নারী নির্যাতনের বিবিধ রূপ কোথায় মুক্তির সোনালি দিগন্ত?

প্রিন্ট ভার্সন
১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮

॥ কাজী তাবাসসুম ॥

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”
মানবজাতির এ অর্ধেক অংশ তথা নারী সমাজ সবকালে, সবখানে নিগৃহীত, অবহেলিত ও নির্যাতিত। প্রাচীনকাল থেকে সভ্যতার কত পটপরিবর্তন হলো, সময়ের গতিতে কত পাল্টে গেল মানুষের জীবনধারা, কিন্তু আজও নারী পায়নি পূর্ণ মর্যাদা বা পরিপূর্ণ অধিকার। যুগ যুগ ধরেই বিভিন্ন সমাজে নারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে ইসলামপূর্ব আরব সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। কন্যাশিশু হত্যা, কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া, জোর করে বিবাহ, নারীকে সম্পত্তি বা লেনদেনের অংশ হিসেবে ব্যবহারÑ এসব ঘটনার প্রমাণ ইতিহাস ও কুরআনের আলোকে পাওয়া যায়।
নারীকে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই জীবন্ত কবর দেয়া হতো অথবা সমাজের এক ‘সম্পত্তি’ বা লেনদেনের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জাহেলিয়াত যুগের গোত্রগুলোর মধ্যে নারীর স্বাধীনতা, মতামত ও জীবনের সুরক্ষা কোনো মূল্য পেত না। মেয়েদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের এ ধারাবাহিক চিত্রই কুরআন ও সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলাম আগমনের মাধ্যমে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। কুরআন ও হাদিসে নারীর অধিকার রক্ষার জন্য স্পষ্ট আইন ও নীতি প্রবর্তিত হয়েছে। যেমনÑ নারীর সম্পত্তিতে অধিকার, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ বন্ধ, সন্তান হত্যার হারাম ঘোষণা ইত্যাদি।
যদিও ইসলাম এ অমানবিক প্রথাগুলো বন্ধ করেছে, বর্তমান দুনিয়াও নারী নির্যাতনের ঘটনা এখনো দূর হয়নি। তবে তার রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা বা বৈষম্য প্রায়ই গৃহ হিংসা, যৌন নিপীড়ন, মানব পাচার, শোষণ বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হিসেবে দেখা যায়। ফলে নির্যাতনের প্রকৃতি বদলেছে, কিন্তু প্রভাব এখনো মারাত্মক।
এ প্রবন্ধে আমরা প্রথম পর্বে ইসলামের আগমনের আগে নারীর প্রতি যে সমাজ ব্যবস্থাগত ও সাংস্কৃতিক নির্যাতন ছিল, তা বিশ্লেষণ করব এবং দ্বিতীয় পর্বে বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি ও নারী নির্যাতনের রূপের পরিবর্তন তুলে ধরব।
আইয়্যামে জাহেলিয়াত ও ইসলামে নারীর অবস্থান
‘ওয়াদ্দাহ’ বা কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়াÑ এটি ছিল জাহেলিয়াতের যুগে সবচেয়ে ভয়াবহ নারী নির্যাতন। কন্যাশিশুর জন্মকে লজ্জার বিষয় মনে করা হতো এবং নবজাত কন্যাশিশুকে লজ্জা ও দরিদ্রতার ভয়ে জীবন্ত কবর দেয়া হতো।
‘যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সংবাদ দেওয়া হয়, তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে ভরে যায়। সে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় এ খারাপ সংবাদে লজ্জিত হয়ে। সে চিন্তা করেÑ তাকে কি লাঞ্ছিত অবস্থায় রেখে দেব, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলব? জেনে রাখÑ তারা খুবই মন্দ সিদ্ধান্ত নিত।’ (সূরা নাহল : ৮৫, ৫৯)।
