ভোটের রাজনীতি : দল ও জোটের কাছে জনতার প্রত্যাশা
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৯
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। দল ও জোটের হয়ে আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা বানানোর কাজ এগিয়ে চলছে। দেশের বড় জোট জামায়াতের নেতৃত্বে ৩০০ আসনে যোগ্য, দেশদরদি নেতা বানানোর জন্য যার যার দলের ভালো লোকের সমন্বয়ে নেতা বাছাই শেষ। আমার জানা মতে, জামায়াতে ইসলামী জোটে দেশের সর্বশ্রেণির পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আলেম, ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে দেশের যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। জামায়াত জোটে আলেম-ওলামা, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রখ্যাত ও বাছাই করা লোকের সমন্বয়ে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। আশা করা যায়, এ জোটকে মানুষ ভোট দিয়ে তাদের নেতা নির্বাচন করবে। তারা সরকার গঠন করে দেশের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্ত থেকে দেশকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। তারা স্বজনপ্রীতি করবে না, পদ ব্যবহার করে অন্যায়ের প্রশ্রয় দেবে না। কোনো আধিপত্যবাদ, কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে না। ২০২৪ সালের বিপ্লবের সনদের বাইরে কোনো কাজ করবে না। সনদের প্রতি গণভোটে হ্যাঁ জবাব দিয়ে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে নেয়ার সার্বিক ব্যবস্থা নেবে।
দেশের আরেক দল বিএনপির নেতৃত্বে আরেকটি জোট হয়েছে। তারাও তাদের কর্মসূচি অনুযায়ী দেশ পরিচালনার পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ৩০০ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। মানুষ প্রত্যক্ষভাবে দুই জোটের প্রার্থীকেই এলাকায় তার কর্মতৎপরতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রয়োজনে কাছে পাওয়া সবকিছুই বিবেচনা করেই ভোট দিয়ে নেতা বানাবে। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে, তারাই সরকার গঠন করবে। আমরা দেশের স্বার্থে দেশদরদি সরকার প্রত্যাশা করি। বিএনপির জন্ম হয়েছিল শহীদ জিয়ার দেশদরদি প্রোগ্রাম নিয়ে, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী মনোভাব নিয়ে ডান ও বাম মতবাদের ভালো লোক নিয়ে তিনি দল গঠন করে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা করেছিলেন। শহীদ জিয়ার বদান্যতায় শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু এটিই তার জন্য কাল হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই জিয়াকে শহীদ করা হয়। দেশ আবার আধিপত্যবাদের খপ্পরে পড়ে যায়।
দুঃখের সাথে স্মরণ করছি বেগম খালেদা জিয়ার কথা। তিনি গৃহবধূ থেকে তিন বারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। স্বৈরাচার হাসিনা তাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন। জেল খাটিয়েছেন। সঠিক চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালে ধুঁকে ধুঁকে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। দেশ-বিদেশের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে লাখো মানুষের জানাযায় দোয়া নিয়ে তার স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে শায়িত হলেন। মহান আল্লাহ তার সব গোনাহ মাফ করে দিন। সব ভালো কাজের বরকত দান করুন। তার কবর জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন। তার পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন। উল্লেখ থাকে যে, তার সাথে আমার একাধিকবার মিটিং করার সুযোগ হয়েছিল।
শেখ হাসিনা দেশকে বাপের তালুক ভেবে স্বৈরাচারী কায়দায় ভোট ছাড়া নির্বাচনের প্রহসন করে দীর্ঘদিন দেশকে সর্বক্ষেত্রে দেউলিয়ার পথে নিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে প্রায় ২০০০ শহীদ আর ৩০ হাজার আহত-পঙ্গুত্ববরণের মাধ্যমে দেশ রাহুমুক্ত হয়। স্বৈরাচার হাসিনা দুপুরের খাওয়া ফেলে দাদার দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। দেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা প্রায় দেড় বছর শাসন করছে। স্বৈরশাসনের সবকিছু এই দেড় বছরে সমাধান করা সম্ভব হয়নি। চুরি বন্ধ করা যায়নি আবার চুরির টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা খুব একটা এগোয়নি।
জামায়াতে ইসলামী আগেই দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন- আমরা ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছি, এখন দেশ থেকে দুর্নীতি তাড়াবো। তাই তো জামায়াত আমীর বলেছেন, আমরা যারা জোটে এক হবো, তাদের ঘোষণা দিয়েই আসতে হবে যে- আমরা দুর্নীতি দূর করব, ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনে সঠিক থাকবো, হাসিনাসহ তাদের দোসরদের বিচার করব।
জুলাই সনদের বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ একমত থেকে সামনে এগোতে হবে। আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে, এ পর্যন্ত জামায়াত, এলডিপির কর্নের অলি আহমদ এবং এনসিপি মিলে ১২ দলীয় জোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী যদিও বহু পূর্বেই ৩০০ প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে জনমত সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। জামায়াতের প্রার্থীরা সৎ, শিক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত, জনদরদি। তারপরও জামায়াত প্রায় ১০০টি সিট জোটের প্রার্থীদের জন্য ছেড়ে দেবে। জামায়াতে ইসলামীকে মনে রাখতে হবেÑ যাতে তাদের নিজস্ব প্রার্থীদের মধ্যে থেকেই ১৬০টিতে জিতে আসতে পারে এমন প্রার্থী নিয়েই এগোতে হবে। বাকি যদি ১০০টির মধ্য থেকে জোটের প্রার্থীরা ৫০/৬০টি আসনও পায়, তাতে ৩ ভাগের ২ ভাগ সিট পাওয়া সম্ভব। তাই দেশের ও দেশের বাইরের সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে পরিস্থিতি আয়ত্ত করতে হবে।
