শুভ জন্মদিনে প্রসঙ্গ—অনুষঙ্গঃ কবি মোশাররফ হোসেন খান

নূরুন্নাহার নীরু
২৩ আগস্ট ২০২৫ ১৫:৫০

সিন্দুকের জমানো টাকা খরচ হওয়ার মতই জীবনআয়ুর পাতা ঝরে পড়ে বছরান্তে ; তবু আমরা বলি শুভ জন্মদিন! যেহেতু আমরা জানিনা মওজুদ পাতা আর কতটা বাকী আছে৷তাই স্মরণ করি মহাপ্রভূকে৷ যেন সে কটা জীবনপাতা থাকে উজ্জল, সজীব, অম্লান৷ এমনি প্রার্থনায় আজো করছি নিবেদনঃ প্রিয় মুখ দেশবরেন্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক সর্বোপরি সম্পাদক ( মাসিক নতুন কিশোর কন্ঠ, নতুন কলম) শ্রদ্ধেয় কবি মোশাররফ হোসেন খানকে৷ আজ ২৪ অগাস্ট কবি জীবন বৃক্ষের নতুন পাতায় নতুনতম নাম লিখেয়েছেন৷ মহান রাব্বুল আ’লামিন তাঁকে কবুল করুন৷ ” শুভ জন্মদিন প্রিয় কবি! “কবিকে নিবেদন করে লেখা আমার আজকের নিবন্ধ—

“ভালোবাসা অমর হোক, মানবতার জয় হোক”— বইটি খুললে প্রথমেই চোখে পড়বে এ স্লোগানটি৷ যা থেকে অনায়াসেই অনুমান করা যাবে; এ গ্রন্থের লেখক একজন মানবতার কবি—মানবতার জন্যই যাঁর ভালোবাসা উৎসর্গীকৃত৷ তাইতো তাঁর কবিতায় উদাত্ত ভালোবাসার আখরে ফুটে উঠেছে স্বীয় পরিচিতিঃ “আমি এই সবুজ মৃত্তিকারই এক অধঃস্তন কবি— যে মাতৃদুগ্ধের ঋনের মতো স্বদেশের দায় ভারও সমান বয়ে বেড়াচ্ছে৷” —(কবিতাঃস্বপ্নের সানুদেশ) আবার তিনি তাঁর পরিচিতির স্বাক্ষর রেখেছেন “শিকারি” কবিতায় এভাবেঃ
” আমি শিকারি কিংবা তীরন্দাজ নই, কবি৷
‘কাল’কে বিদ্ধ করার মতো শিল্পীতো দক্ষতা ছাড়া আর কোন কৌশলই
আমার জানা নেই৷”

— বলছিলাম একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ,সম্পাদক জনাব মোশাররফ হোসেন খান সম্পর্কে এবং তাঁর প্রকাশিত কবিতা সমগ্র—২ এবং ভিন্ন মাত্রায় রচিত কিশোর উপন্যাস “সাগর ভাঙ্গার দিন” নিয়ে৷

ঠিক যখন করোনাকালীন দুঃসময় আমরা বিষন্নতা আর উৎকন্ঠার চাদরে আবৃত তখনি এমন বেসামাল জীবনকেও বই দুটি পেরেছে স্বস্থি, শান্তি আর আশাবাদীতার নোঙ্গরে স্থির করে তুলতে, পেরেছে দেশ-জাতি-বিশ্ব-সর্বোপরি নিজকে ভালোবাসার অমিয় সূধায় স্নাত করে তুলতে৷ তাইতো দেখেছি কবির ভাষায় তাঁর ‘আলোর উত্তাপে’ কবিতায়ঃ
” যারা চলেছে প্রান্তর এই পথ ধরে
তারাই তো প্রদীপের চারপাশে ঘোরে—

আশা জাগানিয়া চেতনা বক্ষে নিয়ে তিনি তাঁর ‘মেধাবী পর্বত ‘ কবিতায় লিখেছেন;”
“শূন্যের গভীরে আছে আর এক শূন্য
দীপ্তিমান শূন্য যেন সাপের জিহ্বা৷
তবুও ভালো-চিরায়ত শূন্যের ভেতর
আছে বিস্তীর্ন জীবন, স্বপ্ন-সম্ভাবনা
আছে ব্যাকুল প্রত্যাশা-মেধাবী পর্বত৷”

