জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:৩৪
॥ জামশেদ মেহদী ॥
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। দেশে ৩০টিরও বেশি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। যে টেলিভিশন চ্যানেলই খুলবেন- দেখবেন, সেখানে ডাকসু এবং জাকসু ইলেকশনের রেজাল্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত রাতে অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর রোববার এসএ টিভির টকশোতে এক আলোচক হাস্যরসিকতার ছলে বললেন, আমাকে যখন আজকের টকশোতে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন আমি অ্যাঙ্করকে জিজ্ঞাসা করি, কী বিষয়ে আলোচনা হবে? তিনি জানালেন যে, ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে। আমি বললাম, এ নিয়ে তো বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। তো আজ আমাকে এ বিষয়েই কথা বলার জন্য ফের ডাকছেন কেন? উত্তর, আপনি ডাকসুর দুবারের ভিপি ছিলেন। তাই আপনার চেয়ে ভালো এ বিষয়ে আর কেউ বলতে পারবে না। এ গল্পটি তিনি টকশোতেও বলেন। আর সকলে তার কথা শুনে উচ্চৈঃস্বরে হাস্যরোল করেন।
আসলেই তাই। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রশিবিরের ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি হয়েছে। এটি যেমন মানুষকে বিস্মিত ও হতবাক করেছে, তেমনি ২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল একটি আসনও পায়নি- এ বিষয়টি মানুষকে আরো বেশি বিস্মিত ও হতবাক করেছে। বিভিন্ন কারণে বিষয়টি নিয়ে মানুষ গবেষণা করছেন।
প্রথমত, ছাত্রদল বিএনপির অঙ্গ সংগঠন। অনুরূপ ইসলামী ছাত্রশিবির জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ছাত্র সংগঠন।
গত বছরের জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা সদলবলে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত হন। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি। অনুরূপভাবে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ডান্ডা এবং পেশিশক্তির জোরে একচেটিয়া রাজত্ব করছিলো। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রদল। সুতরাং পাবলিক পারসেপশন এভাবেই গড়ে ওঠে যে, ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে ছাত্রদলই হবে ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি ছাত্র-সমর্থিত ছাত্র সংগঠন।
যারা এরকম পারসেপশন গড়ে তোলেন, তারা অবশ্য একটা মৌলিক বিষয় ভুলে গিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী তো গত বছরের ৩ আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয় ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে হেন ক্রাইম নেই, যা তারা না করেছে। এমন একটি ত্রাসের রাজত্বেও ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিলো। সেখানে ভিপি হয়েছিলেন নুরুল হক নূর। তখন নূরের দলের নাম ছিলো ছাত্র অধিকার পরিষদ। জুলাই বিপ্লবের যারা প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন, তাদের অনেকে নূরের ছাত্র অধিকার পরিষদে ছিলেন। ২০১৯ সালের ইলেকশনেও ছাত্রদল তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
এবার আমার কাছে যেটি বড় বিস্ময় মনে হয়েছে, সেটি ছাত্রদলের সম্পূর্ণ ভরাডুবি নয়, বরং এনসিপি-সমর্থিত বাগছাসের শোচনীয় পরাজয়। এ কারণে কথাটি বললাম যে, অতীতে দেখা গেছে, যাদের নেতৃত্বের কারণে দেশে দুর্বার গণআন্দোলন হয় অথবা গণঅভ্যুত্থান হয়, তাদের দলই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ নির্বাচনে জয় লাভ করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ এবং আ স ম আব্দুর রব। নেতৃত্বে আরো ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, ডাকসুর জিএস আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং শাহজাহান সিরাজ। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনে তারা যেমন জয়লাভ করে, তেমনি জাতীয় নির্বাচনেও তাদের প্যারেন্ট সংগঠন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদল নেতৃত্বদান করে। নেতৃত্বে ছিলেন আমানউল্লাহ আমান এবং খায়রুল কবির খোকন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যারেন্ট সংগঠন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। জুলাই বিপ্লবে যারা নেতৃত্বদান করেন, তাদের মধ্যে যাদের নাম সবসময়ই গণমাধ্যমে আসছিলো, তাদের মধ্যে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ। বিপ্লবের অব্যবহিত পর জানা যায় যে, বিপ্লবের বৃহত্তর স্বার্থে সেই আন্দোলনে আরো নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাদিক কায়েমসহ আরো অনেক শিবির নেতাকর্মী। যারা কোনো রাজনৈতিক দলে ছিলেন না, তাদের মধ্যে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, আখতার হোসেন প্রমুখ। সাদিক কায়েমসহ ছাত্রশিবির পূর্ণ শক্তিতে আন্দোলনে নামে। আরেকটি নাম বিপ্লবের পরে জানা যায়। তিনি হলেন মাহফুজ আলম। তবে তিনি কোন ছাত্র সংগঠনে ছিলেন, সেটি আজও জানা যায়নি। নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন এরা সবাই গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি করতেন।
বিপ্লবের পর একমাত্র সাদিক কায়েম ছাড়া অন্য যেসব নেতার নাম ওপরে উল্লেখ করা হলো, তাদের কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছিলো না। তাই তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করে। এ দল সংক্ষেপে এনসিপি নামে পরিচিত। এনসিপি নতুন একটি রাজনৈতিক দল। নেতারা সবাই ৩০ বছরে নিচে। সুতরাং রাজনৈতিক দল হিসেবে ভিত্তি গড়ার সময় তারা পাননি। হয়তো ভবিষ্যতে তারা আবার অনেক বড় দল হবে। কিন্তু অতীতের ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের মতো জুলাই বিপ্লবের ফসল তারা ঘরে তুলতে পারেননি। কিন্তু সেই ফসল ঘরে তুলেছে ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামীও জুলাই বিপ্লবে জীবন বিপন্ন করে শরিক হয়েছিলো।
প্রশ্ন হলোÑ এবারের দুই ভার্সিটি নির্বাচনে ছাত্রদল ৎড়ঁঃবফ বা উৎখাত হলো কেন? ভেতরে গিয়ে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, ছাত্রদলকে ১৫ বছর ধরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেশিশক্তির জোরে ছাত্রলীগ বের করে দিয়েছে। কিন্তু ছাত্রদল একবারও ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেনি। অনুরূপভাবে বিএনপিও ১৫ বছর মানববন্ধন এবং জনসভা করেছে। তারা কোনো সময় মার খেয়ে হলেও রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেনি। বিএনপি নেতাদের কণ্ঠে সবসময়ই ছিলো এক আওয়াজ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, অহিংস আন্দোলন, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চলে?
