জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা

একটি নতুন বাংলাদেশ


৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৪৪

॥ জামশেদ মেহদী॥
আজ ২০২৫ সালের ১ আগস্ট। আর ৪ দিন পর ৫ আগস্ট। ঐ দিন থেকে ঠিক এক বছর আগে সম্পন্ন হয়েছিলো ইতিহাসের এক অনন্য বিপ্লব, যার নাম বাংলাদেশের মানুষ দিয়েছেন ‘জুলাই বিপ্লব’। কেউ কেউ এটাকে জুলাই-আগস্ট বিপ্লব বলেন আবার কেউ কেউ আগস্ট বিপ্লব বলেন। তবে জুলাই বিপ্লব নামটিই সাধারণ্যে পরিচিতি পেয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলো আমাদের অনেকে চাক্ষুষ দেখেছেন, যারা রাজপথে ছিলেন। অন্যরা টেলিভিশনে দেখেছেন। তবে যারা টেলিভিশনে দেখেছেন, তারা বিপ্লবের পূর্ণ চিত্র তো দূরের কথা, খণ্ডচিত্রও সম্পূর্ণ দেখতে পারেননি অথবা শুনতেও পারেননি। কারণ বিপ্লব চলাকালে শেখ হাসিনার ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন শুধুমাত্র কতগুলো সরকারি স্ট্র্যাকচারের ধ্বংস বা অগ্নিসংযোগই প্রচার করেছে। কিন্তু সেইসাথে যে শত শত এবং পরে হাজারের ওপর মানুষ শহীদ হলেন, রক্ত দিলেন- এ সম্পর্কে সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ঠোঁট সেলাই করে রেখেছিলো। আর বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো কেউ সরকারের পায়রবি করেছে, আর কেউ ভয়ে তটস্থ হয়ে অর্ধ সত্য প্রকাশ করেছে। চলতি বছর ১ জুলাই থেকে সবগুলো গণমাধ্যমে প্রতিদিন গত বছরের জুলাই-আগস্টের দিনলিপি প্রকাশ করছে। কিন্তু সেগুলোয়ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। জুলাই বিপ্লব সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেসব লেখা বেরিয়েছে এবং যে দু-একটি বই বেরিয়েছে, সেগুলো যতদূর সম্ভব আমি পড়ার চেষ্টা করেছি। এসব পড়ার পর আমি নিজেই নিজের কাছে স্তম্ভিত হয়েছি। অবাক বিস্ময়ে ভেবেছি, কোনো বড় নেতাবিহীন, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও গাইডেন্স ছাড়া এবং কোনো বিদেশি শক্তির মদদ ছাড়া কীভাবে শেখ হাসিনার সরকারের মতো একটি মহাশক্তিশালী ও জুলুমবাজ সরকারের শুধু পতন নয়, তাদের দেশ থেকেই বিতাড়িত করা সম্ভব হয়েছে। যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের পেছনে ছিল না কোনো বিদেশি সমর্থন। কিন্তু যে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারকে তারা তাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই স্বৈরাচারের পেছনে প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিলো এমন একটি দেশের, যে দেশটি বাংলাদেশের ৩ দিক ঘিরে রেখেছে। যে দেশটি পৃথিবীর ৪র্থ বৃহত্তম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র।
নেপথ্যের শক্তি : ছাত্রশিবির
দৈনিক ইত্তেফাক ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ‘নেপথ্যের শক্তি : ছাত্রশিবির’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু থেকেই ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা দল-মত ভেদাভেদ ভুলে অংশ নিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলনেই একটি সফল গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সমন্বয়করা ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্র সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করেন। তবে প্রথম সারির ছয় সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর আন্দোলন যখন বেহাত হয়ে যাচ্ছিল, তখন নেপথের শক্তি হিসেবে আন্দোলনে রসদ জোগায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির। বিশেষ করে ডিবি কার্যালয়ে ছয় সমন্বয়ককে জোর করে যখন আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন ৯ দফা প্রণয়ন করে বাইরে থাকা সমন্বয়কদের দিয়ে ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে ছাত্রশিবির। এ সমন্বয়কদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকারও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম।
৮ আগস্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েমসহ সংগঠনটির সাবেক নেতারা। তাদের সঙ্গে ছিলেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদ তাদের সাবেক কয়েকজন দায়িত্বশীলদের নিয়ে এ ৯ দফা প্রস্তুত করেন। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় সাদিক কায়েম ও ফরহাদরাই ৯ দফা সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেন। এ ৯ দফাই পরবর্তীতে সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয়। ৯ দফা যে শিবিরই প্রণয়ন করেছিল, তা সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্পষ্ট করেছেন।
এছাড়া ‘মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে অনলাইনে প্রচার’, ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’, গায়েবানা জানাযা, ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ইত্যাদি অভিনব কর্মসূচি প্রণয়নে শিবির ভূমিকা রাখেন বলে সাদিক কায়েম দাবি করেন। যদিও এ বিষয়ে সমন্বয়করা কোনো প্রত্যুত্তর দেননি।’ বিশ্লেষকরা মনে করেন, সমন্বয়কদের নীরবতাই প্রমাণ করে সাদিক কায়েমের দাবি যথার্থ।