আরো লিখেছেন, ‘পা তোলা, পা ফেলা’ কবিতায়ঃ
“প্রকৃত অর্থেই আমি অনেক বেশী ঋনী-
ক্ষুধা, ক্রন্দন আর জমাটবাঁধা পাথর সময়ের কাছে৷
কারণ, একদিন আমাদের সম্মিলিত রোদনই শিখিয়েছিল—
দুঃসহ প্রহরকে বিদীর্ণ করে
কিভাবে পা তুলতে হয়,
পা ফেলতে হয়৷”

অসাধারণ কাব্যিক সৃষ্টি৷ যা পাঠকের হদয়কে শুধু ছুঁয়েই যায় না ভাবিয়েও তোলে জীবনবোধের জিজ্ঞাসা নিয়ে৷

তবু পর পর বই দুটো হাতে পেয়ে কোনটা রেখে কোনটা পড়ি এমনি এক মানসিকতায় মজা করেই একটু ক্ষেদোক্তি করেছিলাম কবিকে— ‘একই বছরে গল্প-কবিতা দু’টোই বের করলে পাঠক কোনটি রেখে কোনটি পড়বে? ‘ নরম হৃদয়ের সরল কবি বিনয়ের সাথে বলেছিলেনঃ” আপা জুলুম হলে থাক!” হা হা হা! তাও কি হয়! ছোট বোন হিসেবে বড় ভাই তথা গুনীজনের প্রতি এটা আমার দায়বদ্ধতা৷ নিজেও যেহেতু একই জগতের মানুষ! একজন লেখক যদি আর একজন লেখকের হৃদয় কথন পড়তে না জানে, বুঝতে না পারে তাহলেতো লেখালেখির জগতের কাঙ্খিত উৎকর্ষতাই হারিয়ে যাবে! কবির ভাষাতেই বলি তবেঃ
“আমরা সেই মনুষ্য প্রভা—
আমাদের প্রপিতার দরোজায় এখনো দুলছে প্রজ্ঞা ও প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্ব৷
আমরা মূলত তাঁরই অধঃস্তন, উদ্দীপ্ত উত্তরসূরি ৷” ( কবিতাঃ প্রত্নতত্ব)
‘ প্রশান্তির উপত্যকা’ কবিতায় তিনি বলেছেনঃ
“একমাত্র ‘বিশ্বাস’ ছাড়া মানুষের আর কোন্ সম্পদ আছে?
আর একজন কবির জন্য এই সম্পদের বড় বেশী প্রয়োজন৷ ” —ওই কবিতারই শেষাংশে তিনি লিখেছেনঃ “একমাত্র কবিই পারেন উপেক্ষা, ঘৃণা ও লালসার পর্বত টপকাতে৷
মূলত বিশ্বাসী কবি কখনো পরাজিত হয় না৷”

দেশ—জাতি—ভাষার প্রতি ভালোবাসা নেই কার! — আর সে যদি হয় কবি তবেতো এ ভালোবাসা বিরাজিত থাকে কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রস্ফুটিত হয়ে৷ এই যে যেমন তিনি লিখেছেন ;
“স্বদেশ আমার সূর্য হাজার রাজ্যিসেরা সুখ
সবুজ-সোনা আল্পনাতে ভাসে তারই মুখ৷”
( দেশের জন্য)
‘এদেশ আমার’ কবিতায় তাঁর দেশমাতার উপমাটা যেন এক “পটে আঁকা” ছবি৷ যাকে পাঠ করতে করতে দিব্যি চোখে ভেসে উঠবে এক অনন্য চিরচেনা চিত্র! যেমন বলেছেন; ” এদেশ আমার কলমি ফুলের কোমল মুখের টোল৷”

‘আমার প্রিয় মাতৃভূমি ‘ কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে তাঁর চির কাঙ্খিত জয়গানঃ
“আমার এদেশ হোক স্বাধীনতার শান্তির কপোত
আমার এদেশ হোক সকল বৈরীতার বিরুদ্ধে
ছায়া ঘেরা অভয় অরণ্য
আমার এদেশ হোক উপমারোহিত এক প্রশান্ত নীড়
প্রগাঢ় প্রণয় ও প্রতীতির প্রশস্ত নিলয়৷”