কাইস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করতে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আসেন। তখন তিনি নিজের জাহেলি যুগের অপরাধগুলো স্মরণ করে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়াত যুগে বহু কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলেছিলাম।’ এ কথার পর কাইস নিজে ঘটনার বিবরণ দেন, যা কয়েকটি তাফসীর ও সিরাহ গ্রন্থে (যেমনÑ তাফসীর ইবনে কাসীর, সিরাহ ইবনে হিশাম, মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ইত্যাদি) এসেছে, তিনি বলেন, একবার তাঁর স্ত্রী একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন শিশুটিকে জীবন্ত কবর দেবেন। কয়েক বছর পর শিশুটি কিছুটা বড় হলে তিনি তাকে বাবার প্রতি স্বাভাবিক ভরসায় নিয়ে বের হন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মরুভূমির একটি গর্তের কাছে যান। শিশুটি বুঝতেই পারেনি বাইরে কী হতে যাচ্ছে। যখন তিনি গর্ত খুঁড়তে থাকেন, মেয়ে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, ‘আব্বা, আপনি কী করছেন?’ গর্ত প্রস্তুত হলে তিনি নির্দোষ শিশুটিকে তুলে গর্তে নিক্ষেপ করেন এবং মাটিচাপা দিতে থাকেন। মেয়ে তখন চিৎকার করে বলছিল, ‘আব্বা! আমাকে ঢেকে দিচ্ছেন কেন?’ কাইস ইসলাম গ্রহণের সময় কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ ধরনের বহু জঘন্য কাজ করেছি।’
রাসূল সা. তাঁকে অন্যায় বোধ থেকে মুক্ত করতে বললেন, ‘ইসলাম পূর্বেকার সব গুনাহকে মুছে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম)
এবং তাকে সদাচরণ ও দান-সদকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলেন, যেন তাঁর অতীতের অমানবিক কাজগুলোর কাফফারা হয়ে যায়।
আল্লাহ তায়ালা কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া নিয়ে কিয়ামতের বিচারের ঘোষণা দেন।
‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে প্রশ্ন করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সূরা তাকভীর : ৮-৯)।
রাসূলুল্লাহ সা. পাশাপাশি তিনটি আঙুল দেখিয়ে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তিনটি কন্যাসন্তানের সঠিকভাবে লালন-পালন করে, তাদের প্রতি দয়া ও সদাচরণ প্রদর্শন করে, তাদের জন্য ধৈর্যশীল হয়Ñ তার জন্য আমি জান্নাতে এমন অবস্থান নিশ্চিত করব।’ (বুখারী, মুসলিম)।
নারীদের সম্পদের উত্তরাধিকার না দেয়া
ইসলামপূর্ব যুগে নারীদের উত্তরাধিকার সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা হতো। জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম ছিলÑ মহিলা ও শিশু সম্পত্তিতে কোনো অংশ পাবে না; শুধু যুদ্ধ করতে পারে এমন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরাই উত্তরাধিকারী বলে গণ্য হতো।
ইসলামেই প্রথম নারীদের উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ‘পুরুষ যা অর্জন করে তার একটি অংশ আছে এবং নারী যা অর্জন করে তারও একটি অংশ আছে।’ (সূরা নিসা : ৩২)।
উহুদের যুদ্ধে আনসার সাহাবী সা’দ ইবনে রাবী (রা.) শহীদ হন। মৃত্যুর পর তাঁর দুই কন্যা, এক স্ত্রী – তিনজনকেই তাঁর দুই ভাই (মেয়েদের চাচা) সম্পত্তি থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে সব সম্পত্তি নিজেদের দখলে নেয়।
