জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা পাল্টাতে চায় সরকারি দল

বিএনপির উল্টোপথে যাত্রা

অতিথি প্রতিবেদক
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৮

আওয়ামী লীগের উত্থান স্বপ্ন কার ইঙ্গিতে

॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের কেন্দ্রাভিমুখী ক্ষমতা, দলীয়করণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ- সবকিছুর বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভ এক বিস্ফোরণে রূপ নেয়। সেই পর্বের পর ‘সংস্কার’, ‘ট্রানজিশন’, ‘জবাবদিহি’ ও ‘নতুন সামাজিক চুক্তি’- এ শব্দগুলো রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে- এই বিপ্লবী ধারাবাহিকতা কি অটুট থাকবে? নাকি ক্ষমতার পুরোনো ধারা ফিরে আসবে নতুনরূপে? বিশেষত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনোত্তর অবস্থান এবং প্রশাসনিকভাবে সর্বব্যাপী দলকানা পুনর্বিন্যাস অনেকের মনে সংশয় তৈরি করেছে- দলটি কি সত্যিই সংস্কারমুখী, নাকি কেবল ‘ক্ষমতা পরিবর্তন’কেই শেষ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু দেশের রাজনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিপ্লব বনাম ক্ষমতা : দ্বন্দ্বের সূচনা
জুলাই বিপ্লবের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি দলনিরপেক্ষ। ছাত্র, মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, নাগরিক সমাজ- সবাই মিলে রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তরের দাবি তুলেছিল। লক্ষ্য ছিল দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচারিক জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা।
কিন্তু ঐতিহ্যগত দলীয় রাজনীতির মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা দখল। এখানে বিএনপির সঙ্গে বিপ্লবী শক্তির দর্শনের পার্থক্য স্পষ্ট। বিএনপি নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে না করতেই পুরোনো চেহারা প্রকটভাবে দেখাতে শুরু করেছে। এ নিয়ে আশঙ্কার দ্বন্দ্বই এখন রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রে।
বিপ্লবী শক্তির আশঙ্কা
যারা আন্দোলনে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন- ছাত্র সংগঠন, নাগরিক জোট, সংস্কারপন্থী বুদ্ধিজীবীরা তাদের আশঙ্কা হলো, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিপ্লব ও জুলাই বাস্তবতার কথা ভুলতে বসেছে। পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতি ফিরে আসতে শুরু করেছে। পুলিশ-প্রশাসন সংস্কার অসম্পূর্ণ রেখেই নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিস্থাপনকে লক্ষ্য বানিয়েছে বিএনপি সরকার। দুর্নীতির তদন্তে গণহত্যার বিস্তারে দলগত স্বার্থের ছায়া পড়তে শুরু করেছে। জুলাইপূর্ব দ্বিদলীয় ‘স্ট্যাটাস ক্যু’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার আলামত দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : কে কী চাইবে?
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন’কে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশে এবার তারা সেটিই চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কাছে সাম্প্রতিক নির্বাচনের সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভিন্ন তথ্য আসার পর যুক্তরাষ্ট্র আশাহত হয়েছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে সময়মতো চাপও দিতে পারে।
ভারত বাংলাদেশে তাদের স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা অস্থিতিশীলতা চায় না, তবে বাংলাদেশের ক্ষমতায় দেখতে চায় নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক শক্তিকে। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে দিল্লির সঙ্গে কখনো দূরত্ব, কখনো সমঝোতার নীতি নিয়েছে। যদি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতবিরোধী বক্তব্য বাড়ায়, সীমান্ত ও পানি ইস্যুতে কড়াকড়ি নেয়, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়তে পারে। এর মধ্যে বিএনপিকে ভারতের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ার করে বার্তা দেয়া হয়েছে যে, দিল্লি ২০০১-০৬ সময়ের বিএনপি শাসনের পুনরাবৃত্তি চায় না। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন এ সময়ের শাসন ভারতের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপে ভরা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এখন তারা ২০০৮-উত্তর দেড় দশকের মতো দিল্লির সাথে সমঝোতামূলক শাসন বাংলাদেশে দেখতে চায় মর্মে বার্তা দিয়েছে।
চীন মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে মনোযোগী- বন্দর, অবকাঠামো, বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প। যে সরকার তাদের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে, তারা তার সঙ্গেই কাজ করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারহীনতা ও অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়াবে। বেইজিং তাদের প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ বানানোর যেকোনো প্রচেষ্টা বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছে।