প্রিয়তম মাতৃভূমিকে নিয়ে তাঁর বর্ণনার শেষ নেই৷ এই যেমন ‘আমার সবুজ বাংলা’ কবিতায় তিনি বলেছেনঃ” এ আমার দেশ—
বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির মতো সঘন
দৃষ্টির কাঁপন
শত স্মৃতি বিস্মৃতির ইতিহাসে মোড়ানো ঐ বর্ণিল আকাশ
সবুজ ঘাসের গালিচাসমৃদ্ধ এদেশ যেনো আমার পবিত্র জায়নামাজ৷”

আমাদের মাতৃভাষা প্রাণের ভাষার প্রতি তাঁর আবেগ ঝরেছে এভাবেঃ
“দিবারাত্রি স্বপ্ন দেখি
নানা বর্ণে কাব্য লিখি
হাজার রঙে চিত্র আঁকি
আর—
মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকি
তোমার মুখের দিকে,
তুমি ছাড়া এই মুখে মা—
সবই তিতো, ফিকে৷ (বাংলা ভাষা)
আবার ‘ একুশ যখন আসে’ কবিতায় বলেছেনঃ
একুশ যখন আসে
একটি চোখে শোকের নদী
অন্য চোখটি হাসে৷
‘মাতৃভাষা” কবিতায় বলেছেনঃ
সকল রোদন কিংবা উচ্ছ্বাস
যে কলগুঞ্জন সৃষ্টি করে আমার ভেতর—
সে কেবল ভাষা৷
এভাবে ‘জাগ্রত বর্ণমালা’ কবিতায় এঁকেছেনঃ
এ আমার লাঙলের ফলা, হাওয়ায় কেঁপে ওঠা
গহনা নৌকার বাদাম,
কুমোরের সুনিপুন কারুকাজ;
আমার প্রিয় বর্ণমালা—”

অসাধারণ নৈপূন্যতায় এঁকে গেছেন তিনি তাঁর পয়মন্তহৃদের অনুপম ছবি কবিতায় কবিতায়৷ তাইতো খুব সহজেই হৃদয় জয় করে নিতে পেরেছিলেন তিনি সেই আশির দশকে আমার মত নীরবে নিভৃতে থাকা আরো অনেক উঠতি কবিদেরে ও৷

আসলে বিশুদ্ধ চিন্তা-দর্শনের অনুগামী কবি মোশাররফ হোসেন খান— সে সময়ের আরো দশজন কবির মাঝে যে কোনো সত্যানুসন্ধ্যিতসুর হৃদয় কেড়ে নেবার মতই একজন কবি৷ —যার প্রথম কবিতা পড়েই তাঁকে বিভক্ত করে নেয়া যায় সহজেই৷ আর এভাবেই তিনি আমার মত অনেকেরই প্রিয় হয়ে উঠেন অনায়াসেই৷

তাহলে গোড়ার দিক থেকেই একটু বলতে হয় যা কাহিনী হলেও গল্পের মতই; আশির দশকে আমিও লিখছিলাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, বিশেষ করে দৈঃইত্তেফাক (কচিকাঁচার আসর), দৈঃ সংগ্রাম, সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় —শুধু কবিতা নয়, ছোটগল্প, কথিকা, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার এমনকি রান্নাবিষয়ক লেখাও৷ দৈঃ সংগ্রামে “মেরুদেশী” ছদ্মনামে সমসাময়িক পরিস্থিতির উপরেও প্রতিবেদন লিখে চলছিলাম নিয়মিত৷ এ ক্ষেত্রে স্বনামধন্য সম্পাদক ‘আবুল আসাদ ‘ সাহেবের কাছে আমি ঋনী ৷ ওনার ছোট ছোট কন্যারা তখন আমার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিষ্য৷ ওদেরকে নিয়েই গড়ে ওঠে তৎসময়ের “রাইয়্যান শিল্পীগোষ্ঠী” ৷

