মহিউদ্দিনের চোখে ‘জামায়াত’ : স্ব-চিন্তার বৃত্তে আটকে থাকা!

সরদার আবদুর রহমান
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০০

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ রচিত গ্রন্থ ‘জামায়াতে ইসলামী, উত্থান বিপর্যয় পুনরুত্থান’ প্রকাশের পর পাঠকমহলে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করে। কৌতূহল জাগে একদা জাসদের প্রথম সারির একজন তাত্ত্বিক, তাঁর চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে তিনি কি জামায়াতে ইসলামীকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে সমর্থ হবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এ প্রসঙ্গের অবতারণা।
ভূমিকায় তিনি স্বীকার করেছেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক যে, আমি জামায়াতকে শত্রুজ্ঞান করব, তাকে দেখব ক্ষোভ ও ঘৃণার চোখে। এটি করতে গেলে একটি আবেগতাড়িত কাজ কিংবা উপন্যাস হবে, ইতিহাস হবে না। ইতিহাসচর্চার সময় আমি আমার ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও ঘৃণা একপাশে সরিয়ে রেখে, যা ঘটেছে তার ওপরই দৃষ্টি দেব।’ কিন্তু গ্রন্থের গর্ভে যা প্রবিষ্ট করানো হয়েছে, তাতে মনে হয় তিনি তাঁর ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রশমিত করার খানিকটা সুযোগ নিয়েছেন। মহিউদ্দিন ছাত্রজীবন ও যৌবনে ছিলেন বামপন্থার কট্টরপন্থী অংশের একজন কর্মী এবং পরে তিনি বাম তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত। জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে তার ইসলামপন্থী রাজনীতির মূলোৎপাটন যজ্ঞে।
বইটি পাঠে দেখা যায়, মহিউদ্দিন জামায়াতের ইতিহাস লিখতে গিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু অপকর্মের বিবরণ তুলে দিয়ে তার দায় প্রকারান্তরে জামায়াতের আমলনামা হিসেবে চালিয়ে দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষের সাফাইমূলক বক্তব্যগুলো মূলত অধ্যাপক গোলাম আযমের লেখা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। যেগুলো মূলত সত্তর ও তার পূর্ববর্তী সময়ের। জামায়াতের এ দীর্ঘ গণতান্ত্রিক কৃতিত্বকে একাত্তরের পাকবাহিনীর কর্মকাণ্ড দিয়ে ম্লান করে দিতে চেয়েছেন। লেখক যদিও একাত্তরের ঘটনাবলির জন্য কথিত ‘দায়ী’ দলগুলোর তালিকায় জামায়াতকে শেষের দিকে রেখেছেন অথচ মানবতাবিরোধী অপরাধের বেলায় কেবল জামায়াতকেই টার্গেট করে বিষয়াবলি বর্ণনা করে গেছেন। জামায়াতের বিষয়ে কিছু ইতিবাচক বর্ণনা প্রদানের পর তিনি আবার কিছু নেতিবাচক বিবরণ দেন, কখনো একাত্তর দিয়ে ঘায়েল করা, কখনো বিচিত্রার বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি।
বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করতে গঠিত কমিটির প্রধান জহির রায়হান নিরুদ্দিষ্ট হওয়া এবং তদন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য কি জামায়াতের কোনো দায় আছে? এ বিষয়টি এখানে উল্লেখ করে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং বামপন্থি বুদ্ধিজীবীরা জামায়াতের বিরুদ্ধে যে একতরফা বয়ান তৈরি করে দিয়েছেন, তা-ই জামায়াত সংক্রান্ত ইতিহাসে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।
কিছু অসঙ্গতি, কিছু বিদ্বেষ
গ্রন্থের ৮৭নং পৃষ্ঠায় তিনি ১৯৬৯ সালে পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর জনসভা পণ্ড করে দেয়ার ঘটনার উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এখানে জনসভায় হামলা করে ২ জন জামায়াত কর্মীকে হত্যা ও বহুসংখ্যককে আহত করার নেতৃত্বকারী ‘দাদা’ সিরাজুল আলম খানের নাম উল্লেখ করেননি। যদিও মহিউদ্দিন তাঁর অন্য একটি গ্রন্থে এ ঘটনার জন্য সরাসরি নাম উল্লেখ করেই তার ‘দাদা’কে কৃতিত্ব দিয়ে সেই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করেছেন। জামায়াতের জনসভায় সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে হামলার কৃতিত্বসহ তার সেই পুরো বিবরণ তুলে দেয়া যেতে পারতো।
১২৮নং পৃষ্ঠায় লেখক ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করলেন এবং এর একজনকে ‘নরপিশাচ’ আখ্যা দিয়ে তাকে মাত্র এক সপ্তাহ পর ২১ ডিসেম্বর রামপুরা টেলিভিশনের কাছাকাছি স্থানে পাকড়াও হওয়ার কথা উল্লেখ করলেন। প্রশ্ন হলোÑ মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তারা কী করে নিশ্চিত হলেন যে উক্ত ব্যক্তি এ ঘটনার জন্যই ‘দায়ী’! আর এমন একজন ব্যক্তি এই চরম সময়ে কী করে রামপুরায় ঘুরে বেড়াতে সমর্থ হলেন!