অর্থনীতি : বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অনিশ্চয়তা। যদি রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ে; হরতাল-অবরোধ ফিরে আসে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কমবে; ডলার সংকট বাড়বে; মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সত্যিকারের সংস্কার স্বচ্ছ ব্যাংকিং, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে অর্থনীতি লাভবানও হতে পারে। অর্থাৎ ফলাফল নির্ভর করছে ‘কৌশল’ নয়, ‘কার্যকর বাস্তবায়ন’-এর ওপর।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি : ভারসাম্যের পরীক্ষা
বাংলাদেশ এখন ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝখানে। বাংলাদেশ যদি আবার দলীয় মেরুকরণে পড়ে, তাহলে এই শক্তিগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
এতে ঝুঁকিনীতির স্বাধীনতা কমে যাওয়া; ‘প্রক্সি পলিটিক্স’ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বাইরের চাপ বাড়তে পারে। কিন্তু একটি শক্তিশালী সংস্কারভিত্তিক সরকার হলে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালাতে পারবে। কিন্তু বিএনপি সরকারের প্রাথমিক দিনগুলো অনেককে হতাশ করছে।
তরুণ প্রজন্মের মনোভাব
জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল তরুণরা। তাদের দাবি ছিল- ‘দল নয়, সিস্টেম বদল।’ তারা যদি দেখে, পুরোনো দলগুলো শুধু ক্ষমতা ভাগাভাগিতে ব্যস্ত, তাহলে রাজনৈতিক হতাশা বাড়বে। এর ফল হতে পারে ভোটারবিমুখতা; বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ও নতুন দল বা জোটের নব উত্থান। এই জায়গাটিই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তাহলে কি বিএনপি সত্যিই ধারাবাহিকতা পাল্টাতে চায়? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ দলটির ভেতরেও দুই ধারা আছে- সংস্কারপন্থী বাস্তববাদী অংশ এবং পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোনির্ভর অংশ। সরকারে প্রথম ধারার অবস্থান দুর্বল বলে মনে হচ্ছে।
যদি বিএনপি বিপ্লবের স্পিরিটকে গ্রহণ করে স্বচ্ছতা এবং সংস্কার ও জবাবদিহি ধারা বজায় রাখে, তাহলে তারা ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে পারে। আর যদি শুধু ‘ক্ষমতা বদল’-এ সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ম্লান হবে এবং দেশ আবার পুরোনো চক্রে আটকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা বিএনপির নয়- রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেটাই আসল লড়াই।
আ’লীগের প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা : মাঠের বাস্তবতা কী বলছে?
বলা হচ্ছে, আগামী ২ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করতে চায়। এ লক্ষ্যে এবারের নির্বাচনের আগে বিএনপির সাথে প্রতিবেশী দেশের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা হয়েছে। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে দলটি নির্বাচনে বিএনপিকে সর্বাত্মক সমর্থন ও ভোট দিয়েছে। এর জেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও আওয়ামী লীগ সক্রিয় হয়ে উঠতে চাইছে। এক্ষেত্রে মাঠের বাস্তবতা কী বলছে? এটি কি আ’লীগের পুনর্গঠনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে, নাকি পরিণত হবে রাজনৈতিক মরীচিকায়?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (আ’লীগ)। দীর্ঘসময়ের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের পর দলটি হঠাৎ করে প্রশাসনিক, সাংগঠনিক ও নৈতিক সংকটে পড়ে। নেতৃত্বের একটি অংশ আইনি চাপ, একটি অংশ আত্মগোপন, আরেক অংশ নীরব হয়ে থাকে। তবু দলটির ভেতরে এখন একটি আলোচ্য লক্ষ্য ঘুরপাক খাচ্ছে- ‘দুই বছরের মধ্যে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হওয়া’। প্রশ্ন হলো- এটা কি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, নাকি কেবল কাগুজে কৌশল?
পুনরুত্থানের রূপরেখা : কী ভাবছে আ’লীগ?
দলটির নীতিনির্ধারকদের কথাবার্তা, তৃণমূল নেতাদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও কিছু কৌশলগত তৎপরতা দেখে তিনটি দিক স্পষ্ট- ১. সংগঠন টিকিয়ে রাখতে গ্রাম-উপজেলা পর্যায়ে পুরোনো কমিটি সক্রিয় রাখা, সামাজিক নেটওয়ার্ক ধরে রাখা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশে রাখা।
২. ‘ভিকটিম ন্যারেটিভ’ তৈরির মাধ্যমে দলটি চেষ্টা করছে নিজেদের ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার’ হিসেবে তুলে ধরতে। গ্রেপ্তার, মামলা, প্রশাসনিক চাপ এসবকে রাজনৈতিক সহানুভূতির মূলধন বানাতে চায়।
৩. আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিদেশি কূটনৈতিক মহলে বার্তা দেওয়া- ‘আমরাই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারি।’ কিন্তু পরিকল্পনা থাকা আর মাঠে কার্যকর হওয়া এক জিনিস নয়।
মাঠের বাস্তবতা : সংগঠনের শক্তি কতটুকু আছে?