কিন্তু বিশ্ব বিঃ এর পাঠ শেষে , চিকিৎসক স্বামীর সংসারে অনুগামী হয়ে ছাড়তে হলো ছাত্রীঅঙ্গন তথা রাজধানীও ৷ পরবর্তীতে সরকারি চাকুরী, সন্তান লালন ইত্যাদি কারনে প্রায় নব্বই দশক এর আগেই ছাড়তে হলো লেখার জগৎও৷ কিন্তু পাঠ থামেনি আমার—মফস্বলে থাকলেও (শেরপুর জেলা শহর) আমার সাহিত্যামোদী স্বামীর সাহচর্যে নিয়মিত পত্রপত্রিকা পাঠে বেশ কিছু প্রিয় কবির নাম যেমনঃ কবি তমিজউদ্দীন লোদী, আব্দুল হালিম খাঁ, আব্দুল হাই শিকদার, হাসান আলীম, আসাদ বিন হাফিজ, কবি মতিউর রহমান মল্লিক , কবি সাজ্জাদ হোসাইন প্রমুখের নাম গেঁথে যায় হৃদয়ের একাংশে আর এঁদের মাঝেই ‘কবি মোশাররফ হোসেন খান ‘ ছিলেন আরো একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বলে৷
পরবর্তীতে যাঁর বই পড়ে আরো বেশী তাঁকে অনুধাবনের সুযোগ পাই৷ বলতে হয় আশির দশকের মুষ্টিমেয় হলেও কয়েকজন নারী লেখক এর নামও হৃদয়ে আঁকা আছে আজোব্দি ৷ যেমনঃ নয়ন রহমান, দিলারা হাফিজ, ঝর্নাদাসপুরোকায়স্থ, সালমা চৌধুরী, আসমা আব্বাসী এছাড়াও ইসলামী সাহিত্যে হাফেজা আসমা খাতুন, শামছুন্নাহার নিজামী, ফজিলা তাহের মিতু, ফজিলাতুলক্কদর , মাহমুদা হক আলফা, খন্দঃআয়েশা খাতুন — এ নাম গুলো অন্যতম৷

দীর্ঘ ২৫ বছর বিরতি দিয়ে আমিও ফিরে আসি পুনরায় লেখালেখির আপনালয়ে— অনলাইন অফলাইনে আল্লাহ চাহেত মসি চলছে সমানবেগে৷ ইতোমধ্যে থিতু হই প্রাণের ঢাকাতে৷ অবসরে এসেই বের করি প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মেহেদি পাতার বিষ্ময়’-২০১৯ সালে৷ পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ এর বই মেলায় আসে শিশুতোষ—’ রিনরিন ছন্দে’, ‘কিশোর কবিতা—’মুখরিত স্বর’ এবং’ অমলিন১ম দিন’—আর সে সময় থেকেই প্রশস্থ চিত্তের অধিকারী মোশাররফ হোসেন খানের সান্নিধ্য লাভ করি মাসিক কিশোর কন্ঠে লেখার মধ্যদিয়ে৷ শুধু তাই নয় তিনি আমার ‘মুখরিত স্বর’ গ্রন্থটিতে প্রাসঙ্গিক কথাও লিখে দেন অকুন্ঠচিত্তে প্রাণউজাড় করে যাতে লেপ্টে আছে সত্যেরই জয়গান৷
সাহিত্যের আকাশে মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে উড়ে বেড়ানোর প্রথম সুযোগ করে দেন আমার স্বামী ডাঃ আঃ জলিল আর দ্বিতীয় মানুষটিই হলেন আমার এই ভাতৃপ্রতিম শ্রদ্ধেয় কবি ভাই মোশাররফ হোসেন খান৷ যাঁকে দূর থেকেই আপনার চেয়েও আপন ভেবে এসেছি৷ আজ আমরা অনেক কাছের হতে পেরেছি শুধুমাত্র একটা আদর্শিক চেতনায় যা মানুষকে গড়ে তোলে আত্মার আত্মীয় রূপে৷

