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং তার নাগরিকদের একান্ত আপনজন। খালেদা জিয়া করেছিলেন ‘বাংলাদেশ’-এর রাজনীতি। তিনি বলতেন, বিদেশে তার কোনো প্রভু নেই। সেই সত্যই তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এই ‘বাংলাদেশপন্থী’ রাজনীতিই তাঁকে সাধারণ মানুষের মনে আসন করে দিতে পেরেছিল।
একটি কফিন কীভাবে প্রায় পুরো জাতিকে এককেন্দ্রে সমবেত করলো, সেটি ভীষণভাবে উপলব্ধি করার বিষয়। মানিক মিয়া এভিনিউ তখন কেবল একটি সড়ক নয়- সেটি হয়ে উঠেছিল একটি জনসমুদ্র। বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুরÑ সব দিক থেকে মানুষ এসে মিশেছিল এক বিন্দুতে। মূল যে ক্রিয়াকর্ম ‘জানাযা’ তার মেয়াদ তো বড়জোর পাঁচ মিনিটের বেশি ছিল না। কিন্তু সেই কয়েকটি মিনিটে যা ঘটলো, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু দশকের জন্য অনুরণিত হতে থাকবে। কেউ গুনতে পারেনি কত মানুষ ছিল। কেউ বলেছে ২০ লাখ, কেউ বলেছে ৩০ লাখ, কেউ বলেছে তারও বেশি। কিন্তু সংখ্যার হিসাব এখানে গৌণ। নিশ্চিত সত্য একটাইÑ এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব জানাযা। এমনকি বৈশ্বিক পরিসরে মরহুম মুসলিম নেতাদের জানাযার ভিড়ের তালিকায়ও এটি ছিল বিরল।
দীর্ঘদিন ধরে খালেদা জিয়া ছিলেন ক্ষমতার বাইরে। কারাবন্দী, অসুস্থ, নীরব। রাষ্ট্রীয় ভাষ্য তাঁকে প্রায় অদৃশ্য করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই জানাযা প্রমাণ করলো, রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা সবসময় ক্ষমতার সঙ্গে আসে না। কখনো কখনো তা আসে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে, নীরবতার ভেতর দিয়ে। জনতা দেখিয়েছে, তারা ভুলে যায়নি। তাঁর ব্যক্তিক পরিচয় ছাড়িয়ে যায় শতসহস্র জনতার অন্তকরণে।
ওসমান হাদির পরিচয়
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। বয়স যার মাত্র ৩২ বছর। এই যুবক কী করে লাখকোটি মানুষের ভালোবাসায় আপ্লুত হলেন! কী তার পরিচয় আর কী তার অবদান! আর কেনোই বা তিনি শত্রুর সহজ শিকারে পরিণত হলেন!
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুময়ার নামাজের পর ওসমান হাদি ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় আততায়ীর ছোড়া গুলিতে আহত হন এবং গত ১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। গত বছর ২০ ডিসেম্বর তাঁর জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়। আর ওসমান হাদিÑ সাধারণভাবে বলতে গেলে ছিলেন একাধারে একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক ও শিক্ষক; যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। হাদি জুলাই শহীদদের অধিকার রক্ষা ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির জন্য আলোচনায় আসেন।
জনতার অভিবাদন
ওসমান হাদি জুলাই-পরবর্তী সময়ে জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন, যা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর হত্যাজনিত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিশেষত জানাযায় অগণন সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে। একজন ভাষ্যকারের মতে, শরীফ ওসমান হাদির জানাযা শুধু একজন শহীদের শেষ বিদায় নয়, তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক নীরব অথচ দৃপ্ত ঘোষণাপত্র। শোক, শ্রদ্ধা আর প্রতিজ্ঞার বন্ধনে এই জানাযা পরিণত হয়েছিল গণমানুষের এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে। এই জনসমুদ্র শুধু কান্নায় ভেজা ছিল না; এতে ছিল আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভে জ্বলে ওঠা এক জাতির প্রতিবাদী কণ্ঠ। শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন সেই বিরল কণ্ঠস্বর, যিনি নির্ভীকভাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার আর স্বাধীন মত প্রকাশের প্রশ্নে তিনি কোনো আপোস করেননি। বিদেশি প্রভাব, অভ্যন্তরীণ স্বৈরশাসন ও ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। সহযোদ্ধাদের মতে, হাদি বিশ্বাস করতেন- স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে নয়, প্রতিফলিত হতে হবে রাষ্ট্রচিন্তা ও প্রতিটি সিদ্ধান্তে।