তৃণমূলের চিত্র জেলা-উপজেলায় কথা বললে তিন ধরনের চিত্র পাওয়া যায়- এক. নীরব সংগঠন: প্রকাশ্যে সক্রিয় নয়, কিন্তু গোপনে নেটওয়ার্ক আছে। দুই. বিভক্ত নেতৃত্ব : স্থানীয় গ্রুপিং বেড়েছে। তিন. ভীত কর্মী : মামলা-হয়রানির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে আসতে অনীহা রয়েছে কর্মী-বাহিনীর।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটি প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়েছিল। এখন প্রশাসনিক ছাতা নেই। ফলে প্রকৃত সংগঠনিক শক্তি কতটা, সেটাই বড় প্রশ্ন।
জনমত : সবচেয়ে বড় বাধা
আ’লীগের জন্য সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা সংগঠন নয়, জনমতের আস্থা। জুলাই-পরবর্তী সময়ের তরুণ ভোটারদের বড় অংশের অভিযোগ- দলীয়করণ, দুর্নীতি, দমননীতি এবং কলুষিত নির্বাচন নিয়ে স্মৃতি এখনো তাজা। রাজনীতিতে মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু এত দ্রুত নয়। দুই বছরে ইমেজ রিব্র্যান্ডিং করা কঠিন।
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান
এ সময়ে বিএনপি মাঠে বেশি সক্রিয়। তারা সংগঠন পুনর্গঠন, সমাবেশ, জনসংযোগ- সবখানেই দৃশ্যমান। অন্যদিকে ছাত্র-নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগগুলোও পুরোনো দুই দলের বাইরে বিকল্প রাজনীতির কথা বলছে।
অর্থাৎ আ’লীগ শুধু বিএনপির সঙ্গেই লড়ছে না- নতুন প্রজন্মের রাজনীতির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
বাস্তব রাজনৈতিক অঙ্ক ধরি, যদি দুই বছর পর আরেকটি নির্বাচন হয়ও। তখন আ’লীগের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ থাকবে- ১. প্রার্থী সংকট অনেক পুরোনো নেতা আইনি বা ভাবমূর্তিগত কারণে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। ২. জোট সংকট ছোট দলগুলো দূরে সরে গেলে এককভাবে ভোট টানা কঠিন হবে। ৩. ভোটার সাইকোলজি ‘ফিরে গেলে কি আবার আগের মতো হবে?’- এই ভয় কাটানো কঠিন।
এই তিন বাধা অতিক্রম না করলে সংগঠন থাকলেও ভোট পাওয়া যাবে না।
কোথায় তাদের শক্তি এখনো?
সব নেতিবাচকতার মধ্যেও আ’লীগের কিছু বাস্তব সুবিধা আছে- ঐতিহাসিক ব্র্যান্ড ভ্যালু; গ্রাম পর্যায়ে পুরোনো ভোটব্যাংক; মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদী আবেগের ব্যবহার অভিজ্ঞ ক্যাডার।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বড় দল পুরোপুরি বিলীন হয় না। তাই ‘শূন্যে নেমে যাবে’- এমন ভাবা ভুল। তবে ‘দুই বছরে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন’- এটিও একেবারেই অতিরঞ্জন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক মাত্রা
বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ঐতিহাসিকভাবে আ’লীগের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। চীন যে সরকার প্রকল্প চালাবে, তার সঙ্গেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন ও মানবাধিকার ইস্যুতে নজর দেবে।
তাই আন্তর্জাতিক সমর্থন এককভাবে আ’লীগকে ফেরাতে পারবে না, মূল ফ্যাক্টর থাকবে অভ্যন্তরীণ জনমত। তাহলে দুই বছরের লক্ষ্য কতটা বাস্তব?
