শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক বিজয়

সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৫৯

রপ্তানিসহ সবখানে ভারতকে টেক্কা দিতে ভৌগোলিকভাবেই শক্তিশালী বাংলাদেশ

॥ উসমান ফারুক॥
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির মাঝপথেও পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসর অর্থনীতিবিদ ও তথাকথিত সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হয়রানি করতে নানা প্রকার সমালোচনা শুরু করেছিল। যার সহযোগী হয়েছিল আওয়ামী সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য ও দুটি পত্রিকা। সরকারের বিচক্ষণ নীতি, পেশাদারি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে স্বচ্ছতা থাকায় শুল্ক নিয়ে বাংলাদেশ ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনে। এর পেছনের কারণ হচ্ছে, এশিয়ার মধ্যে সাগরপথে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এ কারণেই সম্পর্কোন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশকে। তাই ভারতকে কোণঠাসা করে বাংলাদেশের শুল্ক কমিয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভারসাম্য আনতে বাংলাদেশকে পাশে পায় যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই অতিরিক্ত শুল্ক নিয়ে যে বড় ঝুঁকি দেখা গিয়েছিল, এখন তা বাংলাদেশের জন্য অমিত সম্ভাবনাময় বাজার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এখন ভারত ও চীনের রপ্তানি বাজারের একটি অংশ বাংলাদেশে চলে আসবে। এতে আরো বড় হবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এবং বাড়বে কর্মসংস্থান।
শুল্ক কমে ২০ শতাংশ, ভারতের ২৫ শতাংশ
গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশসহ ৯০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো উদ্দেশ্য বলা হলেও মূলত বিশ্ব বাণিজ্যে ট্রাম্পের ক্ষমতা বৃদ্ধিই মূল লক্ষ্য ছিল। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার কথা বলে শুল্ক বৃদ্ধি করে।
প্রস্তাবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপের কথা বলা হয়। সেই প্রস্তাবে আলোচনার পর গত জুলাইয়ে সামান্য কমিয়ে ৩৫ শতাংশ আরোপের কথা বলে। এ সময় ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ধরা হয় ২৬ শতাংশ। এ হিসাবে বাংলাদেশর সামনে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য; বিশেষ করে তৈরি পোশাকের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বাজার হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়।
শুল্ক হার এটি হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের এক-তৃতীয়াংশ বাজার ভারতের দখলে চলে যেত। কিন্তু টানা তিন মাস দরকষাকষি ও তৃতীয় দফার বৈঠকের পর গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্কারোপ ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ভারতের শুল্কহার করে ২৫ শতাংশ। এতে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় লবিং ব্যর্থ হয়ে যায়। এখন উল্টো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাজার আরো সম্প্রসারণ হবে। ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে খরচ বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের।
বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার ওপর ১৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের উপর ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব দেশের নতুন শুল্কহার ভারতের চেয়েও কম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এসব দেশ থেকে আগের চেয়ে বেশি করে পোশাক নিতে পারবে মার্কিন ক্রেতারা।
শুল্কহার কত দাঁড়াবে: এতদিন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন নতুন করে আরও ২০ শতাংশ শুল্ক যোগ হওয়ায় তা গড়ে ৩৫ শতাংশ হবে পণ্যভেদে।
বড় ঝুঁকি রূপ নিয়েছে সম্ভাবনায়
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কারোপের প্রস্তাব ছিল ৩৫ শতাংশ, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। শুধু ভারতের ওপরই প্রস্তাবিত শুল্ক ছিল ২৬ শতাংশ। যদি শুল্কহারে পরিবর্তন না হতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়া বাংলাদেশের রপ্তানির ২০ শতাংশ হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন দিয়েছিল বাণিজ্য সাময়িকী দ্যা ইকোনমিস্ট। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
কূটনৈতিক বিজয়ে সেই ঝুঁকি এখন বড় সম্ভাবনাময় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সেই ঝুঁকি এখন নতুন সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে। আমাদের সামনে এখন অনেক সুযোগ। এখন ইন্ডাস্ট্রিকে (ব্যবসায়ীদের) বুঝতে হবে, সক্ষমতা তৈরি করতে হবে এ সম্ভাবনাময় বাজারকে ধরার।
চীনের ওপর ৫৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে তিন মাস পিছিয়ে দিয়েছে। আগামী অক্টোবরে শি জিন পিং ও ট্রাম্পের মধ্যে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধের অবসান হতে পারে। দেশের একশ্রেণির তথাকথিত ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ ভয় ছড়াচ্ছে যে, চীন থেকে পণ্য আমদানি করলে বাংলাদেশর ওপর বাড়তি শুল্কাারোপ করা হবে- সেই শঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য চুক্তিগুলো সবসময়ই উন্মুক্ত করা হয়। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়, যেমনটি হয়েছে ভারতের বেলায়। শুল্কহার ২৬ শতাংশ করার সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছে রাশিয়া থেকে আমদানি করলে জরিমানা করবে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিয়ে বলেছে, ভারত যদি কথা না শুনে, তাহলে সাধারণ শুল্ক আরো বাড়িয়ে দেবে।