সা’দ (রা.)-এর স্ত্রী তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সা’দ উহুদে শহীদ হয়েছেন। তাঁর দুই ভাই তাঁর সব সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছে। আমার দুই কন্যার কোনো সম্পদ নেই। না আছে বিবাহের ব্যবস্থা, না আছে জীবিকা।’ (ইমাম তিরমিযী, ইবনে আবি হাতিম, ইমাম বাগভীর তাফসীর)।
অভিযোগ শোনার পর নবী (সা.) অপেক্ষা করলেন আল্লাহর নির্দেশের জন্য। তারপর সূরা নিসার উত্তরাধিকার আইন উল্লেখকারী আয়াতসমূহ নাজিল হয়। আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসূল (সা.) বললেন, দুই মেয়েকে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ, স্ত্রীকে এক-অষ্টমাংশ, বাকি অংশ নিকট পুরুষ আত্মীয় (দুই ভাই) পাবে। (সূরা নিসা : ৭, ১১ ও ১২)।
এভাবে প্রথমবারের মতো ইসলামে নারীদের সম্পত্তির অধিকার সুস্পষ্টভাবে কার্যকর করা হয়।
নারীদের স্বয়ং সম্পত্তি হিসেবে ব্যাবহার করা
ইসলামপূর্ব জাহিলিয়াত যুগে নারীদের সরাসরি সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ সংক্রান্ত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রথা চালু ছিল।
ক. ‘রাহনÑ বন্ধক/জামানত (ঝবপঁৎরঃু/ঈড়ষষধঃবৎধষ) কোনো সম্পদ বা দ্রব্য অস্থায়ীভাবে অন্যের কাছে গচ্ছিত রাখাÑ এটাকেই রাহন বলা হয়। কিছু গোত্রে মেয়েদের দেনা পরিশোধের বিনিময়, শান্তিচুক্তির শর্ত, প্রতিশোধ থামানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কোনো মহিলাকে যখন যেখানে পাঠানো হতোÑ তার কোনো মতামত গণ্য করা হতো না।
খ. ‘হাবস;Ñআটকানো/বাজেয়াপ্ত করা (উবঃবহঃরড়হ/ঈঁংঃড়ফু/জবঃবহঃরড়হ) ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত ঋণদাতা সম্পত্তি হাবস/বাজেয়াপ্ত রাখল: জাহেলিয়াত যুগে যদি কোনো পুরুষ মারা যেত তার স্ত্রীকে সম্পত্তির অংশ মনে করা হতো। মৃত ব্যক্তির ছেলে বা ভাই মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর ওপরে চাদর ফেলে দিত। কেউ যদি নারীর মাথার ওপর নিজের চাদর ফেলে দিত, তাহলে সবাই বুঝত এ নারী এখন তার সম্পত্তি! এরপর সে তিনটি কাজের একটি করত
১. নিজে তাকে বিয়ে করত।
২. মোহর ছাড়া অন্যকে বিয়ে দিত এবং মোহর টাকা নিজে নিত।
৩. নারীর স্বাধীনতা না দিয়ে সারা জীবন আটকে রাখত যেন সে উত্তরাধিকার দাবি করতে না পারে।
কুরআনে রাহন ও হাবস এ দুই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে তোমরা নারীদের জোরপূর্বক উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করবে।’ (সূরা নিসা : ১৯)।
গ. ‘নিকাহুল মাকত’ অথবা ‘শিগার’Ñ বিনিময়বিবাহ/বদলবিবাহ (ঊীপযধহমব সধৎৎরধমব / ইধৎঃবৎ সধৎৎরধমব) দুই পরিবার বা সম্প্রদায়ের মধ্যে মেয়েদের বিনিময় করে বিয়ে দেওয়া বা নারীদের ‘লেনদেন বা চুক্তির জিনিস’ হিসেবে ব্যবহার করা : জাহেলিয়াত যুগে যদি কারো বাবা মারা যেত, তার ছেলে চাইলে নিজের সৎ মাকে বিয়ে করতে পারত। তাদের ধারণা ছিল, ‘যেহেতু তিনি আমার বাবার সম্পত্তি ছিলেন, এখন তিনি আমার সম্পত্তি।’ এটিকে আরবরা বলত নিকাহুল মাকত যার অর্থই ‘ঘৃণ্য বিবাহ’।
কুরআন এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হলো তোমাদের পিতারা যাদেরকে বিয়ে করেছেন।’ (সূরা নিসা : ২২)।
