ফ্যাসিবাদের পথ খোলা রেখে নির্বাচন হবে আরেক প্রহসন
১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৯
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ক্ষমতার হাত, ব্যক্তি ও দল বদলের জন্য জুলাই-আগস্ট বিপ্লব হয়নি। রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের বদল এবং জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করে বৈষম্যমুক্ত মানবিক দেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ছাড়া বিপ্লব ব্যর্থ। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিনির্ভর রাজনীতির কবর রচনা করে তার ওপর মানবাধিকারের ঝান্ডা ওড়াতে হবে। ঘুষ, সুদ ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে জাকাতভিত্তিক কল্যাণমূলক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শহীদদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সবার আগে একদল দক্ষ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্বের হাতে দিতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। কিন্তু সেই পথ তৈরি তো আর এমনি এমনি আসমান থেকে আসবে না। তার জন্য প্রয়োজন সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের আদর্শের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর চলে গেছে, কিন্তু শিক্ষা সংস্কার কমিটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের জন্য গঠিত বাকি কমিটিও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব পাস করতে পারেনি।
মুখ রক্ষার একটি ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দেয়া হলেও ‘জুলাই সনদ’ এখনো অনিশ্চিত। এদিকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করে জোরেশোরে প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন পদ্ধতি সংখ্যানুপাতিক, নাকি জনপ্রতিনিত্বমূলক- কী হবে? এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন অবস্থায় একটি নির্বাচন জাতিকে কী দিতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে রাজনীতি বিশ্লেষকরা হতাশ। তারা মনে করেন, পুরনো ব্যবস্থায় নির্বাচন এবং ক্ষমতার হাত বদল আবারও বৈষম্যের দিকেই নিয়ে যাবে দেশকে। এর মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ঘুষ-দুর্নীতির লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া জাতি আর কিছুই পাবে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বদলে আবারও এক অস্থির ব্যবস্থাকেই আমন্ত্রণ জানানো হবে। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের শঙ্কা এখনো কাটেনি।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের শঙ্কা কাটছে না
দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা এবং রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের শঙ্কা এখনো কাটেনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, সেই তারিখের ব্যাপারে জামায়াতের মৌলিক কোনো আপত্তি নেই। নির্বাচনের আগে বিচার ও সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের আগে আরও দুটি কাজ সারতে হবে আমাদের। একটা হচ্ছে বিচারকে দৃশ্যমান করতে হবে। সিম্বলিক করতে হবে। সকল বিচার এ সময়ে সম্ভব নয়- এটা আমরা জানি। কিন্তু এটা সিম্বলিক এবং দৃশ্যমান করতে হবে যে গভর্নমেন্ট বিচারে সিনসিয়ার (আন্তরিক) আছে। ডা. তাহের আরো বলেন, ‘দেশে এককভাবে নির্বাচন কন্ডাক্ট (পরিচালনা) করে জিতে যাওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, মানুষের ভেতরে এখনো সেই শঙ্কাটা কাটেনি যে, নির্বাচন ফেয়ার (অবাধ ও সুষ্ঠু) হবে কি না। সেজন্য আমরা বলেছি, সরকারকে অনেকগুলো উদ্যোগ নিতে হবেÑ যাতে করে মানুষ কনফিডেন্স (আত্মবিশ্বাস) পায় যে, এবার নির্বাচনটি সঠিক হবে।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরাও মনে করেন, এবার নির্বাচন এবং নির্বাচনের পর কোনোভাবে জনগণ প্রতারিত হলে জনগণের মাঝে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাই যেনতেন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের চিন্তা করলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভুল করবে। তা হবে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানী।
নিরাপদ সড়ক ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ইতিবাচক ভূমিকার কারণে পরিচিত রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদও মনে করে, দেশে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। দলটির সভাপতি নুরুল হক নূর বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আগে সংস্কার, এরপর নির্বাচন। নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি না করে নির্বাচন হতে পারে না। আগামীতে যাতে কেউ ফ্যাসিবাদী হতে না পারে, সেজন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে সবাই মিলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধের ঐক্য অটুট রাখতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর এ কয়েক মাসে দেখা গেছে, অনেকের পেট এরই মধ্যে মোটা হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১২ মাসে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে মানুষের যে আশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। এমন অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম বলেছেন, ‘দেশে এখনো নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এখনো ভোটের জন্য লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। আমাদের নির্বাচনে যাওয়া কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন যথাযথ ফাংশন করছে না এবং বর্তমান সরকার প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সেখানে এ অবস্থায় নির্বাচন করতে গেলে প্রার্থীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে যায়। এ ঝুঁকিতে কেন নির্বাচনে যাবো- সেই প্রশ্ন আপনাদের কাছে রাখলাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘পিআর আমাদের দাবি। এর মাধ্যমে কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমবে, সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হবে, কিন্তু বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় যেতে চায় বলে পিআর নিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত কথাবার্তা বলে।’
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের আগেই সংস্কার ও বিচার দৃশ্যমান করতে হবে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, নির্বাচনের জন্য লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। গণহত্যাকারীদের বিচার ও রাষ্ট্রকাঠামোর গুণগত পরিবর্তনের জন্য সংস্কার নিয়ে এ সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। তাই নির্বাচনের আগে সংস্কারকে দৃশ্যমান করা ও সংস্কার বাস্তবায়ন করা এ সরকারের অবশ্য কর্তব্য।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউর রহমান গাজী বলেন, ‘নির্বাচন অবশ্যই জুলাই সনদের ভিত্তিতে হতে হবে। আগে জুলাই সনদ হোক, তারপর আমরা বলতে পারব আমরা নির্বাচন নিয়ে কী অবস্থান নেব। আমরা পিআর পদ্ধতির কথা বলেছি। লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড চাই। আগের মতো নির্বাচন চাই না। তাহলে এ বিপ্লব কেন?’