ওসমান হাদি কেবল একটি ভূখণ্ড ও একটি পতাকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। চেয়েছেন একটি স্বাধীন সত্তা নিয়ে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার শক্তিতে বলীয়ান একটি দেশ। তার থাকবে ঐতিহ্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক পরিচয়, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও ইনসাফের অনুশীলনে সর্বদা সক্রিয়। যিনি বুঝেছিলেন, আধিপত্যবাদ ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নীরবতা মানেই পরাজয়।
ওসমান হাদির জানাজা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটি প্রমাণ করেছে, একজন সাহসী মানুষের মৃত্যু কখনো শেষ নয়; বরং তা হয়ে উঠতে পারে গণপ্রতিরোধের শক্তিশালী প্রেরণা। এই জানাযা দেখিয়ে দিয়েছে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সম্মিলিত ও প্রজন্মব্যাপী এক মহৎ সংগ্রাম। মাত্র কয়েকটা মাস। এরই মধ্যে একটা উল্কাপিণ্ডের মতো তার আলোকজ্জ্বল আবহ সৃষ্টি করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো। তার শারীরিক বিদায় ঘটলেও সে যে বিপুল মাত্রার আলোক-তরঙ্গ সৃষ্টি করে গেল তা যেন একটি দেশের, একটি জাতির প্রকৃত দিকনির্দেশক হয়ে থাকলো। এই মাত্র কয়েকটা মাসের ব্যবধানে একটা পূর্ণাঙ্গ পথরেখা অংকন করে দিয়ে গেল সে। আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চরিত্র, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক চেতনার রূপকল্প- প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার নির্দেশনা জাতির জন্য রেখে গেলো। একটি বিশুদ্ধ সমাজ গঠনÑ যেটি হবে সকলপ্রকারের অনিয়ম, অবৈধ ও দুর্নীতিমুক্ত। হাদি ভারতীয় আধিপত্যবাদের করাল গ্রাস থেকে এ দেশের মানুষের মুক্তির পথে সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। হাদি সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের মোকাবিলায় যোগ্য ও দক্ষ এবং সৎ জনবল তৈরিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিল। চেয়েছিল জুলাই-এর শহীদদের খুনিদের বিচার হোক। সে আরো চেয়েছিল পিলখানা হত্যার বিচার হোক। হাদি একাধারে রাজনীতি, রাষ্ট্রকাঠামো, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, ব্যক্তিগত আচরণ, সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িক ইস্যু, শিক্ষাকাঠামো ইত্যাদি কোনো বিষয়ই তার আলাপের বাইরে ছিল না। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে কীভাবে নির্বাচনে জিতে সে সম্পর্কেও তার পর্যবেক্ষণ ছিল নিখুঁত।
তাই বলা যায়, শরীফ ওসমান হাদিকে তার হত্যাকারীরা সঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিল। নিছক একজন স্লোগানদাতা কিংবা মাইক হাতে উচ্চকণ্ঠে কথা বলার জন্য নয়, তার মতো স্বচ্ছভাবে চিন্তা করতে পারা এবং শিকড় থেকে প্রকৃত ভাবনাগুলো ভাবতে পারার জন্য সে একটা আইকন হিসেবে গড়ে উঠতে চেয়েছিল। আর শত্রুরা একারণেই তাকে আগামী দিনের জন্য আর টিকে থাকতে দিতে চায়নি।
উপসংহার
আলোচ্য দুটি জানাযার অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল প্রায় একই প্রকারের। তা হচ্ছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে জনতার ইস্পাতকঠিন ঐক্য, সংহতি ও প্রেরণা। একজন সমাপনী টেনেছিলেন পূর্ণাঙ্গ বয়স পেয়ে, একটি দেশের চিন্তা-চেতনার কাঠামো কী প্রকারের হবে- সেটি নিজের জীবনের পুরোটা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন জীবনের উঠতি সময়ের সন্ধিক্ষণে বিদায় নিলেন। তবে রেখে গেলেন এই বার্তা যে, বয়স কোনো ব্যাপার নয়, সামান্য জীবনেও অক্ষয়-অমর হয়ে থাকা যায়। তাঁরা উভয়ে বয়সে ছিলেন মাতা ও পুত্রের বয়সের মতো। এই দুই জীবনের বিনিময়ে তারা তাদের দেশ ও জাতির জন্য পরিষ্কার পথনির্দেশনা রেখে গেলেন। যে পথনির্দেশনা ধরে একটি জাতি তার পথপরিক্রমা করতে পারবে বলে আশা করা যায়। তাদের উভয়ের বিদায়ে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো বলে আমরা আফসোস করতে পারি। কিন্তু তাঁরা যা রেখে গেলেন, সেটিই তাদের অমরত্ব দিতে পারে।