বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ

দেশে সিজারিয়ান সন্তান জন্মদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে

সোনার বাংলা অনলাইন
১৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪২

সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে হাসপাতালে সন্তান ডেলিভারির সংখ্যা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ডেলিভারির সংখ্যা কমলেও সিজারিয়ান (সি-সেকশন) সন্তান জন্মদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে হাসপাতালে সন্তান ডেলিভারির সংখ্যা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ডেলিভারির সংখ্যা কমলেও সিজারিয়ান (সি-সেকশন) সন্তান জন্মদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক যুগে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২০২৫-এ হয়েছে ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ সালে এ হার ছিল ১৯ দশমিক ১ ও ২০১৯ সালে ৩৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের নতুন প্রকাশিত মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০২৫ (এমআইসিএস–বহুনির্দেশক গুচ্ছ জরিপ) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীতে বিবিএস আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
গত দুই বছরে জীবিত সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এমন ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সর্বশেষ সন্তান ডেলিভারি সি-সেকশনের মাধ্যমে হয়েছে এমন শতকরা হার প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে। প্রকাশিত জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫-এ ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ সি-সেকশন সন্তান প্রসব হয়েছে। এরমধ্যে শহরে ৫৬ শতাংশ ও গ্রামীণ পর্যায়ে ৫০ শতাংশ। গরিব জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধনী শ্রেণীর সি-সেকশনের প্রবণতা বেশি। গরিব শ্রেণী যেখানে ৩৪ শতাংশ সেখানে ধনী শ্রেণীর হার ৬৮ শতাংশ। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণীর ৪৫ শতাংশ, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ৫২ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণীর ৫৭ শতাংশ মানুষ ডেলিভারিতে সি-সেকশন পদ্ধতি নিয়েছে। এরমধ্যে ২০ বছরের নিচের ৫০ শতাংশ নারী এবং ২০-৩৪ বছরের ৫৩ শতাংশ নারী সিজিয়ান পদ্ধতিতে ডেলিভারি করেছে।
এ বিষয়ে ইউনিসেফের কান্ট্রি ডিরেক্টর রানা ফ্লাওয়ার বলেন, ‘‌বাংলাদেশে সি-সেকশন প্রসবের হার অস্বাভাবিক। প্রসবের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ নারী হাসপাতাল যাচ্ছে। যার মধ্যে বড় একটি অংশই সি-সেকশন পদ্ধতি গ্রহণ করছে, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সিজারিয়ান মানে বেশি খরচ এবং এতে অনেক পরিবার দরিদ্র হচ্ছে। সি-সেকশন পদ্ধতি কমিয়ে আনতে হবে। সেটি করতে হলে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা পালন করতে হবে।’
দেশে সি-সেকশন পদ্ধতিতে সন্তান ডেলিভারির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরাঞ্চলে অর্ধেকেরও বেশি নারী (৫৬ শতাংশ) সি-সেকশন পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করেন। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে এ হার আরো বেশি। শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও সিজারিয়ান প্রসবের হার ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় জরুরি হয়ে উঠেছে—কারা এই নারী, তারা কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে প্রসবসেবা নিচ্ছেন এবং এই উচ্চ হারে সিজারিয়ান সেকশন হওয়ার মূল প্রেরণা কী তা বোঝা। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালের আর্থিক প্রণোদনা, অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল পরামর্শ, প্রসবব্যথার ভয়, প্রসবসংক্রান্ত ভুল ধারণা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সীমিত সক্ষমতা এ প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলছে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এতে আরো বলা হয়েছে, সিজারিয়ান সেকশন একটি জীবনরক্ষাকারী হস্তক্ষেপ হলেও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নারীদের ও স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের সচেতন করা এখন জরুরি। অতিরিক্ত সি-সেকশনের ফলে মা ও নবজাতকের বিভিন্ন জটিলতা, পরবর্তী গর্ভধারণে ঝুঁকি বৃদ্ধি ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও বাড়ছে। তাছাড়া উচ্চ হারে সি-সেকশন ডেলিভারি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচকের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—যেমন জন্মের পরপরই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করার হার—তা আরো গভীরভাবে বুঝতে হবে। এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘‌দেশে হাসপাতালে ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ছে। ৭০ শতাংশ ডেলিভারি হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। বাকি ৩০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে। আমাদের বিনিয়োগ কিন্তু সরকারিতে বেশি। তবু সেবা বেশি নিচ্ছে বেসরকারি থেকে। এখানে সমঝোতা আনতে হলে একটা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ লাগবে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। সরকারিতে মিডওয়াইফ দেয়া হয়েছে কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে সেটা আছে কিনা জানি না। সরকারের যে কৌশল পদ্ধতি, গাইডলাইন বা এসওপি আছে সেটা প্রাইভেট সেক্টরে কতটুকু অনুসরণ করা হচ্ছে তা দেখতে হবে।’
ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়াও পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের মতো দেশে যেখানে সি-সেকশন প্রসবের হার কমিয়ে আনতে সরকারিভাবে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেখানে বাংলাদেশে সরকারিভাবে নেই সুষ্ঠু নীতি ও তদারকি। সি-সেকশনে নারীদের নিরুৎসাহিত করতে হলে সরকারি তদারকি ও চিকিৎসকদের নৈতিকতা জরুরি বলে মনে করেন পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌স্বাভাবিক ডেলিভারি যেখানে সবার জন্য হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দিন দিন অস্বাভাবিকভাবে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার বাড়ছে, এটা খুবই উদ্বেগজনক। প্রধান কারণ হলো সরকারিভাবে কোনো তদারকি না থাকা। সি-সেকশন ডেলিভারি কখন করতে হবে, স্বাভাবিক ডেলিভারি না করে কেন সি-সেকশনে চিকিৎসক যাচ্ছেন সেটি সরকারিভাবে তদারকি করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে কিছুটা তদারকি থাকলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে একেবারে দেখা যায় না। আরেকটি বিষয় চিকিৎসকদের নৈতিকতা। আমাদের অনেকে টাকার জন্য রোগীকে ম্যানিপুলেট করে সি-সেকশন করাচ্ছি। এটাই খুবই অন্যায় ও নীতিবহির্ভূত কাজ। এ জায়গাগুলোতে আমাদের সচেতন হতে হবে।’
নারীদের ডেলিভারি ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘‌ইউরোপে কেন সি-সেকশন করা উচিত নয় সে সচেতনতা গড়ে উঠেছে, বাংলাদেশে সেটা হয়নি। কেন স্বাভাবিক ডেলিভারিতে যাওয়া উচিত সে তথ্য মানুষের কাছে নেই। সরকারি তদারকিও নেই। চিকিৎসকের কাছে গেলে তো সে সিজার করবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সে আলোচনাটা তুলতে হবে যে কেন সিজারিয়ানের চেয়ে স্বাভাবিক ডেলিভারি করা দরকার।’

বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