নতুন চেহারায় অলিগার্ক
৫ মার্চ ২০২৬ ২১:৫৪
॥ উসমান ফারুক ॥
দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে অলিগার্কদের বিদায় করেছিল জুলাই বিপ্লব, তা ফের নতুন চেহারায় ফেরার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকারে। একচেটিয়াভাবে নির্বাচনে জয় পেয়ে মন্ত্রিসভায় ব্যবসায়ীদের স্থান দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যবসায়ীদের নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মন্ত্রিসভায় ৭০ শতাংশই ব্যবসায়ী। আর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে অর্ধেকই ঋণখেলাপি। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে এভাবেই ধনিকশ্রণিরা মিলে একটি অলিগার্ক তৈরি করেছিল, যারা দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির পুরোটাই ভোগ করে। এতে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণির যে বিকাশ শুরু হয়ে কর্মসংস্থান বাড়ছিল, তা বাধাগ্রস্ত হয়ে বেকারের সংখ্যা বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে।
নতুন সরকার সেই পথেই হাঁটা শুরু করায় বিশ্লেষকরা বলছেন, দেড় দশকে গড়ে ওঠা অলিগার্কদের বলয় ভেঙে দেয় জুলাই বিপ্লব। তাদের পাচার করা সম্পদ এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে চিহ্নিত হচ্ছে। গত দেড় বছরে অলিগার্কমুক্ত একটি নতুন অর্থনীতি নির্মাণে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তার ধারাবাহিকতা বজায় না রেখে ব্যবসায়ীদের দিয়ে মন্ত্রিসভা ও রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্তে পুরনো অলিগার্করা নতুন চেহারায় ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে গণতন্ত্র ফের নির্বাসনে যাবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহি থাকবে না, বিত্তশালীরা সব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে ধুলায় মিশিয়ে দেবে।
গভর্নরের নিয়োগ দিয়ে শুরু
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো যে বলয় তৈরি করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারকারীদের অলিগার্ক বলা হয়। গত দেড় দশকে সরকারের মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অ্যাটর্নি জেনারেলের পদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দলীয় ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে প্রধান্য দেয় এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ।
যার ফলে ব্যাংক লুটপাট, অর্থ পাচার, রিজার্ভ ক্ষয়, টাকার মন পড়ে গিয়ে অর্থনৈতিক অচলাবস্থার তৈরি করে। মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়া ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে ওঠে। কোথাও কোনো জবাবদিহি না থাকায় শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি বাঁচাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে হাত পাততে হয় ঋণের জন্য। খেলাপি ঋণ ৫ লাখ কোটি টাকায় উঠে যায়। ব্যাংকে আমানত রেখে দিশেহারা হয়ে যান আমানতকারীরা।
অর্থনীতির সেই ভঙ্গুর দশা থেকে টেনে তোলার সুযোগ আসে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনের পর আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে। সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা পালিয়ে চলে যায় বিভিন্ন দেশে। দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে অর্থনীতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ব্যাংক খাত সংস্কারে হাত দেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থানা নতুন করে সাজান। অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইতিবাচক ধারায় ফেরে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চলতি ও আর্থিক হিসাব ইতিবাচক হয় বাংলাদেশের। টাকার পতন ঠেকানো হয় ১২২ টাকায়। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করেছিলেন তা হয়তো দেড়শ থেকে ২০০ টাকায় গিয়ে ঠেকবে ডলারের বিপরীতে।
অর্থনীতিকে টেনে তোলার সেই কারিগরকে কোনোরকম না জানিয়েই নিয়োগ বাতিল করে বিএনপি সরকার। টেলিভিশন ও পত্রিকার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন তার নিয়োগ বাতিল করা হচ্ছে। অথচ তাকে চুক্তিভিত্তিকভাবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলো।
তার বদলে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে। তিনি বিজিএমইএ-এর হয়ে ঋণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দেনদরবার করতেন। গত ডিসেম্বর মাসে তার ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হেরা গার্মেন্টস খেলাপি মুক্ত হয়।