চীনের সঙ্গে যদি বাংলাদেশ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, তাহলে একই দিনে তা ঘোষণা করতো ট্রাম্প প্রশাসন। এমনটি না করায় পরিষ্কার বোঝা যায়, শুল্ক ইস্যুতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে আলোচনা হবে তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসবে না। সেজন্য বাংলাদেশ পুরোটাই নিরাপদ।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে কোনো প্রকার সমস্যা হবে না মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে যা হয়েছে, তা মোটামুটি পাব্লিক (প্রকাশ) হয়েছে। সামনে তা পুরোটাই ডকুমেন্ট আকারে প্রকাশ হবে। এখানে এমন কোনো ক্লজ (ধারা) নেই, যা অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে বাধা তৈরি করবে, থাকলে তা ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েই দিতেন। যেমনটি রাশিয়া ও ভারতের বেলায় নাম ধরে বলেছেন। বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু দেখা যাচ্ছে না।
যে কারণে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিল যুক্তরাষ্ট্র
বর্তমান বিশ্বে অনেক সময়ই বড় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে গিয়ে আরেক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বড় দেশের সঙ্গে বোঝাপড়া ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেই ভারসাম্য বজায় রেখেছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ। কিন্তু বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে শুধু ভারতনির্ভরতা করে রাখায় কূটনৈতিক সাফল্য আসেনি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে।
ভবিষ্যতে প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, জাপান ও চীনের মতো বড় অর্থনীতি এবং ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে সম্পর্ক বজায় রাখতে স্মার্ট কূটনীতির কথা বলেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমান।
সিঙ্গাপুরের মতো ছোট একটা দেশ চীনের সঙ্গে বছরে ১৭১ বিলিয়ন বা ১৭ হাজার ১০০ ডলারের বাণিজ্য করে। সেই দেশটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিকিউরিটি ইস্যুতে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রেখেছে। এভাবে একটি দেশ দুটি বড় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে।
কারণ ভারত মহাসাগরে পণ্য পরিবহন ও চলাচলে সিঙ্গাপুর একটি সামুদ্রিক হাবে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে সিঙ্গাপুর সমুদ্রবন্দর। এ কারণে দেশটি তার গুরুত্ব দুই দেশের সামনে তুলে ধরে রাখতে পারায় কোনো সমস্যায় পড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনÑ দুটি দেশই সিঙ্গাপুরকে গুরুত্ব দেয়।
ভারত মহাসাগরে তথা বে অব বেঙ্গলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। কৌশলগত কারণে ভারত মহাসাগরের মাথা বলা হয় বাংলাদেশকে। এখান থেকেই ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভারতের সাতরাজ্যসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশের সহযোগিতা লাগবে।
এ অঞ্চলে যদি কিছু করতে হয়, তাহলে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেশি। এটি যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করার চেষ্টা করছে। ঠিক একইভাবে বর্তমান পাকিস্তানের অবস্থান হচ্ছে ভারত মহাসাগরের শেষাংশ তথা আরব সাগরের মাথায়। এ কারণেই পাকিস্তানের সঙ্গে হাজারো সমস্যা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।
ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হলে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র্। আফগানিস্তানে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের পর দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান বাড়াতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে। এ কারণে ভারতকে বলেছে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে আনতে। পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে তেলের মজুদ বাড়াতে সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প। এমনকি ভারতে জ্বালানি তেল রপ্তানি করবে পাকিস্তান এমন ঘোষণাও দিয়েছে ট্রাম্প।
এজন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়টি সামনে আনতে পারলে কূটনৈতিকভাবে সফল হওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। চীনের জ্বালানি ব্যবস্থার সাপ্লাই লাইনে মিয়ানমারকে লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। এজন্য এ অঞ্চলের যেকোনো প্রয়োজন বা স্বার্থের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। এ সুবিধাজনক অবস্থানকে বাণিজ্য, নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক অঙ্গনে কার্যকর দরকষাকষির উপাদানে পরিণত করতে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলকে জাতীয় স্বার্থে একাট্টা হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা যদি শুধু কৌশলগত বিষয়টি সামনে এনে বারগেইন করতে পারি, তাহলে বড় দেশগুলোর সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে পারবো। এজন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা, জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকতে হবে ঐক্যর ভিত্তিতে।
এ ঐক্য দেশকে কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় শক্তি জোগাবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বড় দেশগুলো তাদের মতো করে চাইবে, কিন্তু আমাদের দেখতে হবে, বুঝতে হবে তারপর তাদের সঙ্গে দেনদরবারও করে চলতে হবে। এশিয়ার যে দেশগুলো এভাবে চলছে, তারা কিন্তু ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।
উচ্ছ্বসিত পোশাক খাতের উদ্যোক্তরা
বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের ৮৩ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের। তার মধ্যে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যায় ১৭ শতাংশ। বড় এ বাজার ধরে রাখতে পাল্টা শুল্কারোপ ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনাকে কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।