জনমনের শঙ্কা কাটানো এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য অনেক বিশ্লেষক জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে। তারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের পর হলে জনমতের প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ এতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রভাব খাটাবেন। তারা যেকোনো মূল্যে চাইবেন, তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে এলাকার জমিদারি কায়েম রাখতে। আর জমিদারি কায়েম রাখা মানে কী তা আশা করি কারো অজানা নয়- ১. সরকারি খাসজমি, বালু মহাল, বন, নদী-সাগর, হাট-বাজার ইজারার নামে চাঁদাবাজির মচ্ছব, ২. টেন্ডারবাজি করে সরকারি কাজ বাগিয়ে নামকাওয়াস্তে কাজ করে জনগণের সম্পদ লুটপাট। ৩. দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী, ফ্যাসিবাদের দোসর আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া। এ পুরানো চক্র থেকে মুক্তির জন্যই নির্বাচনের আগে কিছু প্রশ্নের উত্তর জরুরি; যেমন- ১ মৌলিক সংস্কার, ২. বিচার, ৩. জুলাই সনদ, ৪. নির্বাচন পদ্ধতি, ৫. লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড, ৬. আইনশৃঙ্খলা, ৮. নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নাকি অন্তর্বর্তী সরকার। এখন প্রশ্ন হলো- তাহলে কেন আগেই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষাণা করা হলো?
শুধু নির্বাচন ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না
এ প্রশ্নের সরল উত্তর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল জাতীয় নির্বাচন। তারা মনে করে, নির্বাচন হলেই সব সঙ্কট কেটে যাবে। নির্বাচিত সরকার আসবে, তখন তারা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের জাদুতে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। কিন্তু কি তাই। তারা কি আসলেই পারবে? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশ ইতোপূর্বে একবার ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ বন্ধ থাকায় একদল সেনাসদস্য সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তারা আজ কে কোথায়, কেউ জানে না। তাদের পরিবার-পরিজনকে এজন্য চরম খেসারত দিতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ২০২৪-এর বিপ্লবীরা এমন অনিশ্চিত জীবন চান না বলেই উল্লেখিত বিষয়গুলোর জাতীয় ঐকমত্য হওয়ার আগে নির্বাচন চান না।
সূত্রে প্রকাশ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংস্কারের ১৬৬টি সংস্কার সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করলেও এখন পর্যন্ত ঐকমত্য হয়েছে ১৯টি বিষয়ে। তবে নোট অব ডিসেন্টও আছে। সেই বিবেচনায় ১৬টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। জুলাই সনদ এখনো হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রয়োজনীয় সংস্কার করেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হতে হবে। নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার লাগবে। আইনের সংস্কার লাগবে। তবে সবই সম্ভব। আমি কোনো আশঙ্কা দেখছি না।’
ড. বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে সরকারের আন্তরিকতার কোনো অভাব দেখছি না। তবে নির্বাচন কশিমনকে তার কাজের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আর সেসব সংস্কার প্রয়োজন, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হতে হবে। সেটা হলে কোনো সমস্যা দেখছি না।’
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলেই অনেক বিশ্লেষক অপ্রাসঙ্গিকভাবেই আওয়ামী লীগকে টানার চেষ্টা করেন। অথচ আওয়ামী লীগের আদর্শ গণতন্ত্র নয়- এ কথা তারা এখনো প্রায় প্রতিদিন জানান দিচ্ছে। বিভিন্ন নামে জঙ্গি তৎপরতার হুমকি দিচ্ছে। জঙ্গি ট্রেনিংয়ের আয়োজন এবং সামরিক অস্ত্রশস্ত্রসহ ধরাও পড়েছে। গণহত্যার জন্য কোনো অনুশোচনা নেই। বরং ফিরে এসে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেয়া জনগণকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবে বলে হুমকি দিচ্ছে। থানা ও পুলিশ সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে। বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি পোড়ানোর মতো জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আনার অর্থ গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত করা। পৃথিবীর উন্নত দেশ; আমেরিকা-ইউরোপে এজন্য ফ্যাসিজমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেমন: জার্মানিতে নাৎসি পার্টি, ফ্রান্সে ফ্যাসিস্ট পার্টির পক্ষে কেউ কথা বললেই তাকে আটক করে শাস্তির আওতায় আনা হয়।
বাংলাদেশেও এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারপরই নির্বাচনের কথা ভাবতে হবে। ফ্যাসিবাদের পথ খোলা রেখে নির্বাচনের আয়োজন করা হলে তা হবে আরেক প্রহসন।