গভর্নর হয়েই তিনি বিজিএমইএর ব্যবসায়ীদের শ্রমিকদের বেতন দিতে ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য বেতন-ভাতার সমপরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করেন। খেলাপি হওয়া থেকে বাঁচতে ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেন। এখন কোনো কারণ ছাড়াই জোর করে সুদহার কমানোর পথে হাঁটতে শুরু করেছেন তিনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসায়ী গভর্নর হওয়া এবারই প্রথম। এখন তিনি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সার্বিকভাবে আটকে যাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন।
একই দশা দুদকে
বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের সন্ধান ও দুর্নীতিগ্রস্ত গ্রুপগুলোর আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত করছিল দুদক। বিএনপি ক্ষমতায় গিয়েই সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগে বাধ্য করে। দুর্নীতির কারণে ঢাকার বাইরে পাঠানো কর্মকর্তাদের ফেরত আনা হয়। একইভাবে ঘুষ নেওয়ায় যেসব কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাদেরও চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে সরে যান লোকসান থেকে লাভে আনা ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মুসলিম উদ্দিন চৌধুরী। একইভাবে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ থেকে পদত্যাগ করেন সাবেক সচিব আসলাম আলম। এভাবে অর্থনীতি সাজানো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফের নিজস্ব লোক বসানো শুরু করেছে বিএনপি সরকার।
বাড়বে বৈষম্য
অলিগার্ক নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থায় ধনিকশ্রণি আরো ধনী হয় আর গরিব আরো গরিব হয় মন্তব্য করে অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান বলেছেন, এখন অর্থনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের সময় এসেছে। নব্বইয়ের দশকে আমরা দেখেছি, দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল আর্মি ও অলিগার্ক শ্রেণির লোকজন। এরপরই দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি শক্তিশালী হয়েছিল। হাজার হাজার ক্ষুদ্র এ মাঝারি উদ্যোগ তৈরি হয়। শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। তখন কর্মসংস্থান ভারতের চেয়ে দ্রুত বাড়ছিল। চালকের আসনে ছিল মধ্যম সারির উদ্যোক্তারা, যা চীনেরও সফলতার মূল শক্তি।
মুশতাক খান আরও বলেন, গত ১৭ বছরে আবার উচ্চবিত্তরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। নতুন অলিগার্ক শ্রেণির উদ্ভব হয়। এতে কেবল তাদেরই উন্নতি হয়। প্রবৃদ্ধি বাড়ে। তবে কর্মসংস্থান প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এই অলিগার্কদের ক্ষমতা ভাঙতে হবে। ব্যবসায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুঁজিপতিরা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে। তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে ভূরাজনীতির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক সংযোগ ঘটাতে হবে।
অলিগার্ক শ্রেণি আবার শক্তিশালী হলে অর্থ পাচার শুরু হয়ে দেশের অর্থনীতিকে ফাঁপা করে দেবে, তার একটি পূর্বাভাস রয়েছে শ্বেতপত্রে। সেখানে আর্থিক জালিয়াতি ও পুঁজি পাচারকে একটি নীরব ও বিধ্বংসী ড্রেন হিসেবে তুলনা করা হয়। এটি হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে দুর্বল করে টাকার মানে পতন ধরাবে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
রিপোর্টে অর্থ পাচারকে একটি ক্ষতিকর ‘টিউমার’-এর সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের বড় অংশ এই ক্ষতিকর টিউমার চুষে নেয়। এই পাচার চক্র প্রতি বছর জিডিপির ৩.৪ শতাংশ, রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয়ের এক-পঞ্চমাংশ এবং বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগের দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক মুক্তির একটি জাতীয় সুযোগ। নির্বাসিত গণতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্টা করার একটু উপায়। হাজারো যুবকের রাজপথ রাঙানো রক্ত সাগরে ভেসে এসেছে নতুন বাংলাদেশ। তাদের এ আত্মত্যাগ নতুন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য। সেই দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সকল রাজনৈকি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই তৈরি করা হয় জুলাই সনদ। তার ভিত্তি হচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য করা, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো ও সরকারকে জবাবদিহি করা। স্বচ্ছতা আনা রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেখানে অলিগার্কদের স্থান নেই।
কিন্তু সরকারের নীতি বলছে, পুরনো অলিগার্করা নতুন চেহারায় ফিরে আসবে দেশে। তার শঙ্কা দেখে জুলাইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া যুবকরাও বলেছে, যারা এ পথে যাবে সেই রাজনৈতিক শক্তিই বিলীন হয়ে যাবে।