সীমাহীন বহু বিবাহ ও নারীর অবমূল্যায়ন
জাহেলি আরব সমাজে পুরুষরা ইচ্ছেমতো যত খুশি নারীকে স্ত্রী হিসেবে রেখে দিতÑ এর কোনো সীমা ছিল না। বহু পুরুষ ৮, ১০, ১২, এমনকি ২০ পর্যন্ত স্ত্রী রাখতো। কিছু ‘রাজা-সর্দার’ ৩০-৫০ জন পর্যন্ত স্ত্রী রাখার উল্লেখ আছে। কোনো সংখ্যা নির্ধারিত ছিল না, নারীর সম্মতি ছিল মূল্যহীন। বৈষম্য, অবহেলা ও নির্যাতন ছিল সাধারণ ঘটনা।
গাইলান ইবন সালামা আল-থাকাফি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তার দশজন স্ত্রী ছিল। তিনি নবী এর কাছে এসে বললেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আমার দশ স্ত্রী আছে। এখন আমি কী করব? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘তাদের মধ্যে চারজনকে রেখে বাকিদের থেকে পৃথক হয়ে যাও।’
ইসলাম এসে এ সমাজে শৃঙ্খলা এনেছে এভাবে, ‘তোমরা নারীদের মধ্যে যাদেরকে ভালো লাগে, তাদের মধ্যে থেকে দুই, তিন ও চার জনকে বিয়ে করো; কিন্তু যদি ন্যায়-নীতি রক্ষা করতে না পারো তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সূরা নিসা : ৩)।
অর্থাৎ জাহেলিয়াতে বহু-বিবাহ সীমাহীন ছিল, কিন্তু ইসলাম সর্বোচ্চ ৪ জন নির্ধারণ করে দিল। এর ওপর যুক্ত করা হল ন্যায়বিচারের শর্তারোপ। একাধিক বিবাহ করতে হলে স্ত্রীদের খাবার, পোশাক, থাকা, আর্থিক অধিকার, সময় এসব সমানভাবে দিতে হবে। অন্যথায় ‘শুধু একজন’Ñ এটাই আল্লাহর নির্দেশ।
আইয়্যামে জাহেলিয়াত ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অন্ধকার সময়। এ যুগে নারী ছিল অধিকারহীন, মর্যাদাহীনÑ একটি অচেতন সম্পদের মতো। তাকে জীবিত কবর দেওয়া হতো, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, সীমাহীন বহু-বিবাহের ভোগ্যপণ্য বানানো হতো, দেনা-পাওনার রাহন করা হতো, জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হতে হতো। সমাজে তার মূল্য ছিল না; মানবিক মর্যাদার কোনো ছাপ ছিল না।
ইসলাম আগমনের মধ্য দিয়েই এ নির্যাতনের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। কুরআন নারীর জীবন, মর্যাদা, সম্মান ও অধিকারের বিধান নাজিল করে। নবী করিম সা. তার বক্তব্য, আচরণ ও নীতিমালা দ্বারা নারীর মর্যাদাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করেনÑ কখনো মায়ের স্থানে জান্নাত ঘোষণা করে, কখনো কন্যাসন্তানকে জান্নাতে পৌঁছানোর কারণ বানিয়ে, কখনো স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণকে সর্বোত্তম মুসলিমের পরিচয় বলে ঘোষণা করে। ইসলাম নারীর সম্মানকে আলোকিত করে জানিয়ে দেয় নারী কোনো রাহন নয়, কোনো সম্পদ নয়, বরং স্বাধীন, মর্যাদাসম্পন্ন, সম্মানিত মানবসত্তা।
আজকের পৃথিবীতে নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক রূপ
জাহেলি যুগের অন্ধকার ভেদ করে ইসলামের আলো পৃথিবীর নারীদের জন্য যে সম্মান, অধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে, তা মানব ইতিহাসে এক অনন্য বিপ্লব। আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই নারী নির্যাতন ভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে। আমরা কি আবার ফিরে গেছি নব্য জাহেলিয়াতে? কোথায় মুক্তির সোনালি দিগন্ত?