খোলাখুলি বললে, দুই বছরে পূর্ণ প্রত্যাবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। যা সম্ভব- সংগঠন টিকিয়ে রাখা, ভোটশেয়ার আংশিক পুনরুদ্ধার এবং শক্তিশালী বিরোধীদল হওয়া। যা কঠিন- একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দ্রুত জনআস্থা পুনর্গঠন এবং অতীতের ভাবমূর্তি মুছে ফেলা।
রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন ম্যারাথন, স্প্রিন্ট নয়। আ’লীগের সামনে এখন প্রশ্ন- ‘ফিরব কীভাবে?’ নয়, ‘বদলাব কীভাবে?’ যদি দলটি আত্মসমালোচনা, নেতৃত্ব পরিবর্তন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারে যায়- তাহলে ধীরে ধীরে জায়গা ফিরে পেতে পারে। আর যদি পুরোনো কৌশলেই চলে- তাহলে দুই বছর নয়, দশ বছরেও ফেরা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট: ক্ষমতা নয়, বিশ্বাসই এখন সবচেয়ে বড় পুঁজি।
আওয়ামী অলিগার্কদের সাথে বিএনপির বোঝাপড়া?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি গুঞ্জন ক্রমশ জোরালো- ক্ষমতার পালাবদলের মুহূর্তে বিএনপি প্রভাবশালী ‘আওয়ামী ঘরানার’ ব্যবসায়ী-রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা তথাকথিত ‘অলিগার্ক’দের সঙ্গে নীরব সমঝোতায় গেছে। এটি নিছক গুজব নয়, বরং বাস্তব রাজনীতির একটি পুরোনো রীতি- ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু প্রভাবশালী অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বদলায় না।
প্রশ্ন হচ্ছে- এমন বোঝাপড়া হলে লাভ কার? ক্ষতি কার? আর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব কী? ‘অলিগার্ক’ কারা? এখানে ‘অলিগার্ক’ বলতে বোঝানো হচ্ছে- বড় ঠিকাদার-ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রভাবশালী গ্রুপ, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, প্রশাসন-ব্যবসা-রাজনীতির মিশ্র স্বার্থগোষ্ঠী।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের আমলে এদের একটি অংশ শক্তিশালী হয়েছিল। এখন তারা নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক অর্থনীতি। অর্থাৎ দল বদলালেও পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি টিকে থাকতে পারে।
কেন বিএনপি এমন বোঝাপড়ায় যেতে পারে?
রাজনীতির বাস্তবতায় তিনটি কারণ থাকতে পারে- ১. অর্থনৈতিক সহায়তা নির্বাচন ও দল পরিচালনায় বড় অর্থের প্রয়োজন। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সে অর্থ জোগাতে পারে। ২. ক্ষমতায় এলে প্রশাসন, ব্যবসা, ব্যাংকিং- সব চালাতে পরিচিত শক্তি দরকার। পুরোনো অর্থনৈতিক গ্রুপকে সঙ্গে নিলে ‘শক’ কমে। ৩. সংঘাত এড়ানো- সব শক্তিকে একসাথে শত্রু বানালে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। তাই ‘সমঝোতা’ অনেক সময় বাস্তববাদী কৌশল।
কিন্তু এখানেই বড় ফাঁদ লুকিয়ে থাকে। স্বল্পমেয়াদে বাস্তবতা হলো- এমন বোঝাপড়ার কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধাও থাকতে পারে। বাজারে আতঙ্ক কমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে প্রশাসনিক অচলাবস্থা কম হয় বড় ব্যবসা ও ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতি ‘স্মুথ’ চলতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু তাৎক্ষণিক লাভ দেখলে দীর্ঘমেয়াদে মূল্য দিতে হয়।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি- এখানেই বড় বিপদ
১. বিপ্লবের চেতনার ক্ষয় : জুলাই-পরবর্তী জনতার প্রত্যাশা ছিল দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, পৃষ্ঠপোষকতামূলক অর্থনীতি ভাঙা। যদি পুরোনো সুবিধাভোগীরাই নতুন সরকারের সঙ্গী হয়, তাহলে মানুষ বলবে, ‘মুখ বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি।’ এতে রাজনৈতিক হতাশা বাড়বে।
২. দুর্নীতির ধারাবাহিকতা : যে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ক্ষমতার সঙ্গে থেকে সুবিধা নিয়েছে, তারা আবারও নীতি প্রভাবিত করবে- টেন্ডার, ব্যাংক ঋণ, আমদানি কোটা, প্রকল্প বণ্টন ইত্যাদি। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি টিকে যাবে।
৩. বিএনপির ভাবমূর্তি সংকট : বিএনপি যদি ‘পরিবর্তনের শক্তি’ হিসেবে আসার পর একই অলিগার্কদের সঙ্গে হাত মেলায়, তাহলে তরুণ ভোটারদের আস্থা হারাবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বলবে, ‘দুই দল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’ এতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ত্বরান্বিত হতে পারে।
৪. প্রশাসনিক সংস্কার থেমে যাওয়া : অলিগার্করা সাধারণত স্ট্যাটাস ক্যু চায়। কারণ সংস্কার মানে তাদের সুবিধা কমে যাওয়া। ফলে ব্যাংকিং সংস্কার দুর্নীতি দমন স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা জবাবদিহি এসব আটকে যেতে পারে।
ভূরাজনৈতিক মাত্রা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র সবাই স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় সরকার চায়। যদি অলিগার্কনির্ভর রাজনীতি বাড়ে; স্বচ্ছতা কমবে, নীতির ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, বিদেশি বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
তাহলে বিএনপি কি করতে পারে?
সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু অন্ধ সমঝোতা বিপজ্জনক। সম্ভাব্য পথ হতে পারেÑ ব্যক্তিনির্ভর নয়, নীতিনির্ভর সম্পর্ক; স্বচ্ছ টেন্ডার ও ব্যাংকিং রিফমর্; সিন্ডিকেট ভাঙা; আর আইন সবার জন্য সমান প্রয়োগ করা। অর্থাৎ ‘সমঝোতা’ থাকলেও তা যেন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে, ব্যক্তিগত লেনদেনে নয়।
রাজনীতিতে বোঝাপড়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- বোঝাপড়া কি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি পুরোনো দুর্নীতিকে বাঁচাবে? যদি বিএনপি আওয়ামী অলিগার্কদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুধু ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, তাহলে পরিবর্তনের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। আর যদি নিয়ম-স্বচ্ছতা-জবাবদিহির মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাহলে স্থিতিশীলতা ও সংস্কার একসাথে সম্ভব। শেষ পর্যন্ত জনগণের চোখে একটাই মাপকাঠি- কে ক্ষমতায় এলো নয়, ক্ষমতায় গিয়ে কী বদলালো।
আ’লীগের প্রতি বিএনপির নির্বাচনী দায় কী?
প্রশ্নটা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরটা বেশ সরল: কোনো দলই অন্য দলের প্রতি ‘নির্বাচনী দায়বদ্ধ’ নয়। দায় থাকে কেবল ভোটার ও সংবিধানের প্রতি। তবে বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতিতে বিষয়টি শুধু আইনগত নয়, কৌশলগত ও নৈতিক মাত্রাও আছে।
আইনগত ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
সংবিধান ও নির্বাচন আইনের কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিটি দল স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতি কোনো ‘দায়’ বা ‘সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা’ নেই। অর্থাৎ বিএনপির আওয়ামী লীগের প্রতি কোনো নির্বাচনী দায় নেই, শুধু প্রতিযোগিতা থাকে।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ কায়েম ও গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতি দুই প্রধান দলের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবর্তিত ছিল। এবার জামায়াত জোটকে ঠেকাতে প্রতিবেশী দেশের মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগ যেন বিএনপিকে নির্বাচনে সমর্থন দেয়, তেমন একটি সমঝোতা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে
বাংলাদেশ এখন এক ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে। একদিকে দলীয় ক্ষমতা, রাজনীতি; অন্যদিকে কাঠামোগত রূপান্তরের স্বপ্ন। বিএনপির সামনে সুযোগ-নিজেদের ঐতিহ্যগত রাজনীতি বদলে নতুন ধারার নেতৃত্ব দেওয়া। অথবা পুরোনো পথে হেঁটে জনতার আস্থাহানি ডেকে আনা। জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, এই দেশের মানুষ চুপ করে থাকে না। যে দল জনগণের আকাক্সক্ষা বুঝবে না, তাকে ইতিহাসও ক্ষমা করবে না।
বিএনপির প্রাথমিক সংকেত শুভ বলে মনে হচ্ছে না। গণভোটের রায় মেনে নিতে তারা অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে বিএনপি অস্বীকার করেছে। ট্রাইবুনালের প্রধান প্রসিকিউটরসহ অন্যদের সরিয়ে দিয়ে গণহত্যার বিচারের বিষয়ে নেতিবাচক সংকেত দিয়েছে। প্রশাসনে নিজ দলের সমর্থকদের ব্যাপকভাবে বসাতে শুরু করেছে। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন থেকে তারা সরে আসতে চাইছে। বিএনপির এই উল্টো পথের যাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটিই দেখার বিষয়।

ফারাহ মাসুম

সম্পর্কিত খবর