ভারতের গুপ্তচর, র’-এর এজেন্ট, রবীন্দ্র কৌশিক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হয়েছিলেন
২৭ মার্চ ২০২৬ ২১:১২
রবীন্দ্র কৌশিক ও গোয়েন্দা বৃত্তির অন্ধকার গলি
প্রতিভাবান থিয়েটারশিল্পী হিসেবে তারুণ্য শুরু হয়েছিল রবীন্দ্র কৌশিকের। ১৯৫২ সালে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে তার জন্ম। একক অভিনয়ে তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। সত্তরের দশকের শুরুতে লখনৌর এক মঞ্চে রবীন্দ্রের ‘কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘দ্রুত চরিত্র পরিবর্তনের ক্ষমতা’ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর নজর কাড়ে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে একজন থিয়েটারশিল্পী মানে হলো এক ‘খালি ক্যানভাস’, যাকে ইচ্ছামতো যেকোনো ছাঁচে ঢালাই করা যায়। রবীন্দ্র কৌশিককে যখন দেশের স্বার্থে ভিনদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়, তখন মাত্র ২১ বছরের যুবক। ওই বয়সের রোমাঞ্চ আর অজানাকে জানার ইচ্ছা তাকে এ বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিয়েছিল।
১৯৭৩ সালে রবীন্দ্র কৌশিককে দিল্লিতে নেয়া হয়। শুরু হয় দুই বছরের ক্লান্তিকর প্রশিক্ষণ। তাকে পাঞ্জাবি ভাষা থেকে বের করে এনে নিখুঁত উর্দু ও লখনৌভি উচ্চারণে দক্ষ করে তোলা হয়। শেখানো হয় কোরআন শরিফ পাঠ, নামাজের নিয়ম ও মুসলিম সংস্কৃতির খুঁটিনাটি বিষয়াদি। এমনকি তার শরীরের জন্মগত চিহ্নগুলো মুছে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় এবং ধর্মীয় ছদ্মবেশ পোক্ত করতে খতনাও করানো হয়। প্রশিক্ষণ শেষে রবীন্দ্র কৌশিক হয়ে উঠলেন নবী আহমেদ শাকির।
১৯৭৫ সালে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর শুরু হয় ছদ্মবেশী জীবন। পপ-কালচার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দাবি করা হয় যে রবীন্দ্র পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ‘মেজর’ হয়েছিলেন। তবে এ তথ্যকে অতিরঞ্জন হিসেবে দেখেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও এসপিওনাজ বিষয়ক গবেষকরা। রবীন্দ্র কৌশিক করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাকিস্তানের সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল তার। পড়াশোনা শেষে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিলিটারি অ্যাকাউন্টস বিভাগে সাধারণ কেরানি হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রশ্নটি স্বাভাবিক যে সাধারণ একজন কেরানি ভারতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন? এসপিওনাজ বিশ্লেষকদের মতে, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তুলনায় কেরানি প্রায়ই বেশি কার্যকর। কারণ সেনাবাহিনীর প্রতিটি ইউনিটের রসদ সরবরাহ, রেশন ও বেতনের ফাইল একজন কেরানির হাত দিয়েই যায়। সেনা সদস্য বা কোনো ইউনিট কোথায় বদলি হচ্ছে, তা আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র দেখে সহজেই বোঝা যায়। এছাড়া অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের নথিতে যুদ্ধের প্রস্তুতির আগাম সংকেত লুকিয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্র কৌশিক ১৯৭৯-৮৩ সালের মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে এমন কিছু সংবেদনশীল তথ্য দিয়েছিলেন, যা ভারতের জন্য সামরিক কৌশল সাজাতে অত্যন্ত সহায়ক ছিল। তথ্যের বহুল প্রবাহ দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ উপাধি দিয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
সংসার ও মিথ্যা সম্পর্কের যাতনা
একজন সফল ‘স্লিপার সেল’ বা ‘ডিপ কভার এজেন্ট’ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, শত্রুর দেশে নিজের শিকড় গেড়ে ফেলা। রবীন্দ্র কৌশিকও তাই করেছিলেন। তিনি আমানত নামের এক স্থানীয় সেনাসদস্যের মেয়েকে বিয়ে করেন। তাদের এক পুত্রসন্তানও ছিল।
