ডাকসুতে শিবিরের জয় : দেশের রাজনীতিতে তারুণ্যের বার্তা

রাজনীতিতে সমীকরণ বদলাচ্ছে


১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৪

॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষাঙ্গন ও জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ ৬ বছরের বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের বিজয় শুধু ক্যাম্পাসেই নয়, জাতীয় পর্যায়ে নতুন বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ডাকসু নির্বাচনের ফল সবসময়ই বৃহত্তর রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় মানে কি জাতীয় রাজনীতিতে নৈতিকতানির্ভর ধর্মভিত্তিক শক্তির পুনরুত্থান? এ ঘটনার প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে কতটা পড়তে পারে? এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
ডাকসু: জাতীয় রাজনীতির ব্যারোমিটার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র নয়; বরং বাংলাদেশে গণআন্দোলনের অন্যতম জন্মভূমি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- সবকিছুতেই ডাকসুর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, ডাকসুতে যে শক্তি নেতৃত্বে উঠে আসে, তারা একসময় জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে। ফলে ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনও জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ চিত্র বোঝার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিবিরের ঐতিহাসিক জয়
জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি করা দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। তরুণ সমাজ যে এটি প্রত্যাখ্যান করেছে, তার প্রমাণ মিলেছে এবারের ডাকসু নির্বাচনে। রাজনৈতিকভাবে সংকটে পড়লেও ইসলামী ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিল। তবে সরকারি দমননীতি, সহিংস রাজনীতির কল্পিত অভিযোগ ও সামাজিকভাবে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে তাদের মূলধারার বাইরে ঠেলে রাখা হয়েছিল।
এবার ডাকসু নির্বাচনে শিবির নেতৃত্বাধীন প্যানেলের জয় সে ধারাকে পাল্টে দিয়েছে ভেতর থেকে। এটাকে অনেকেই অপ্রত্যাশিত সংকেত বলছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতি অনাস্থা, দুর্নীতি ও দমননীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজ- এ তিনটি কারণে শিবিরের পক্ষে ভোটের ঝোঁক সুনামি আকার নিয়েছে।
প্রচলিত ছাত্র সংগঠনের ব্যর্থতা
ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের জয়কে অনেকে মূলত প্রচলিত ছাত্র সংগঠনের ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন। বিগত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ভোট কারচুপি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি ও দলীয়করণের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত ছিল। অন্যদিকে তখনকার প্রধান বিরোধীদলের ছাত্র সংগঠনও সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে তরুণ প্রজন্ম শিবিরকে ‘বিকল্প’ শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ডাকসুর ফলাফলে আমরা দেখলাম তরুণরা এতদিন ধরে চলা ক্ষমতার ধারার রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শিবিরের জয় তাদের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ব্যর্থতারও প্রমাণ দেয়।’
ছাত্ররাজনীতির নতুন ভারসাম্য
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রলীগের আধিপত্য ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবার শিবির ডাকসুতে বড় জয় পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, ছাত্ররাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। এতে জাতীয় রাজনীতির দলগুলো বাধ্য হবে ছাত্ররাজনীতিকে আবার গুরুত্ব দিয়ে দেখতে। রাজনৈতিক রেটরিক দিয়ে এখন ছাত্ররাজনীতি চলবে না, ছাত্ররাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে চাইলে ছাত্রদের জন্য প্রকৃত কল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়ে আসতে হবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব
শিবিরের এ জয়কে ইসলামী রাজনৈতিক ধারার জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত-শিবির পুনরায় মাঠে নামার বৈধতা ও মনোবল এটি অনেকটাই বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যেতে পারে। অন্যান্য ইসলামপন্থী দলও এ সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রার্থী বাড়াতে চাইবে। অথবা জোট করে নির্বাচনেও নামতে পারে।
কথিত বড় দলের জন্য সতর্কবার্তা
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দুই দলের রাজনীতির জন্যই এটি এক ধরনের সতর্ক সংকেত। আওয়ামী লীগের জন্য এর মানে হলো- তাদের ছাত্র সংগঠনের ফ্যাসিবাদী কাঠামো ও কৌশল দিয়ে তারা আর রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না। বিএনপির জন্য এটির বার্তা হলো তাদের সফল হতে হলে জুলাই ঐক্যকে ধারণ করে সামনে অগ্রসর হতে হবে। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির সমন্বয় করে এগোতে পারলে জাতীয় নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাবের চিত্র