১৩৪নং পৃষ্ঠায় পাকবাহিনী ৩০ লাখ লোককে হত্যা করে বলে ৪ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে এনা পরিবেশিত খবর মস্কোর পত্রিকা প্রাভদায় প্রকাশ পায়। একদিকে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ‘এনা’ বা ‘প্রাভদা’ কোন যন্ত্র দিয়ে গুনে ফেললো যে, এই যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে! আর এ বিবরণের সঙ্গে গ্রন্থের এবং জামায়াতে ইসলামীর কী সম্পর্ক, তাও বুঝা গেল না।
১৪২নং পৃষ্ঠায় ১৯৭৩ সালে দালাল আইনে মামলা দায়ের ও বিচারের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এ পরিসংখ্যান দিয়ে লেখক জামায়াতকে অভিযুক্ত করারই প্রয়াস চালিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
১৪৩নং পৃঠায় লেখক অধ্যাপক গোলাম আযমের ‘পলাশী থেকে পাকিস্তান’ নামের একটি বইয়ের রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই নামে অধ্যাপক গোলাম আযমের কোনো বইয়ের সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’ নামের যে বই আছে, তাতেও উক্ত ‘উদ্ধৃতি’ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গ্রন্থের ১৬৪ থেকে পরবর্তী কয়েকটি পৃষ্ঠাজুড়ে চরম বিদ্বেষী সাপ্তাহিক বিচিত্রার তথ্য প্রমাণ ও রেফারেন্সবিহীন কথিত প্রতিবেদনের ঢালাও ‘গালিগালাজ’ ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য তুলে দেয়া হয়েছে। যাতে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনই ঘটেছে। ১৬৮নং পৃষ্ঠায় কোনো রেফারেন্স ও সময় উল্লেখ ছাড়াই লিখে দেয়া হয়েছে যে, জামায়াতিরা নোয়াখালিতে হাফেজ্জী হুজুরের সভায় হামলা চালায়।
১৬৯নং পৃষ্ঠায় কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই উল্লেখ করা হয়েছে যে, “কেন্দ্র থেকে থানা পর্যায়ের কর্মীরা মাস শেষে বেতন পান। ঢাকা থেকে এই বেতন পাঠানো হয়। যারা ‘রুকন’ তাদের বেতন বেশি।” এভাবে বিচিত্রার ভুয়া তথ্যে ঠাসা এবং বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিহীন অপতথ্য তুলে দিয়ে বই ভারী করেছেন এবং এভাবে লেখক তার দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
১৭৫নং পৃষ্ঠায় ১৯৭১ সালে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা’র জন্য জামায়াতকে দায়ী করে একটি বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। এজন্য একটি ‘দলিল’-এর বরাত দেয়া হয়েছে। তবে সেটি কোন দলিল, কবে কোথায় এটি পাওয়া গেল বা প্রকাশ পেল তার কোনো উল্লেখ নেই।
২৪৪নং পৃষ্ঠায় এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীকরণের জন্য দায়ি করা হয়। কিন্তু এসব ঘটনায় শিবিরের অসংখ্য নেতা-কর্মী-সমর্থকের নিহত ও আহত হওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য বা বক্তব্য নেই।
২৬২নং পৃষ্ঠায় ১৯৭৩ সালে ঢাকা আলীয়া মাদরাসার এক ছাত্রকে শিবির কর্মীরা হত্যা করে বলে তথ্য দেয়া হয়েছে। যদিও ছাত্রশিবিরের জন্ম তার অনেক পরে- ১৯৭৭ সালে। তাছাড়া ছাত্রশিবিরের হাতে আরো কিছু ‘হত্যা’র ঘটনার ঢালাও বিবরণ দেয়া হয়, যেগুলোয় কোনো রেফারেন্স দেয়া হয়নি। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের বহুসংখ্যক নেতা-কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর একটিরও উল্লেখ নেই।
এতদসত্ত্বেও বলতে হয় যে, এই গ্রন্থ জামায়াত আগাগোড়াই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সুস্থ রাজনীতি ও সুশাসনের পক্ষে ছিল তার একটা প্রামাণ্য দলিল। পাঠকগণ যদি সতর্কতার সাথে গ্রন্থটির পাঠ গ্রহণ করে এতে ‘আরোপিত’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অংশগুলো আলাদা করে নিতে পারেন, তাহলে জামায়াত সম্পর্কে একটি মোটামুটি নিরপেক্ষ ধারণা গ্রহণ করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
বইয়ের কাগজ ও বাঁধাই ভালো হলেও প্রচ্ছদ পরিকল্পিত হয়নি। মূল্যও খানিকটা চড়া মনে হয়েছে। সম্ভবত তাজা এবং গরম মার্কেট ধরার প্রয়াসী হতে গিয়ে বইটি প্রচুর পরিমাণে ভুল বানানের শিকার হয়েছে। এমনকি সালও ভুল থেকে গেছে। তবে বইটি সহজ পাঠ্য, বর্ণনামূলক। যেকোনো পর্যায়ের পাঠকের জন্য সহজপাচ্য।