জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ : বাস্তবায়ন প্রস্তাব ॥ নির্বাচন নিয়ে জল্পনা

ঐক্য ও বিভাজনের সুর!

ফারাহ মাসুম
৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৩

গণভোট কবে হবে সিদ্ধান্ত দেবে সরকার ॥ উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে প্রথমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হবে। এরপর আদেশের ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে গণভোট কবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে ছেড়ে দিয়েছে কমিশন। সরকারের এখতিয়ার থাকবে, গণভোট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে করা হবে, নাকি তার আগে আলাদাভাবে হবে।
তবে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে প্রকাশের পর একই সাথে ঐক্য ও বিভাজনের সুর বাজতে শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি বলেছে, যে বিষয়ে ঐক্য হয়নি, সেটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রস্তাবে। জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট অনুষ্ঠানে জোর দিলেও সার্বিক বিষয়কে ইতিবাচকভাবে দেখছে। এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার আভাস দিয়েছে।
এত পরিস্থিতিতে ঐক্যের ধারা অগ্রসর হলে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন সামনে অগ্রসর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তা না হলে দেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ধারা নতুন কোনো রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি ইতিবাচক পথে গেলে নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সৌদি আরবে ওমরাহ শেষ করে নভেম্বরের প্রথম ভাগে দেশে ফিরে আসতে পারেন। গণভোটের সময় নিয়ে পক্ষগুলো একটি সমঝোতায় আসতে পারেন। তা না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়া অথবা নতুন কোনো তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকার তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐকমত্য কমিশনের বাস্তবায়ন আদেশ : কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ গত ২৮ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গণভোটের সময় নির্ধারণ কমিশনের কাজ নয়, এটি সরকারের এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা শুধু বলেছি, আদেশ জারির পর থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে।’
খসড়া আদেশে বলা হয়েছে, গণভোট অনুষ্ঠিত হবে গোপন ব্যালটে এবং এটি আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন। এজন্য আলাদা একটি অধ্যাদেশ করা হবে। গণভোটের প্রশ্ন হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত খসড়া বিলের প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ অর্থাৎ ভোটাররা একটি প্যাকেজ প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। সংস্কার প্রস্তাবের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত গণভোটের ব্যালটে থাকবে না।
সনদের মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত। বাকি প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোই গণভোটের অংশ হবে। গণভোটে সংস্কার প্রস্তাব পাস হলে সংসদই সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে এবং প্রথম অধিবেশন থেকে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করতে হবে।
বিকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি সংসদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এ প্রক্রিয়াটি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের একটি উপায়। গণভোটে জনগণ অনুমোদন দিলে সেটাই হবে নতুন সংবিধান সংস্কারের বৈধতা।’
খসড়া আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে প্রস্তাব পাস হলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। পরিষদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই সদস্য হবেন এবং সংসদের পাশাপাশি এ পরিষদ সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে। কমিশন আশা প্রকাশ করেছে, সরকার দ্রুত আদেশ জারি করে গণভোটের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের পরীক্ষা ও গণতান্ত্রিক বৈধতার চ্যালেঞ্জ
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এখন নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু এ গণভোটের সময়, কাঠামো ও ফলাফল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশে দেখা যাচ্ছে, সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা থাকছে। গণভোটের সময় নির্ধারণ থেকে শুরু করে আইনপ্রণয়ন পর্যন্ত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সরকারের এখতিয়ারেই থাকবে।
গণভোটের সময় নিয়ে বিভাজন: বিএনপি ও কিছু কেন্দ্রীয় দল মনে করছে, সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট হলে প্রশাসনিক খরচ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি সহজ হবে। তবে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং কিছু নাগরিক সংগঠন মনে করে, আগে গণভোট না হলে নির্বাচনের ফলাফল সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে ছাপিয়ে যেতে পারে। এ বিভাজন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে গঠিত ঐকমত্য ভেঙে গেলে পুরো সংস্কার পরিকল্পনাই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যেতে পারে।
‘একটি প্রশ্নে’ জনগণের সম্মতি- সরল নাকি জটিল: কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, গণভোটে একটি মাত্র প্রশ্ন থাকবে, যেখানে ৪৮টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব একত্রে প্যাকেজ আকারে উপস্থাপিত হবে। এর পক্ষে যুক্তি- ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতায় একবারে অনুমোদন নেওয়া সহজ।’ কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এতে জনগণের সূক্ষ্ম মতামত প্রতিফলিত হবে না। কেউ হয়তো বিচার বিভাগ সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবের বিপক্ষে- তখন ভোটার কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?