তিনি বলেন, বড় স্বস্তির সংবাদ, আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের টেনশন কম হলো। এটা সরকারের কূটনৈতিক একটা বড় সফলতা, আমাদের সাপোর্ট ছিল। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো খবর।
তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমাদের অবস্থান এখনো ভালো। পাকিস্তানের শুল্কহার ১৯ শতাংশ করেছে, তারাও হোমটেক্সটাইল রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। তারপরও এক শতাংশের জন্য আমাদের হোমটেক্সটাইল বাজারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। একটি খাতের ওপর রপ্তানি বাজার নির্ভর করে চলতে পারে না। আমাদের প্রোডাক্ট বাড়াতে হবে।
সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, এখন আমাদের আসল কাজটি শুরু। আমাদের এখন ক্রেতাদের সঙ্গে নতুনভাবে দরকষাকষি করতে হবে এবং খরচ, সুযোগ ও সম্প্রসারণের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবেÑ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারে প্রবেশের উদ্দেশ্যে।
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম হাসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীন ব্যতীত অন্য দেশগুলোর জন্য প্রায় সমান হারে শুল্ক নির্ধারণ করা একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে এতে পণ্যের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিক্রি হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্যও শুল্কের হার প্রায় একই রকম বা তার চেয়ে বেশি হওয়ায় এ মুহূর্তে শক্তিশালী দরকষাকষিই একমাত্র উপায়।
যে কৌশল বাংলাদেশের
শুল্কারোপের সিদ্ধান্তটি বাণিজ্য দপ্তর নেয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে। এ কারণে কোনো লবিস্ট নিয়োগ করে লাভ হবে না। এটা জানতে পেরেই বাংলাদেশ সরকার কোনো লবিস্ট নিয়োগ করেনি। তথাকথিত অর্থনীতিবিদ ও কিছু ব্যবসায়ী তা না জেনেই সরকারের সমালোচনা করে। সর্বশেষ পোশাক খাতের সংগঠন সরকারকে বিপদে ফেলতে লবিস্ট নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মার্কিন লবিস্টরা সাফ জানিয়ে দেন, ট্রাম্প প্রশাসনে কোনো লবিস্টে কাজ হবে না।
এজন্য শুল্কারোপ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার উদ্যোগে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আদেশ দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা কেনার পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রের ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয় জাতীয় বাজেটে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগী দেশের অবস্থা কেমন
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে প্রথম অবস্থানে হচ্ছে চীনের। বাণিজ্য যুদ্ধ চলার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে দেশটিতে চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১০ শতাংশ হয়। এ সময়ে পোশাক রপ্তানি করেছে ৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনাম ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে একই সময়ে রপ্তানি বাড়িয়ে করেছে ৬ দশকি ২৯ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে তৃতীয় অবস্থান ধরে রাখা বাংলাদেশ চলতি বছরের জানুয়ারি-মে পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক পাঠিয়েছে ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ছিল ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
এরপরই থাকা ইন্দোনেশিয়া ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, ভারত ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, মেক্সিকো ২ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ১ বিলিয়ন ডলার, কম্বোডিয়া ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার ও পাকিস্তান ২১ দশমিক ৫৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এক বিলিয়নেরও কম ৯৫ কোটি ১৩ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। গত বছরে ভারত ৪ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ও ইন্দোনেশিয়া ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে।
চুক্তি প্রকাশ হবে
প্রতিবেশী ভারত পরিকল্পনা জানতে পারলে সমস্যায় পড়তে পারে বাংলাদেশ- এমন শঙ্কায় চুক্তি প্রকাশ করেনি সরকার। এখন সেই চুক্তি প্রকাশ করতে পারে বাংলাদেশ। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, চুক্তি প্রকাশ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে তা প্রকাশ করা হবে। চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর শিগগিরই হয়তো যৌথ বিবৃতি আসবে।
চুক্তির গোপনীয়তা প্রসঙ্গ টেনে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিক রীতিতেও নির্দিষ্ট। শুধু তাই নয়, এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক ও বিমা চুক্তিতে উপনীত হয়, তখন এ গোপনীয়তার বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক। এমনকি দুজন ব্যক্তি সম্পদ হস্তান্তর করলেও এ ধরনের বিষয় থাকে- তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বলে যে, আপনি কাউকে বলবেন না। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, কারণ হতে পারে, আপনার প্রতিবেশী জেনে যেতে পারে, সমস্যা তৈরি করতে পারে বা অন্য কেউ এখানে এসে দাবি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যদি তার ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তাহলে সব দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এজন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক ধরনের ঐক্য থাকতে হবে। সাধারণ মানুষের কল্যাণে সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও ধরে রাখার একটি সুযোগ দিয়েছে জুলাই বিপ্লব।