খিচুড়ি রহস্য
৬ নভেম্বর ২০২৫ ২১:০০
॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥
(গত সংখ্যার পর)
দিন যায়, রাত যায়, পৃথিবী তার আপন কক্ষে পাক খায়, টনে টনে ঘি শেষ হয়; কিন্তু চুড়ি দুটি তাদের পূর্ব হালতেই বলবৎ।
এদিকে শাহজাদার অবস্থা খুবই করুণ, শোচনীয় ও মর-মর। বুভুক্ষার অনলে তার পেট পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। লাবণ্যময় কান্তশ্রী চেহারা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শরীর-স্বাস্থ্য ধসে পড়েছে। কিছুক্ষণ জ্ঞান থাকে তো আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বিছানা থেকে উঠতেই পারছে না। রাজার বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে যায়, রানি দু’চোখ ভাসিয়ে বিলাপ বকতে থাকে- এমন সময় এক কামারের মাথায় একটি চমৎকার বুদ্ধি গঙ্গাফড়িঙের মতো লাফিয়ে এসে পড়ে। সে দ্রুত পাকশালায় গিয়ে পাচককে বলে, ‘রাখো এসব যদি যুবরাজের ইচ্ছাপূরণ করেই তার প্রাণ বাঁচাতে চাও, আমার কথা শুনো। চুড়ি দুটি উঠিয়ে ফেলে তাতে চাল, ডাল, সোনামুগ, হলুদ, লবণ, মরিচ ও মসলা দিয়ে ভালোভাবে কিছুক্ষণ নাড়ো। তারপর তপ্ত পানি দিয়ে আবার হলুদ দাও। এরপর কিছুক্ষণ সিদ্ধ করে নামাও”।
অতঃপর সে পাকশালা থেকে বের হয়ে সুস্থির কণ্ঠে বলল, ‘কোনো ভয় নেই মহামান্য মহারাজ, অতি শিগগির ঘিয়ে ভাজা খিচুড়ির খাদ্য তৈরি হয়ে যাবে।’
কামারের কথা শুনে রাজার হৃদয়ের ফাটা যেন জোড়া লাগল, রানির বুকে যেন পানি এলো। কিন্তু কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না, সবার বুক দুরু দুরু করে কাঁপছে। ক্ষণকাল পর পাচক পাকশালা থেকে বের হয়ে অতি আহ্লাদের সাথে বললে, ‘খিচুড়ি তৈরি’। রানি একছুটে গিয়ে রুপার প্লেটে খাবার ভরে রাজপুত্রের জন্য নিয়ে এলো।
রাজপুত্রের জ্ঞান ছিল, কিন্তু শোয়া থেকে উঠতে পারছিল না। তখন দাস-দাসীরা মিলে ধরাধরি করে তাকে বসালে সে খেতে আরম্ভ করলো। সকলে উদগ্রীব হয়ে ব্যাকুল চোখে অনিমেষনেত্রে ক্ষুধার্ত কাকের মতো তাকিয়ে আছে তার দিকে। কয়েক লোকমা মুখে দিয়ে সে বলে উঠলো, ‘একী! পাশবালিশের মতো ছোট ছোট স্বর্ণদানা, হীরা মুক্তাগুলোও যেন স্বর্ণে মাখামাখি আর এদের মাঝ যেন দিয়ে যেন সোনালী নদী বয়ে যাচ্ছে। চমৎকার-অতি সুস্বাদু এই খিচুড়ি, এক্কেবারে তোফা! আরো চাই, আরো আনো।’ রাজপুত্রের কথা শুনে সবার মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।
পাচক দ্রুত আরো খিচুড়ি তৈরি করে আনতে লাগলো। আর রাজপুত্র গত কয়েকদিনের খাবার উসুল করার নেশায় সব একনাগাড়ে সাবাড় করতে লাগলো। রানি তো আনন্দের মাদকতায় একেবারে যেন মাতাল হয়ে যাবে আজ; কিন্তু রাজা মোটেই পুত্রের কাজে সন্তুষ্ট নন। যদিও মুখ ফুটে কিছুই বলছেন না।
(চলবে)
লেখক: শিক্ষার্থী, মাইজদী, নোয়াখালী।