সংসার ছিল পাকিস্তানে তার ছদ্মবেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। স্ত্রী কোনোদিনও জানতে পারেননি, তার সন্তানের বাবা আসলে একজন ভারতীয় হিন্দু যুবক, যার প্রকৃত নাম রবীন্দ্র কৌশিক। এসপিওনাজ জগতে এটা সত্য যে নিরন্তর নিজের সঙ্গে যুদ্ধ এবং একটি ছদ্মবেশকে নিজের অস্তিত্ব বানিয়ে ফেলা। আর এটাই হলো গুপ্তচরের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
যে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই
রবীন্দ্র কৌশিকের সাজানো জগতের পতন ঘটে ১৯৮৩ সালে। গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসে একে ‘কমিউনিকেশন ফেইলর’ হিসেবে দেখা হয়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা তাকে সহায়তার জন্য ইনায়ত মসিহ নামে এক নতুন এজেন্টকে পাকিস্তানে পাঠায়। কিন্তু মসিহ সীমান্ত পাড়ি দেয়ার পরপরই পাকিস্তানের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের হাতে ধরা পড়ে যান।
পাকিস্তানি গোয়েন্দারা মসিহকে নির্যাতনের মুখে কথা বলতে বাধ্য করেন। নবী আহমেদ শাকিরের পরিচয় ফাঁস করে দেন তিনি। শিয়ালকোটের একটি পার্কে মসিহ ও কৌশিকের দেখা হওয়ার কথা ছিল। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দারা। রবীন্দ্র কৌশিক যখন দেখা করতে যান, তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কারাগারের অন্ধকার ও রাষ্ট্রের নীরবতা
গ্রেফতারের পর রবীন্দ্র কৌশিককে শিয়ালকোটের এক টর্চার বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে পরিবারকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, দীর্ঘ সময় ঘুমাতে দেয়া হতো না এবং অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হতো।
রবীন্দ্র কৌশিককে ১৯৮৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, পরে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। এরপর ১৬ বছর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন কারাগারে কাটান। ওই সময়ে ভারত একবারো তাকে নিজেদের লোক বলে স্বীকার করেনি। গুপ্তচরবৃত্তির ভাষায় একে বলা হয় ‘প্লাউসিবল ডিনাইবিলিটি’। অর্থাৎ ভিনদেশে কোনো এজেন্ট ধরা পড়লে তারা ‘লাওয়ারিশ’ হয়ে যায়।
২০০১ সালে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে রোগে ভুগে মারা যান রবীন্দ্র কৌশিক। তাকে কারাগারের পেছনেই একটি নামহীন কবরে মাটি দেয়া হয়।
গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যর্থতা?
রবীন্দ্র কৌশিকের কাহিনী থেকে কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে যায়। প্রথমত সমন্বয়হীনতা। একজন অভিজ্ঞ এজেন্ট যিনি আট বছর ধরে সফলভাবে কাজ করছেন, তার কাছে একজন অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত নতুন এজেন্ট পাঠানো কি চরম খামখেয়ালি ছিল না?
বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্র কৌশিকের পরিবার একাধিকবার অনুরোধ করলেও তৎকালীন ভারত সরকার আমলে নেয়নি। ১৯৯৯ সালে তার ভাই এবং বৃদ্ধ মা প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হলেও কোনো সরকারি সাহায্য জোটেনি।
মিথ বনাম ইতিহাস
ভারত সরকার বা ‘র’ কখনো প্রকাশ্যে রবীন্দ্র কৌশিকের গুপ্তচরবৃত্তি স্বীকার না করলেও ভারতীয় জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্রে প্রায়ই দেশপ্রেম জাগাতে তার গল্প অনুকরণ করা হয়। সালমান খান অভিনীত ‘এক থা টাইগার’-এ এর অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। সিনেমার নামটিও এসেছে সেখান থেকে। সর্বশেষ ‘ধুরন্ধর’ সিনেমার প্রচারে খোলাখুলি বিষয়টি ওঠে আসে। তবে রবীন্দ্রের পরিবারের চাপে গল্পটি কাল্পনিক বলতে বাধ্য হন নির্মাতা। বিশ্লেষকরা বলেন, এসব সিনেমা সংশ্লিষ্ট দেশে আবেগ বাড়ালেও গুপ্তচরবৃত্তির নিষ্ঠুর দিকটি প্রায় আড়াল করা হয়। কারণ নিষ্ঠুর সত্যটি হলো, রাষ্ট্র যতক্ষণ কাজ করতে সক্ষম ততক্ষম স্লিপার এজেন্টকে মনে রাখবে। আর ধরা পড়লে তারা শুধুই একটি ‘বোঝা’। – ফিচার উৎস: বণিকবার্তা