ঢাকায় এসে প্রথমেই হাতে পেয়েছিলাম তাঁর শ্রেষ্ঠগল্পের বইটি৷ আর সেই করোনাকালে পেলাম ‘কবিতা সমগ্র—২’ এবং কিশোর উপন্যাস ‘সাগর ভাঙার দিন৷’ যখন কবিতার বইটিতে মগ্ন ঠিক তখনি হাতে এলো উপন্যাসটি৷ স্বভাবগতভাবেই উপন্যাসটিই আগে পড়ে ফেললাম৷ সত্যিই চমৎকার একটি শিক্ষণীয় বই৷ অবাক হয়েছি তাঁর রচনাশৈলীর সরল প্রবাহে৷ মুগ্ধ হয়েছি সাবলীল বর্ণনায় গভীর অনুভূতির দাগ কেটে দেয়ার দক্ষতায়৷ মনে হলো আজকের কিশোর সমাজ মোবাইল / টেব রেখে যদি এ ধরনের বই হাতে তুলে নিত—দায়মুক্ত হতাম আমরা লেখক সমাজ! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলি ,বইটা আমি যত্ন করে রেখে দেব আমার পরবর্তী প্রজন্ম আমার আদরের নাতি- নাতনীদের জন্য৷ ওরা জানবে বুঝবে ৷একসময়ের বাঙালীসমাজ চিত্রের’ সাগর ভাঙার দিনগুলো৷’— মনুষত্ব নিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে এসব কাহিনী জানা কত প্রয়োজন৷ সাথে সাথে মনে পড়ে গেল আমাদের সময়ে ডঃ লুৎফুর রহমানের লেখা বই সমূহের কথা ৷হায়! কোথায় হারালো নৈতিক শিক্ষাদি? উপন্যাসটিতে বেশ কিছূ ছড়া আছে যা নিছক ছড়া কাটাই নয় বরং তাতে রয়েছে জীবনের গভীর তাৎপর্য নিহিত৷ অসাধারণ একটি উপন্যাস৷ বলা চলে কথা সাহিত্যেও তিনি রেখেছেন অনুপম দক্ষতার স্বাক্ষর৷

সাহিত্যের বিভিন্ন আঙিনায় তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর জানা যায় তাঁর জীবনী পাঠে৷ বলা যায় কিশোর বয়স থেকেই তিনি এ গুনগানের অধিকারী হয়ে উঠেন৷ ইদানীং সময়ে কবিকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশেষ করে দৈঃসংগ্রামে প্রকাশিত (২১/০৮/২০২০) মুহম্মদ মতিউর রহমান এর লেখা “মোশাররফ হোসেন খান ও তার কবিতা” আমার দৃষ্টি কাড়ে৷ অবাক বিষ্ময়ে মুগ্ধ হই—”জানা হয়েও জানলাম না যাঁকে তিনিই সেই!”— সর্বদা তাঁর উত্তোরোত্তর উচ্চতা কামনায় আমার হৃদয় ভরে উঠে৷

আবারো ফিরে আসছি কবিতা সমগ্রে৷ কারণ কবি মোশাররফ হোসেনের লেখা কবিতাগুলো যেনো সময়ের এক একটা বুলেট—যার কোনো কাল নেই—হতে পারে অতীত, হতে পারে ভবিষ্যত কিংবা বর্তমানই কম কিসে! বইটি মোট ছয়টি কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত৷ যথাক্রমে সবুজ পৃথিবীর কম্পন, স্বপ্নের সানুদেশ, পিতার পাঠশালা,অগ্রন্থিত কবিতা, প্রবচন গুচ্ছ, কিশোর কবিতা ৷

বইটি পড়তে পড়তে যে কেউ হারিয়ে যাবে কবিতা বুননে কবির শিল্পময়তায়৷ যেমনি তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়া, তেমনি গভীর দর্শন, তেমনি উপমা, উৎপ্রেক্ষায় হৃদয়ের কথনে ঋদ্ধিক বুনন৷ যেমন তাঁর ‘পথের ওপাশে ‘ কবিতায় এঁকেছেন তিনি এক অনাগত ভবিষ্যতের চিত্র যা অতীতকে ম্লান করে সম্মুখে এগিয়েছেঃ
‘দশটি বছর—
এভাবেই পথটি বয়ে চলেছে আঁকা বাঁকা ক্রমাগত!
কবিও জানে না পথের দূরত্ব
কিংবা কি আছে পথের ওপাশে !