মানবসভ্যতা এগিয়ে গেছে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উন্নতির হাজারো সোপানে; তবুও নারীর প্রতি নির্যাতন আজও থামেনি, বরং বহু ক্ষেত্রে নতুন রূপে সামনে এসেছে। কখনো তা প্রকাশ্য সহিংসতা হিসেবে, কখনো মানসিক চাপ, সামাজিক বঞ্চনা, বৈষম্য, প্রতারণা কিংবা সাইবার জুলুমের নিঃশব্দ আঘাতে নারী আজও আহত ও অবরুদ্ধ। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অমানবিক চেহারার পর ইসলাম নারীর মর্যাদার যে আলোকোজ্জ্বল ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিল, দুঃখজনকভাবে বর্তমান দুনিয়ার বহু সমাজ সেই ন্যায়ের আলো থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে নারী নির্যাতন একটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকটে রূপ নিয়েছে, যার শিকড় রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে ঘরোয়া জীবনের গভীর কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত।
চলুন দেখা যাক, আজকের পৃথিবীতে নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক রূপগুলো কীভাবে গড়ে উঠছে, কেন তা টিকে আছে এবং এ অন্ধকারের মাঝে মুক্তির সোনালি দিগন্ত কোথায়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, শিক্ষা, আইন ও সামাজিক সচেতনতার আলোকে কোন পথসমূহ প্রকৃত সমাধান দিতে পারে, সেই দিকনির্দেশনার সন্ধানই হবে এ আলোচনার মূল লক্ষ্য।
আজকের পৃথিবীতে নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক রূপ। আজকের আধুনিক সভ্যতা নারী উন্নয়ন ও অধিকারের কথা বললেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প। নারী নির্যাতন এখন আর শুধু শারীরিক সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নানা আকারে, নানা স্তরে এবং নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শারীরিক নির্যাতন : গার্হস্থ্য সহিংসতা, স্বামী বা পরিবারের নির্যাতন, যৌতুক অনাদায়ে হত্যা, এসিড আক্রমণ, গণধর্ষণ, যৌন হয়রানি, মানব পাচার, জোরপূর্বক বিয়ে এসব এখনো নিত্যদিনের বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) ও অন্যান্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩০ শতাংশ) সংশ্লিষ্ট বয়সে মেয়েরা (১৫ বছর বা তার বেশি) জীবদ্দশায় অন্তত একবার শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ : সাম্প্রতিক ‘ঠরড়ষবহপব অমধরহংঃ ডড়সবহ ঝঁৎাবু ২০২৪’ অনুসারে, বাংলাদেশে প্রায় ৭৬% নারী জীবদ্দশায় কমবেশি গার্হস্থ্য সহিংসতার (শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ) শিকার হয়েছেন। জরিপ বলেছে, গত ১২ মাসে প্রায় ৪৯% নারী গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
অনেক নারী নির্যাতনের কথা কাউকে বলেন না। জরিপে দেখা গেছে ৬২% বঞ্চিত নারী তাদের অভিজ্ঞতা কাউকে জানায়নি। একই জরিপে দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৭.২% নারী শারীরিক সহিংসতা এবং ৫.৩% যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন গর্ভাবস্থায়।
২০২৪‑এর জরিপে অর্থনৈতিক নির্যাতনকে এক ধরনের ভায়োলেন্স হিসেবে গৃহীত হয়েছে (ঊপড়হড়সরপ ারড়ষবহপব)। যদিও শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের তুলনায় এটি হয়তো বেশি লক্ষ্য করা যায় না, কিন্তু জরিপে অর্থনৈতিক নির্যাতনও উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি উল্লেখযোগ্যসংখক নারী বলেছে, তাদের পার্টনার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে (উপার্জন, ব্যয়, ব্যাংক অ্যাক্সেস ইত্যাদি), যা তাদের বিষয়গত সিদ্ধান্ত-গ্রহণে স্বাধীনতা সীমিত করে (ঈড়হঃৎড়ষষরহম ইবযধারড়ৎ)।
মানসিক নির্যাতন : অপমান, অবমূল্যায়ন, চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল, স্থায়ী মানসিক চাপ সৃষ্টি, যা অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।
‘ঠরড়ষবহপব অমধরহংঃ ডড়সবহ ঝঁৎাবু ২০২৪’-এ দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ (যেমন স্বামী বা পার্টনারের দ্বারা অর্থ, যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা) অত্যন্ত সাধারণ প্রায় ৬৮% নারী এটি অভিজ্ঞ করেছেন।
