আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, ঐক্যের বিকল্প নেই
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:০১
সোনার বাংলা রিপোর্ট : ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের পতন হয়েছে। হাসিনা পালিয়েছে। কিন্তু তার দোসররা বসে নেই। ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছে। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই।
গত ১৯ জুলাই শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে লাখ লাখ জনতার সামনে এসব কথা বলেছেন বন্ধুপ্রতিম জাতীয় নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর এ বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেছেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান। তার বক্তব্য ও আরো একাধিক প্রতিবেদন সোনার বাংলার এ সংখ্যায় পত্রস্থ করা হয়েছে।
জাতীয় সমাবেশে হেফাজতের নায়েবে আমীর মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী বলেন, ফ্যাসিস্টকে চিরবিদায় করেছি। সব দলমতকে বলবো ঐক্যবদ্ধ হোন। ঐক্যের বিকল্প নেই। বিচ্ছিন্নতা অনৈক্যের কারণে ফ্যাসিস্টরা যদি কিছু করে ফেলে, তার দায়দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।
বক্তব্য শালীনতা বজায় রেখে বলতে হবে। ইসলামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হেফাজতের মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস মানি না, মানবো না। ফিলিস্তিনের গাজায় তারা এতদিন কী করেছে? কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। কুরআনবিরোধী কোনো আইন করা যাবে না।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ বলেন, জামায়াত আমাদের দাওয়াত দেয়ায় ধন্যবাদ জানাই। জামায়াত যে সাত দফা দিয়েছে, তা দেশবাসীর জন্য মঙ্গলজনক। এজন্য আমরা পুরোপুরি সমর্থন করি। জুলাই আন্দোলনের কারণে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। তাদের প্রতি কতৃজ্ঞতা। জামায়াত আমীর বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে। কিন্তু নওজওয়ানের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন। আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দিয়েছে, যুবকদের রক্ত দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাহলে নতুন বাংলাদেশ, ইসলামের বাংলাদেশ আমরা পাব, ইনশাআল্লাহ।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার বলেন, ফ্যাসিস্ট খুনিদের বিচারের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ জাতি চায় না।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য অভ্যুত্থান হয়নি। শুধু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে হলে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। যারা এ পদ্ধতিতে নির্বাচন চায় না, তারা জাতির সাথে প্রতারণা করে। দেশে ধর্ম পালনে কোনো জুলুম করতে দেবো না। সব ধর্মের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগ সরকার যে খুন, গণহত্যা চালিয়েছে স্বৈরাচারদের যদি বিচার না করা হয়, তাহলে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না। জাতিসংঘের অফিস কোনো আলোচনা ছাড়াই হয়েছে। এটা সরকার পারে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষ আজ নতুন দিনের প্রত্যাশা করে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাই একসাথে কাজ করবে এ প্রত্যাশা করে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, নতুন করে দেশের মানুষ শান্তিতে বাঁচুক। ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসরদের বিচার হতে হবে। নির্বাচন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। কেউ যেন আগের মতো গুণ্ডামার্কা নির্বাচন করতে না পারে। দেশপ্রেমিক জনতার জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। এর কোনো বিকল্প নেই। আগামীতে দেশ হবে ইসলামের দেশ। মানবিক দেশ।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর বলেন, ঐক্যবদ্ধ থাকায় জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়েছে। এখন ঐক্য থেকে সরে গেলে ক্ষতি হবে। শাসন ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন না করে নির্বাচনের দিকে হাঁটবেন না। লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। স্থানীয় সরকারে কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। অবিলম্বে স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে দুর্ভোগ লাঘব করুন। ডাকসুসহ সব ছাত্র সংসদ নির্বাচন এ সরকারকে দিতে হবে। অবিলম্বে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে। না হলে আমরাই ঘোষণা করব।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই মাসের মধ্যেই অভ্যুত্থানের শহীদ-গাজীদের স্বীকৃতি দিয়ে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ছাড়া একটি দেশ কখনোই আগাতে পারে না। গত ১৬ বছরে শিক্ষাঙ্গনকে অস্ত্র ও মাদকের কারখানা বানানো হয়েছে। অথচ জুলাই পরবর্তীতে এ সরকার শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশন করেনি। এটি লজ্জার। অবিলম্বে শিক্ষা সংস্কারে কমিশন গঠন করতে হবে। শিবির সভাপতি বলেন, প্রয়োজনে আবার জুলাই ফিরে আসবে। কিন্তু কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেবো না। এ সময় সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দ্রুত সব ক্যাম্পাসে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের আয়োজন করার আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপি উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশে আবারও মুজিববাদী-ভারতপন্থি শক্তি সক্রিয় হচ্ছে। এ দেশে আর কোনো পন্থির জায়গা হবে না। দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কোনো জায়গা হবে না। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের এক জুলাই পেরিয়ে আমরা আরেক জুলাইয়ে এসেছি। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মুজিববাদীদের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। গোপালগঞ্জে এখনো মুজিববাদীরা আস্তানা গেড়ে রয়েছে। শুধু আইনিভাবে এ মুজিববাদের মোকাবিলা করা যাবে না। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এ মুজিববাদের কোমর ভেঙে দিতে হবে। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এ মুজিববাদের প্রশ্নে অভ্যুত্থানের সব সৈনিককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, হাজারের অধিক ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সে স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমরা সুশীল সরকারের ভূমিকা চাই না। আমরা তাদের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের ভূমিকায় দেখতে চাই। বাংলাদেশে খুনি হাসিনার বিচার হতে হবে। দেশের বিচার বিভাগকে কোনো দলের বিচার বিভাগ হিসেবে দেখতে চাই না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্ষমতার তোষামোদ বাহিনী হিসেবে দেখতে চাই না।
জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, হিন্দু সম্প্রদায় এতদিন আওয়ামী লীগের কাছে রাজনৈতিকভাবে বন্দী ছিলাম। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ও হিন্দুরা নির্যাতিত হয়েছে। এখনো তারা ধর্ষণ করছে। সারা দেশে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করছে। ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে। আবার ফেরত আসুক চাই না। পিআর ছাড়া নির্বাচন হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে। এজন্য পিআর ছাড়া আমরা নির্বাচনে যাব না। জামায়াতও যেন না যায়।
বিএনপির সাবেক নেতা ড. ফয়জুল হক জামায়াত আমীরকে জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ঘোষণা করে বলেন, আগামীতে দেশে ইসলামের পক্ষের বাংলাদেশ হবে। কোনো চাঁদাবাজদের হাতে দেশ ছেড়ে দেয়া হবে না।
শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী বলেন, আবু সাঈদ যে দাবিতে শহীদ হয়েছে, সে দাবি এখনো পূরণ হয়নি। হত্যার কোনো একটি বিচারও হয়নি। যদি দাবি পূরণ করতে না পারেন, তাহলে আবু সাঈদকে ফেরত দেন। নির্বাচনের আগে বিচার প্রয়োজন। খুনি ফ্যাসিবাদীরা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বিচার করতে হবে।
বুয়েটের শহীদ আববারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, হলে হলে র্যাগিংয়ের কারণে যারা শহীদ হয়েছে, তাদের তালিকা করে তাদের হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার এখনো কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, সকল কালাকানুন সংস্কার করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে বিচারপতির মতো সম্মানজনক আসনে বসে কেউ বলার সাহস না পান, ‘আমরা শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’।
বিডিপির সভাপতি এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ৭ দফা দেশের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি।
খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা আবদুল জাব্বার বলেন, ইসলাম কায়েমে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
জাতীয় প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দলের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, যারা নব্য ফ্যাসিস্ট সাজতে চাচ্ছেন ও নতুন করে আওয়ামী বয়ান হাজির করছেন, তাদেরও জনতা বিতাড়িত করবে।
খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান হামিদি বলেন, এদেশের মানুষ ইসলামন্থিদের ঐক্য চায় । তারা ইসলামী দলগুলোর একটি ব্যালট বক্স চায়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ন্যায় ও ইনসাফের আদর্শের আলোকে শিক্ষা ছাড়া সৎ-যোগ্য জাতি গঠন করা যায় না। এ সত্য উপেক্ষা করে সরকার শিক্ষা সংস্কার এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এ সরকার বিভিন্ন কমিটি গঠন করে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। তিনি অবিলম্বে শিক্ষা সংস্কার কমিটি সরকার দাবি জানান।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল মো. আতিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি রক্ত জড়িয়েছে। কিন্তু তারাই এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তিনি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রেখেছেন জুলাইযোদ্ধা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের প্রতিনিধি এম এইচ মোস্তাফিজুর রহমান, মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিনিধি জুনইদুর রহমান, কওমি মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিনিধি রেদোয়ান নাবিল, প্রবাসীদের প্রতিনিধি ব্রিটেন প্রবাসী মাওলানা মওদূদ হাসান, শহীদ শাহরিয়ার হাসান আলভীর পিতা আবুল হাসান, শহীদ ইমাম হাাসান বাইয়াতের ভাই বরিউল ভ্ইূয়া, আহত জুলাই যোদ্ধা মো. শাহ আলম প্রমুখ।