সামাজিক অবক্ষয় যে কোনো কবিহৃদয়কে কাঁদিয়ে ছাড়ে— এটাই স্বাভাবিক কিন্তু তাঁর প্রকাশের সাবলীলতা অনুপম৷ এই যেমন তিনি বলেছেন তাঁর “তরল ছেলেরা” কবিতায়ঃ
” তরল ছেলেরা—
যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি
প্রবেশ করছে বহু বর্ণিল বোতলে
এবং মূহূর্মূহূ ধারণ করছে বোতলের রঙ৷
তাদের নিজস্ব কোনো রঙই হলো না৷ ”

এভাবে তিনি অবক্ষয়জড়িত সামাজের দৈন্যদশা তুলে ধরেছেন তাঁর আরো কবিতায় যেমনঃ

‘ যারা প্রশান্তির মানচিত্র খামচে ছিন্নভিন্ন করতে চায়
যারা ঘুমের দরোজায় টাঙিয়ে দেয় যুদ্ধের নিশান
যারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে
জনপদ এবং মানবতার সকল নিবাস,
তাদের প্রতিকূলে এসো হে শতাব্দী—
এসো আর এক উদগ্র মহাকাল৷
(বিনাশের পর)

পৃথিবীর ভবিষ্যত নিয়ে উৎকন্ঠিত কবি তাঁর ‘পৃথিবীর ভবিষ্যৎ’ শিরোনামেই লিখেছেনঃ
আর পৃথিবীর ভবিষ্যৎ!
মীরজাফর কিংবা মোহম্মদী বেগ
যতদিন আছে চারপাশে—
ততোদিনই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ—
শূন্য, শূন্য এবং মহাশূন্য!

সম্ভবত পৃথিবী আর কখনো
সাবালক হবার সুযোগই পাবে না!

লিখেছেন’ চালচিত্র’ কবিতায়ঃ
শকুন ও শৃগালের এখন ময়ূরের চেয়ে কদর বেশি,
ঘুঘুর ডাকের চেয়েও অধিক প্রিয় কাকের কর্কশধ্বনি!
হলুদগাঁদা কিংবা কাশফুলের শুভ্রতা এখন মৃত্যুর প্রতীক,
আর ধানের কচিডগা কিংবা বকের ডানা এখন
মারনাস্ত্রের স্বারকচিহ্ন!

তারপরেও স্বপ্ন দেখেন কবি৷ যেহেতু স্বপ্নের মাঝেই বেঁচে থাকে মানুষ—মানুষের সৃষ্টিকর্ম৷ কবি মোশারফ হোসেন খান ও তার ব্যতিক্রম নন৷ তাইতো তিনি তাঁর কবিতা “স্বপ্নের সীমানা”য় ফুটিয়ে তুলেছেনঃ
“বৈশাখের দাবদাহের পর
যদি পাই এক পশলা বৃষ্টি
তাতেই জুড়িয়ে যায় আমার দৃষ্টি
আর অনেক বেশী তৃপ্তি ও সুখ
যখন শিউলি ফুলের মতো চোখে ভাসে
কচি ঘাসের ডগার মতো শিশুর মায়াবী মুখ৷”

অসাধারণ আত্মবিশ্বাসে মহীয়ান কবির বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের ছাপ এঁকে গেছেন তিনি তাঁর “গতির বিবরণ” কবিতায়ঃ
আমাকে নয়,
যদি পারো নদীকে বলো গতি ফেরাতে
সময় ও সমুদ্রকে বলো
বলো বাতাস ও বারুদকে৷
————————————–
আমি যদি ফেরাই গতি
তাহলে থাকেনা মানুষ আর মানুষের মতো
থাকে না কোনো মনুষ্য-মহত্ব
কিংবা স্রোতজ পরিচিতি৷
———————————————-
মহা পৃথিবী আমি স্মৃতি অগণন
মূলত মানুষ আমি অবিনাশী গতির বিবরণ৷

চমৎকার চমৎকার ভাবনার ফসিল সমৃদ্ধ “কবিতা সমগ্র-২” যে কারো হৃদয়কে নাড়া দেবে, জাগিয়ে তুলবে চেতনার বলয়৷ আর সেটিই হোক বাস্তব —সাহিত্যের অঙ্গনে এ বইটি কবিকে আরো সমৃদ্ধশালী করে তুলুক এমনি দোয়ার প্রত্যাশায় কবির সার্বিক মঙ্গল কামনা করছি ক্ষুদ্র এই আমি৷ # নূরুন্নাহার নীরু, কল্যানপুর, ঢাকা৷