ভিন্নমত ও গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন: জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর অন্তত ৩৬টিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন আদেশের তফসিলে সেগুলোর উল্লেখ নেই। অর্থাৎ গণভোটে এসব ভিন্নমত গণ্য হবে না। এতে একদিকে ঐকমত্য বজায় থাকলেও অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’র প্রশ্ন উঠছে। বিশেষত যদি গণভোটে পাস না হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাখ্যানের অর্থ কী হবে- নতুন করে সনদ সংশোধন, নাকি পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত? এ প্রশ্নে এখনো স্পষ্টতা আসেনি।
সংসদের দ্বৈত ভূমিকা: গণভোটে অনুমোদন পেলে সংসদই সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। সংসদ সদস্যরা একসঙ্গে দুটি ভূমিকা পালন করবেনÑ আইনপ্রণয়ন এবং সংবিধান সংস্কার। এ কাঠামো কার্যকর করতে সাংবিধানিক দক্ষতা, দলীয় শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সহায়তা জরুরি। কিন্তু ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে সংসদীয় সংস্কার প্রক্রিয়া প্রায়ই দলীয় স্বার্থে প্রভাবিত হয়েছে। তাই ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাজনৈতিকভাবে বড় এক পরীক্ষা।
গণতান্ত্রিক বৈধতা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ
জুলাই সনদ গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বৈধতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। প্রথমবারের মতো জনগণ সরাসরি সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবে ভোট দেবে। কিন্তু যদি গণভোট ব্যর্থ হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের রোডম্যাপ নতুন সংকটে পড়তে পারে। সনদ বাস্তবায়নের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গণভোট শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যতের এক বড় পরীক্ষা। সরকারকে এখন এ প্রক্রিয়াটি সর্বাধিক স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বোধগম্য করে তুলতে হবে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ যেমন বলেছেন, ‘জনগণের ওপর আস্থা রাখুন’ কিন্তু সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণকেও জানতে হবে, তারা আসলে কিসের পক্ষে ভোট দিচ্ছে।
জুলাই সনদে কি পাল্টাবে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিসরে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ দেশের সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে আইনসভা, নারী প্রতিনিধিত্ব, বিচার বিভাগ, সংসদীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন প্রস্তাব করেছে। এ সনদ মূলত জনগণকে সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে আরও সংযুক্ত করার, নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলো এখনো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত এ আদেশ গ্রহণ করার কথা বলেনি। শেষ পর্যন্ত এ প্রত্যাখ্যান অব্যাহত থাকলে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি একমত হলে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে অগ্রসর হতে পারবে।
দ্বিকক্ষ আইনসভা: নতুন কাঠামোর প্রস্তাব: সনদ বাস্তবায়ন প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের কথা এসেছে। এতে নিম্নকক্ষ হবে জাতীয় সংসদ এবং উচ্চকক্ষ হবে সিনেট। সিনেটের মাধ্যমে আইনপ্রণয়নে পর্যালোচনা এবং ভারসাম্য আনতে চাওয়া হয়েছে।
উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ জন, যারা নিম্নকক্ষে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে ৫ বছর, তবে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ নির্বাচনে সংসদীয় প্রার্থীর পাশাপাশি উচ্চকক্ষের জন্যও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। তালিকায় কমপক্ষে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
উচ্চকক্ষের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিম্নকক্ষে প্রস্তাবিত বিলসমূহ পর্যালোচনা, সুপারিশ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় নজর দেওয়া। তবে এটি সরাসরি আইনপ্রণয়নের ক্ষমতা রাখবে না।
উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা: উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সনদে পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হয়েছে- প্রথমত, বিল পর্যালোচনা করা। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া সব বিল, অর্থবিল এবং আস্থাভোট ব্যতীত উচ্চকক্ষে উপস্থাপন করতে হবে। উচ্চকক্ষে বিল আটকে রাখার বিধান রয়েছে। তবে কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখা যাবে না; সর্বোচ্চ ২ মাসের জন্য বিল আটকে রাখা সম্ভব। উচ্চকক্ষের আরেকটি কাজ হলো সুপারিশ পাঠানো। উচ্চকক্ষ যদি কোনো বিল সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠায়, নিম্নকক্ষ সেই সংশোধন পূর্ণ বা আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। ফেরত পাঠানো বিল যদি নিম্নকক্ষে আবার পাস হয়, তবুও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে না। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োজন হবে। এ ব্যবস্থায় সিনেট আইনপ্রণয়নে পর্যালোচনার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে, যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমালোচনামূলক সংসদীয় সংস্কৃতির দিকে পদক্ষেপ হিসাবে গণ্য হবে।
জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি: নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির ধারা জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সনদে উল্লেখিত প্রধান বিষয়গুলো হলো- সংরক্ষিত নারী আসনের উন্নয়ন। প্রস্তাব অনুসারে বিদ্যমান ৫০ আসন ধরে রাখা হবে এবং ধাপে ধাপে নারী আসন ১০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুসারে রাজনৈতিক দলের নারী প্রার্থীর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫% নারী প্রার্থী, পরবর্তী ধাপে ১০% এবং ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে ৩৩% নারী প্রার্থীর লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে ন্যূনতম ৫% বৃদ্ধির হার বজায় রাখা হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২০৪৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে ৩৩% নারী অংশগ্রহণ লক্ষ্য আগেই পূর্ণ হয়, তাহলে সংশোধনীটি আগেই বাতিল হবে।
এতে নিশ্চিত হবে যে, নারী প্রতিনিধিত্ব কেবল সংরক্ষিত আসনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাধারণ আসনেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে।
সংসদীয় কমিটি ও বিরোধীদলের ভূমিকা: সংসদে বিরোধীদলের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল ছাড়া বিরোধীদলের সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত হবেন। সরকারি হিসাব, অনুমিত হিসাব, প্রিভিলেজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধীদলের হাতে থাকবে। সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ আসনের সংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী বিরোধীদলের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে।
এ পরিবর্তনগুলো বিরোধীদলের অংশগ্রহণ এবং সংসদীয় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নিশ্চিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা ও স্বাধীন ভোটাধিকার: সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৭০-এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা কেবল অর্থবিল ও আস্থাভোটে দলের নির্দেশ মেনে চলবেন। অন্যসব বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এটি রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ: সংবিধান সংস্কারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ বিধান অনুসারে জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে- এমন চুক্তি উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদনের পরই কার্যকর হবে। প্রতি দশ বছর অন্তর জনগণনা শেষে সংসদ নির্বাচনী এলাকা সীমা পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিধান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, কমিটি গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হবে। এটি নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিচার বিভাগ সংস্কার: সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ পরিবর্তন অনুসারে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। যেসব বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অক্ষমতার অভিযোগে তদন্ত চলছে, তাদের বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবে। এতে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
ঐকমত্যের বাইরে অনৈক্যের সুর
অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বাধিক আলোচিত উদ্যোগ ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আট মাসের পরিশ্রমে তৈরি বাস্তবায়ন সুপারিশের খসড়া প্রকাশের পর সরকার ও সমাজের একাংশ- যেখানে এটিকে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি বলে আখ্যা দিয়েছে, সেখানে বিএনপির আপত্তি- ঐকমত্যের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, যে বিষয়গুলো কমিশনে আলোচনা হয়নি বা যেগুলোয় ঐকমত্য হয়নি, সেই বিষয়গুলোও সুপারিশমালায় যুক্ত করে বাস্তবায়ন আদেশে সংযোজন করা হয়েছে। ফলে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে কমিশন গঠিত হয়েছিল, তা উল্টো “‘জাতীয় অনৈক্যের’ দিকে চলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির মূল আপত্তি এসেছে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ধারণা ঘিরে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ ধারণাটি ঐকমত্য কমিশনের টেবিলে কখনোই আলোচিত হয়নি। অথচ এখন হঠাৎ করেই এটি সুপারিশে যুক্ত করা হয়েছে।’
বিএনপির যুক্তি হলো, পরবর্তী জাতীয় সংসদকেই যদি একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে সেটি জাতীয় সংসদের স্বাধীন এখতিয়ারকে সীমিত করে ফেলে। ‘যে সংসদ গঠিতই হয়নি, তার ওপর সংবিধান সংশোধনের দায়িত্ব আরোপ করা সাংবিধানিকভাবে অনুচিত,’- বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।
অর্থাৎ বিএনপির দৃষ্টিতে এ প্রস্তাব রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁদের অভিযোগ, এ প্রস্তাব কমিশনের আলোচনায় কখনোই উত্থাপিত হয়নি; তাই এটি গণতান্ত্রিক ঐকমত্যের পরিপন্থী।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো গণভোটের দিনক্ষণ। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, গণভোট নির্বাচন-পূর্বে বা নির্বাচনের দিন উভয় সময়েই আয়োজন করা যেতে পারে। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে কঠোর ও একমুখী অবস্থান নিয়েছে।
বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘গণভোট আর নির্বাচন একই দিনে দুটি ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে- এ বিষয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই।’ তাঁর বক্তব্য ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনে বিকল্প প্রস্তাব যুক্ত করাটা ‘ঐকমত্যের বাইরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার শামিল’।
বিএনপি মনে করছে, গণভোটের সময় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দলটি মনে করছে-একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করা গেলে, তা একদিকে প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস করবে, অন্যদিকে ভোটারদের ওপর অতিরিক্ত চাপও কমাবে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে বিএনপির আপত্তির মূল রাজনৈতিক প্রকৃতি। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো এ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন- অর্থাৎ উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ কাঠামো। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের ভোটের আনুপাতিক হারে। কিন্তু বিএনপির দাবি, এ ধরনের সিদ্ধান্তে কোনো ঐকমত্য হয়নি।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ থাকবে, কিন্তু তারা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, তা তখনো আলোচনায় নিষ্পত্তি হয়নি।’ তাঁর মতে, ‘যখন জনগণ সরাসরি উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন করবে না, তখন সেই কক্ষকে সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার দেওয়া গণতন্ত্রের মৌল নীতির পরিপন্থী।’ এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বিএনপি দ্বিকক্ষ পদ্ধতির বিরোধিতা করছে না, বরং উচ্চকক্ষের নির্বাচনের ধরন ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিএনপির মতে, সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব হিসেবে উঠে এসেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সেই অংশে, যেখানে বলা হয়েছে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে কোনো প্রস্তাব ২৭০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অটোপাস) সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে।’
বিএনপি এটিকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পরীক্ষায় অটোপাসের মতো কোনো বিষয় সংবিধানে থাকতে পারে না।’ তাঁর মতে, এ ধারা সংবিধানের মৌল কাঠামো, সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রক্রিয়া সবকিছুকেই উপেক্ষা করছে।
বিএনপির আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা ‘অবচেতনে একপ্রকার প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের দরজা খুলে দেবে’, যেখানে সংসদীয় বিতর্কের কোনো অর্থই থাকবে না।
জামায়াতে ইসলামী ইতিবাচকভাবে দেখছে