গত বছরের ৫ জুন থেকে বস্তুত ছাত্ররা কোটা আন্দোলন শুরু করে। সেখানে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের বাচ্চা’ জাতীয় লাগামহীন উক্তি এবং ওবায়দুল কাদেরের, ‘ওদের মোকাবিলা করার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ জাতীয় বল্গাহীন এবং উদ্ধত উক্তিতে ছাত্র আন্দোলনকারীরা ভয় পেয়ে পিছু হটেনি। জুলাই মাসে পবিত্র মহররমের রাত্রে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক এবং জনগণের প্রতি অসম্মানজনক বক্তৃতার প্রতিবাদে আন্দোলকারীরা ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনীকে ভয় না পেয়ে রুখে দাঁড়ায়। ১৪ জুলাই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পূর্ণ শক্তি নিয়ে ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে মার খেয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে ছাত্র-ছাত্রীরাও পাল্টা মার শুরু করে। আন্দোলনের নেতাদের এ দুর্জয় সাহস দেখে ছাত্রদের সাথে জনগণও শামিল হন। শুরু হয় পাল্টা মার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সমস্ত হল থেকে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়। তখনই ছাত্রদের বিজয়কেতন উড়তে শুরু করে।
নিজেদের এক্সপোজ না করে ছাত্রশিবির হাজার হাজার কর্মী নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের অনেকে শহীদ হন। ছাত্রশিবির শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সারা দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন। তাদের এ সক্রিয় সংযুক্তি সাধারণ ছাত্রসমাজ দেখেছেন। বিপ্লবের পর ছাত্রসমাজ সেটি ভুলে যায়নি। এর বিপরীতে মির্জা ফখরুল মুখে যতই বলুন, ছাত্রদল তেমন কোনো অবদান রাখেনি। আন্দোলনে শিবিরের অবদানকে সাধারণ ছাত্রসমাজ স্বীকৃতি দিয়েছে ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনে তাদের ভূমিধস বিজয় দিয়ে।
এ কথা এখন আর কারো অবিদিত নয় যে, লাখ লাখ জনতার প্রচন্ড রক্তচক্ষুর ভয়ে শেখ হাসিনা তো বটেই, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ইন্ডিয়ায় ভেগে যায়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ যেসব চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপকর্মে লিপ্ত ছিল, সেসব চাঁদাবাজি ও অপকর্ম ঠিকই অব্যাহত থাকে। তবে চাঁদাবাজদের শুধুমাত্র রং পরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের জায়গায় আসে যথাক্রমে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল। প্রশাসনের মধ্যেও এমন ধারণা জন্মে যে, আগামী নির্বাচনে তো ক্ষমতায় আসছে বিএনপি। এমন একটি সাধারণ ধারণার সুযোগ নেয় বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনসমূহও। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার যত ডিসি, এসপি এবং ওসি আছেন, তাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ। জনগণ বলতে শুরু করেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বিএনপি যে চোটপাট দেখাচ্ছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর না জানি বিএনপির আরো কোনো মারদাঙ্গা রূপ দেখতে হয়। আপনি দোকানদার, ভ্যানওয়ালা; এমনকি রিকশাওয়ালার সাথে আলাপ করলেও শুনবেন বিএনপির চাঁদাবাজি ও মাস্তানি।
ছাত্রদের মধ্যেও দেখা যায়, ছাত্রদল সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলগা মাতব্বরি শুরু করেছে। বিএনপি ও ছাত্রদলের এসব হঠকারী কার্যকলাপে ছাত্রজনতা নির্বিশেষে মানুষ চরম বিরক্ত হয়েছে। আর সেই বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনে। ছাত্রদল যে কত বড় উদ্ধত এবং বেয়াদব হয়েছে, তার জ¦লন্ত প্রমাণ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় ওরফে সাহসের বেয়াদবের মতো ব্যবহার এবং টেবিল চাপড়ানো ।
ইতোমধ্যেই সর্বশ্রেণির মানুষের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) এবং ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ডাকসু এবং জাকসুর ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
আর দলনিরপেক্ষ বিবেকবান নাগরিক সমাজ মনে করেন যে, ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনের প্রভাব যদি জাতীয় নির্বাচনের ওপরেও পড়ে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এই লেখার শেষ মুহূর্তে জানা গেল যে, ৫ দফার ভিত্তিতে ৩টি ইসলামী দল জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে ইতোমধ্যেই রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে। দল ৩টি হলো, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন এবং মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। আরো অনেক রাজনৈতিক দল শিগগিরই এ আন্দোলনে শরিক হবে বলে জানা গেছে।