স্বল্পমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হবে শিবিরের উত্থান ও ছাত্ররাজনীতির নতুন সমীকরণ। মধ্যমেয়াদে বড় দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন ও জোট কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে। দীর্ঘমেয়াদে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের ধারা বদলাবে, জাতীয় নির্বাচনে ছাত্রনেতাদের ভূমিকা বাড়বে।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব: তিনটি মাত্রা
১. ভোটের সমীকরণে পরিবর্তন: শিবিরের জয় সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ তৈরি না করলেও এর প্রতীকী প্রভাব বড়। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ যদি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আস্থা দেখায়, তবে সেই ভোট আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রার্থী বা স্বতন্ত্র ইসলামপন্থী প্রার্থীদের দিকে যেতে পারে। এতে নির্বাচনী অঙ্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।
২. জোট রাজনীতির নতুন সমীকরণ: বিএনপি শিবির-জামায়াতের ভোটব্যাঙ্ককে পাশে টানার চেষ্টা করতে পারে। আবার জামায়াত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গঠনের বিষয়ে অধিক সক্রিয় হতে পারে। পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি নিশ্চিতভাবে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে- এমন ধারণা বিদায় নিতে পারে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট ছোট ছাত্র ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নতুন জোট আলোচনায় আসতে পারে। ইতোমধ্যে নির্বাচনে ইসলামী ও সমমনা জাতীয়তাবাদী দলগুলোর ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এটি সামনে আরো অগ্রসর হতে পারে। তরুণ সমাজের মতো দেশের সাধারণ মানুষও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
৩. রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাব: ডাকসুতে শিবিরের জয় মানে সমাজে নৈতিকতানির্ভর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এটি রাষ্ট্র ও বাইরের অংশীদারদের জন্য বাংলাদেশের বাস্তবতা উপলব্ধি করার ব্যাপারে সতর্কবার্তা। প্রচলিত দলগুলো যদি দুর্নীতি, দমননীতি ও অকার্যকর শাসন থেকে সরে না আসে, তবে ধর্মভিত্তিক শক্তি আরও বেশি জনসমর্থন পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
শিবিরের এ সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও আলোড়ন তুলেছে। পশ্চিমা দাতাগোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভাবছে যে- নৈতিকতানির্ভর ধর্মভিত্তিক শক্তির পুনরুত্থান কি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদকে সংকটে ফেলবে? নাকি এটিকে বাস্তবতা ধরে নিয়েই তাদের নতুন সম্পর্ক বিন্যাস করতে হবে। অপরদিকে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশ এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে শিবিরের উত্থান তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার ধারণার জন্য নতুন মাথাব্যথা তৈরি করবে।
তরুণ ভোটারদের বার্তা
ডাকসু নির্বাচন সাধারণত দেশের তরুণ ভোটারদের মানসিকতা প্রতিফলিত করে। তরুণরা পরিবর্তন চায়, একচেটিয়া দখলভিত্তিক রাজনীতিতে তারা ক্লান্ত। জাতীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন হলে তরুণ ভোটে নতুন শক্তি উপকৃত হতে পারে।
তরুণ ভোটারদের দিক থেকে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো- তাদের বড় একটি অংশ মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। এ বার্তাকে গুরুত্ব না দিলে জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো আরও বড় ধাক্কা খেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা বলেন, ‘আমরা উগ্রপন্থা চাই না। কিন্তু প্রচলিত ছাত্র সংগঠন আমাদের জন্য যে হতাশা তৈরি করেছে, তার বিকল্প কোথায়? শিবির অন্তত সংগঠিত ও পরিষ্কার মেসেজ দিয়েছে।’
সামনে কী?
ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয় ডাকসুকে নতুন এক রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে। আগামী মাসগুলোয় তারা ক্যাম্পাসে কেমন ভূমিকা রাখে, সেটিই নির্ধারণ করবে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। যদি তারা গণতান্ত্রিক আচরণ ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করতে পারে, তবে জাতীয় রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। কিন্তু প্রান্তিকতার পথে হাঁটলে তাদের মূলধারার বাইরে চলে যাবার ঝুঁকি থাকবে।
ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের জয় শুধুমাত্র একটি ছাত্র-সংগঠনের বিজয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, তরুণদের হতাশা ও বিকল্প খোঁজার প্রবণতার প্রতিফলন। জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে এবং আসন্ন নির্বাচনে এ প্রতীকী বিজয় কৌশলগতভাবে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন হলো- তথাকথিতরা রাজনৈতিক দলগুলো কি এ বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের সংস্কার করবে, নাকি দিন দিন আরও জনবিচ্ছিন্ন হবে।