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করা দলের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গত ২৮ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে গণমাধ্যমকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা কমিশনের সুপারিশকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। অবিলম্বে সনদ বাস্তবায়নের আদেশ দেওয়ার দাবি করছি। সেইসঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী নভেম্বরের মধ্যে গণভোটের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি দেওয়ার দাবি করছি।’
জামায়াত শুরু থেকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং এর আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের দাবি করে আসছে। সে গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই আয়োজনের দাবি করছে দলটি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট কেন, সে বিষয়ে মঙ্গলবার পৃথক বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর নেতৃত্বে মঙ্গলবার জামায়াতের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনকে ১৮ দফা সুপারিশ জমা দেওয়া হয়। সে ১৮ দফায় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের সুপারিশও ছিল বলে জানান তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, “১৮ দফার মধ্যে গণভোটকে নির্বাচনের আগে করতে হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে সেসব বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোকে পরিবর্তন করে যে সংস্কারগুলোর ব্যাপারে আমরা ঐকমত্য হয়েছি, জাতিকে তো সেটা জানতে হবে। জানার পরই না তারা ‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোট দেবে। যদি একই দিনে ভোট হয়, তাহলে ভোটাররাও তো জানতে পারল না।” এছাড়া একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হলে জটিলতা দেখা দিতে পারে বলেও মনে করে জামায়াত।
ঐকমত্য কমিশনের যুক্তি ও সরকারের অবস্থান
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ কোনো রাজনৈতিক দলকে নয়, রাষ্ট্রকাঠামোকে পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। কমিশনের এক সদস্যের ভাষায়, ‘যেখানে ঐকমত্য হয়নি, সেখানে আমরা বিকল্প প্রস্তাব রেখেছি, যাতে সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার সেই বিতর্কের সাংবিধানিক সমাধান দিতে পারে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, এ প্রস্তাবগুলো ভবিষ্যৎ সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি ‘ওয়ার্কিং ব্লুপ্রিন্ট’ এবং এতে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নেই।
তবে বিএনপি এ ব্যাখ্যাকে ‘রাজনৈতিক অসততা’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং বলেছে, ‘যেখানে জাতীয় ঐকমত্যের নামে কমিশন গঠিত, সেখানে ভিন্নমত লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।’
জাতীয় ঐকমত্য বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ঘিরে উদ্ভূত এ বিতর্ক এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছেÑ বাংলাদেশে কি সত্যিকারের ঐকমত্য সম্ভব? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ যে রাজনৈতিক রূপান্তরের পথে হাঁটছে, তাতে প্রত্যেক দলই গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও সংস্কারের পক্ষে কথা বলছে; কিন্তু বাস্তবে প্রত্যেকের স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের মধ্যে গভীর ফাটল রয়ে গেছে।
বিএনপি চায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার জামায়াত চায় ধর্মীয় ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতাবিন্যাস আর এনসিপি চায় বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনিক কাঠামো। এ বৈপরীত্যের মধ্যেই ‘ঐকমত্য কমিশন’-এর কাজ রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে সমঝোতার প্রমাণপত্র তৈরিতে সীমিত হয়ে পড়েছে।
ঐকমত্যের পুনঃসংজ্ঞা প্রয়োজন
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অসাধারণ রূপান্তরমূলক দলিল। কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন ঐকমত্য কাগজে নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দ্বিকক্ষ আইনসভা, সিনেটে নারী প্রতিনিধিত্ব, সংসদীয় কমিটি ও বিরোধীদলের অংশগ্রহণ, স্বাধীন ভোটাধিকার, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং বিচার বিভাগ সংস্কার সবগুলো মিলিয়ে এটি দেশে গণতন্ত্রের নতুন মাত্রা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে আসার সম্ভাবনা রাখে। তবে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সাংবিধানিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক ঐক্য ও নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য। সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে এ সনদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করবে।

ঐক্য ও বিভাজনের সুর