আমি একটি বিষয় আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই- যদি দেশবিরোধীরা চেষ্টা করে ২০০৮ সালের মতো ভোটে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে, তারা তা পারবে না। কারণ ইতোমধ্যেই পুলিশপ্রধান ঘোষণা করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনারকে বার্তা দিয়েছেন নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে পুলিশ বিভাগ শক্ত অবস্থানে থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনকে এও বলেছেন, যেন তারা পুলিশ বিভাগের প্রতি আস্থা রাখে। অন্যদিকে জামায়াত জোটে সাবেক সামরিক বড় অফিসাররা প্রার্থী হয়েছেন, যারা সামরিক বাহিনীকে আস্থায় নিতে পারবেন এবং নির্বাচনে নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর লোকেরা যাতে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে, তার ব্যবস্থা করতে পারবেন। ঢাকা-২ আসনে কর্নেল অব. আবদুল হক, যিনি আবার অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারদের ক্লাব ‘রাওয়ার’ নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তাই তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। তিনি সামরিক বাহিনীর বর্তমান অফিসারদের নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে সাহসী ভূমিকা রাখতে পারবেন। আমরা সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীকে কারো পক্ষে নয়, দেশের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানাই। কারণ দেশের জনগণের টাকায়ই তাদের বেতন-ভাতা হয়। তাই দেশের একটি ভালো সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী আমাদের সম্পদ। তাই তাদের ভূমিকাও হতে হবে জাতির কল্যাণে।
বিএনপিসহ আরো দল ও জোটের প্রতি জনমানুষের প্রত্যাশা- আসুন, ৫৪ বছরের গ্লানি মুছে দেশকে একটি সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা বানিয়ে দুনিয়ার বুকে একটি আদর্শ দেশ উপহার দিই। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ ছোট দেশকে দিয়েছেন মানবসম্পদ, সমতল ভূমি, বনভূমি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা সমুদ্রবন্দর যা আমাদের দেশ উন্নয়নের জন্য খুবই প্রয়োজন। ফলে আমরা যদি জামায়াত জোট ও বিএনপি জোট সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি দল ও বিরোধীদল হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করি, তবে কোনো দেশ আমাদের বশীভূত করতে পারবে না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। মুসলিম দেশগুলোও আমাদের জনশক্তি নিয়ে এবং আমদানি-রফতানিতে শরিক করে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পারব।
আমাদের দেশের সকল মত ও ধর্মের লোকেরা সবাই মিলে একসাথে একমতে দেশ গঠনে ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকতে পারব।
আমার অভিজ্ঞতায় বলে, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ আরো অনেককে ননমুসলিমরা প্রচুর ভোট দিয়ে এমপি-মন্ত্রী বানানোয় শরিক হয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর দুজন মন্ত্রী ৩টি মন্ত্রণালয় দুর্নীতিমুক্ত থেকে ৫ বছর দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাদের ফ্যাসিবাদী হাসিনা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের মন্ত্রণালয়ের কোনো দুর্নীতি আবিষ্কার করা যায়নি। তাই বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী জোট যদি আগামী নির্বাচনে জিতে আসতে পারে, তবে দেশটাকে দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত-অগ্রগতির দেশ গড়তে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ। ৫৪ বছরের সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ফেলে বাংলাদেশ একটি সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
আমীরে জামায়াত ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন- দেশের যুবশক্তিকে বেকার থাকতে হবে না। তাদের পড়ালেখা শেখ করার পরপরই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করা হবে। শুধু তাই না, তারা যদি ব্যবসার প্রতি আগ্রহ দেখায়, তাতে তাদের সহজলভ্য পুঁজির ব্যবস্থা করে দেয়া হবে এবং ব্যবসার প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
ফলে জামায়াত জোটের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ভোটে জিতে জনসম্পদের ব্যবহার দেশে এবং বিদেশে পাঠিয়ে বেকার সমস্যার দূর করা হবে আবার দেশের অর্থনীতির জন্য প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামী ছাত্রশিবির প্যানেলে ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুতে নির্বাচিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার পরিবেশে অল্প সময়ে ৫৪ বছরের সব ইতিহাস দূরে ফেলে এক আদর্শ স্থান করে নিয়েছে। তাই আগামীতে ভোটের রাজনীতিতে দল ও জোটের কাছে আমাদের প্রত্যাশা- সবাই সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত ও মাদকমুক্ত দেশ গঠনে উপযুক্ত দেশদরদি নেতা নির্বাচন করে বাংলাদেশকে একটি উন্নত-অগ্রগতিশীল দেশ গঠনে ভূমিকা রাখি। প্রার্থী যে দলেরই বা জোটের হোক, তাদের ভোট দেওয়ার সময় অবশ্যই সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত লোক বাছাই করে তাদের প্রতিনিধি বানাতে হবে, যাতে করে আমাদের দেশ আর অন্য দেশের করুণার নয়, আমরাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। আমাদের আরো প্রত্যাশা- শহীদ শরীফ ওসমান হাদি যে পথে লড়ে শহীদ হলেন, ২৪ জুলাই যারা শহীদ হলেন, পঙ্গু হলেন তার হত্যার বিচার অনতিবিলম্বে করতে হবে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]