একই জরিপে প্রায় ৩৭% নারী বলেছে , তারা মানসিক (ঊসড়ঃরড়হধষ) অত্যাচারের শিকার হয়েছেন (অপমান, অবমূল্যায়ন, ভয়ভীতি ইত্যাদি)। মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণ বা সহায়তার পথ বন্ধ হয়ে যায়, কারণ নির্যাতনের অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন এবং সামাজিক লজ্জা কাজ করে। জরিপে অনেক নারী চুপ থাকা বা কাউকে না বলার কথা জানিয়েছিল। এ মানসিক নির্যাতনের যে ধরন এবং প্রকারভেদ তার হিসেব করে শেষ করা যাবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করা, হেয় করা, ব্যঙ্গ করা, অন্যদের সামনে অপমান করা, পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির ভয় দেখানো। অশালীন, অপমানজনক ভাষায় কথা বলা; তার সিদ্ধান্ত, মতামত, ইচ্ছাকে গুরুত্ব না দেওয়া; বার বার বলা যে সে ‘কিছুই পারে না’। চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করে বাজে মন্তব্য, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগে বাধা দেওয়া; বাইরে যেতে না দেওয়া। ফোন চেক করা, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা, মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করা।
শারিরীক নির্যাতন দেখা যায় বলে তার প্রতিকার আশা করা যায়, পক্ষান্তরে মানসিক নির্যাতন নারীকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়।
অর্থনৈতিক নির্যাতন : সম্পত্তি বঞ্চনা, আয় বা সম্পদের ওপর স্বাধীন অধিকার না দেওয়া, নির্ভরশীল অবস্থায় আটকে রাখা নারীকে দুর্বল করে রাখার বড় উপাদান।
অর্থনৈতিক নির্যাতন শুধু তাৎক্ষণিক দুর্দশা সৃষ্টি করে না, বরং নারীকে নির্ভরশীল করার উপাদান হিসেবে কাজ করে, যা তাদের ভবিষ্যতে স্বনির্ভর হওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।
ডিজিটাল/সাইবার নির্যাতন : অনলাইনে হয়রানি, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ফাঁসের ভয় দেখানো, সাইবার বুলিং এ যুগের নতুন অথচ ভয়াবহ আক্রমণ। অনলাইন বা ডিজিটাল নির্যাতন (ঞবপযহড়ষড়মু-ঋধপরষরঃধঃবফ মবহফবৎ‑ইধংবফ ারড়ষবহপব) একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে হয়রানি, অবমাননা, বাধা প্রদর্শন, ছবির অপব্যবহার (ঘড়হ-ঈড়হংবহংঁধষ রসধমব ংযধৎরহম) ইত্যাদি ঘটনা ঘটছে। মহিলারা ফেসবুক, ডযধঃংঅঢ়ঢ় বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সাইবার হয়রানি, স্টকিং, ব্ল্যাকমেইল, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির শিকার হচ্ছেন। “ডড়সবহ’ং চবৎংঢ়বপঃরাবং ড়হ ঐধৎস ধহফ ঔঁংঃরপব ধভঃবৎ ঙহষরহব ঐধৎধংংসবহঃ” দেখায় যে অনলাইন নির্যাতনে নারী বেশি ভীত ও ক্ষতিগ্রস্ত বোধ করেন’ বিশেষ করে যখন তাদের ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য কন্ট্রোল ছাড়া শেয়ার করা হয়। যদিও বাংলাদেশে নির্দিষ্ট সাইবার নির্যাতন জাতীয় জরিপ ডাটার বিস্তারিত তথ্য কম প্রকাশ পায়, কিন্তু ইইঝ‑টঘঋচঅ ২০২৪ জরিপে ‘ঞবপযহড়ষড়মু‑ঋধপরষরঃধঃবফ মবহফবৎ-ইধংবফ ারড়ষবহপব’ উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৮.৩% নারী বলেছেন, তারা এমন ধরনের নির্যাতন অনুভব করেছেন (যেমন ডিজিটাল নজরদারি, ছবি/তথ্য‑নিয়ন্ত্রণ)।
সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত নির্যাতন
নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রাখা, শিক্ষায় বৈষম্য, চাকরিতে হয়রানি ও বঞ্চনা, বেতন বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রের অনিরাপদ পরিবেশ এগুলো সমাজ কাঠামোতেই প্রোথিত অবিচারের রূপ। পণপ্রথা, বাল্যবিয়ে, অযৌক্তিক সামাজিক বাধা, সৌন্দর্য-মানদণ্ডের চাপে ফেলা যেমন, গায়ের রং, শারীরিক গঠন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য এগুলোও নারীর মানসিক-সামাজিক অবস্থানকে নষ্ট করে। এছাড়া রয়েছে স্কুল-কলেজ বা অফিসে, চলতি পথে বখাটেদের উৎপাত, বিধবা নারীর পোশাক, চালচলন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, পিতার সম্পত্তির প্রপ্য অধিকার না দেয়াসহ আরো নানাবিধ নির্যাতন।
মুক্তির সোনালি দিগন্ত কোথায়?
ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা দিয়েছে, তা মানব ইতিহাসে দৃষ্টান্তমূলক। নারীকে সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দেওয়ার প্রকৃত সমাধান ইসলামের ন্যায়সংগত সামগ্রিক নির্দেশনার মধ্যেই নিহিত। ইসলাম ঘোষণা করে, নারী ও পুরুষ একই উৎস থেকে উদ্ভূত।
‘নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ ও রোজা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারীÑ তাদের সকলের জন্যই আল্লাহ তায়ালা রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।’ (সূরা বাকারা : ৩৩-৩৫)।
ইসলামের এ সামগ্রিক নির্দেশনাই নারী নির্যাতনের অন্ধকারে মুক্তির সোনালি দিগন্ত উন্মোচন করে যেখানে নারী শুধু সুরক্ষিত নয়, সম্মানিত, মর্যাদাবান এবং সমাজ নির্মাণের পূর্ণ অংশীদার।
‘তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা (স্বামীগণ) তাদের জন্য পোশাক।’ (সূরা বাকারা : ১৮৭)।
ইসলাম নারীর মর্যাদা, অধিকার এবং নিরাপত্তাকে যে উচ্চতায় স্থান দিয়েছে, তা মানবসমাজকে প্রকৃত ন্যায় ও সাম্যের দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম। ‘নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের।’ (সূরা বাকারা : ২২৮)।
নারী নির্যাতন কোনো একক সমাজ বা সভ্যতার সমস্যা নয়; এটি আজকের পৃথিবীর মানবিক অবক্ষয়ের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির অগ্রগতি, জ্ঞানের বিস্তার এবং আধুনিকতার জোয়ার সত্ত্বেও নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও স্বাধীনতা এখনো বহু ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা ডিজিটাল প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি অবিচার যেন সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, পারিবারিক বন্ধনের পবিত্রতা, পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এসবই নারী নির্যাতনের অন্ধকার দূর করে মুক্তির সোনালি দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে মুসলিম সমাজে যে ব্যাপক নারী নির্যাতনের চিত্র চোখে পড়ে এজন্য ইসলাম দায়ী নয়, বরং দায়ী পথভ্রষ্ট মুসলিম সমাজ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামের যথাযথ চর্চা, ইসলামী জ্ঞান অর্জন, ইসলামী বিধিবিধানকে বোঝা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলামকে মানা জরুরি।
নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য কেবল আইনগত অবস্থান পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের অন্তরে মূল্যবোধ জাগ্রত করা, পরিবারে দায়িত্বশিলতা প্রতিষ্ঠা করা, সমাজকে ন্যায় ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করা। যখন সমাজ ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী নারীকে সম্মান, নিরাপত্তা ও পূর্ণ মর্যাদা দিতে সক্ষম হবে তখনই সত্যিকার অর্থে ফুটে উঠবে সেই কাক্সিক্ষত সোনালি দিগন্ত, যেখানে নারী হবে সম্মানের প্রতীক, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সভ্যতার নির্মাতা।

নারী নির্যাতনের বিবিধ রূপ কোথায় মুক্তির সোনালি দিগন্ত?

সম্পর্কিত খবর