বিগত এক বছর ধরে আমি জুলাই বিপ্লবের ওপর শুধু পড়াশোনাই করিনি, বরং যারা বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের বেশ কয়েকজনের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি জুলাই বিপ্লবের দিনলিপি। সেটিই প্রথমে অতি সংক্ষেপে নিচে বর্ণনা করছি।
অনেকে মনে করেন যে, জুলাই বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ১৪ জুলাই, যেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রদের রাজাকারের বাচ্চা বলেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন যে, জুলাই বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ১৬ জুলাই থেকে, যেদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ একা একা দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। আবু সাঈদের মহিমান্বিত শাহাদাতের পর গগনবিদারী আওয়াজ উঠেছিলো, ‘বুকের ভেতর উঠছে ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। আসলে ১৪ বা ১৬ জুলাই নয়। জুলাই বিপ্লবের অঙ্কুরোদগম ঘটেছিলো ২০২৪ সালের ৫ জুন, যেদিন হাইকোর্টের একটি রায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিকে পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে ২০১৮ সালে অর্জিত সাফল্য মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
এ রায়ের পর দু-চারজন তরুণ ছাত্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। তারা ভাবেন, শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্র সবকিছুকেই গ্রাস করেছে। বিএনপি ২০১০ সাল থেকেই সরকারের বিরোধিতা করেছে, কিন্তু আন্দোলন করেনি। ঈদের পরে আন্দোলন হবে- বিএনপি নেতাদের এমন উক্তি একটি ট্রলে পরিণত হয়েছিল। তখন সর্বপ্রথম আব্দুল হান্নান মাসউদ, রিফাত রশিদ, নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাবিব আল ইসলাম নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন- এখন কী করা যায়? তারা সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন যে, আগামীকাল থেকে কর্মসূচি দিতে হবে। তদনুযায়ী পরদিন ৬ জুন কর্মসূচি দেওয়া হয়। ঐদিন সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ এ কর্মসূচিতে শামিল হন। তারা আন্দোলনের আহ্বান ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনেকগুলো গ্রুপ খোলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এ আন্দোলনে যুক্ত করার জন্য ফেসবুক একাউন্ট খোলা হয়, যার দায়িত্বে ছিলেন ইবরাহিম নীরব। এরা অনলাইন মিটিংও করেন, যেখানে যুক্ত হন আব্দুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, হাসিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি সাদিক কায়েম, সেক্রেটারি ফরহাদ প্রমুখ। নেপথ্যে থেকে ভূমিকা পালন করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সাবেক শিবির সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দের সাথে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এভাবে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া তরুণদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু হয়, যখন ৪ দফা দাবি দেওয়া হয়। তখন ঐসব তরুণ নেতা অনুভব করেন যে, আন্দোলনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
৩ জুলাই শাহবাগ অবরোধ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এ সময় মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। আন্দোলনকারীদের এক-তৃতীয়াংশই তখন ছিলেন ছাত্রীরা। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে যুক্ত হয় এবং তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। আন্দোলনের নীতিনির্ধারণের জন্য ২৫ জনের একটি গ্রুপ গঠিত হয়। এ গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হন মাহফুজ আলম।
৭ জুলাই শুরু হয় বাংলা ব্লকেড। বাংলা ব্লকেড শুরু হওয়ার পরই তৎপর হয়ে ওঠে ডিজিএফআই। তারা নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অফিসে ডেকে নেয়। ডিজিএফআই থেকে ছাত্রদের ওপর নজরদারির দায়িত্ব পড়ে কর্নেল তারেক নামে এক অফিসারের ওপর। ৮ জুলাই কর্নেল তারেক আন্দোলনের পরিচিত ৪টি মুখ ছাড়াও আল সাদি ভূঁইয়াকেও ডেকে নেন।
প্রিয় পাঠক, আগেই বলেছি, আন্দোলন শুরু হয় ৫ জুন আর শেষ হয় ৫ আগস্ট। এ ৬০ দিনের প্রতিদিনকার দিনলিপি বর্ণনা করতে গেলে এ ধরনের ১০-১২টি ভাষ্যের প্রয়োজন হবে। তাই আমি যতদূর সম্ভব সংক্ষেপ করছি। ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পদযাত্রা করে এবং তাদের মধ্যে নির্বাচিত কয়েকজন প্রেসিডেন্টকে স্মারকলিপি প্রদান করে। এর মধ্যেই আন্দোলনে যুক্ত হন আখতার হোসেন। নাহিদ ইসলামরা করতেন গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি নামক একটি ছাত্র সংগঠন। পক্ষান্তরে আসিফ মাহমুদ করতেন ছাত্র অধিকার পরিষদ। জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গঠন করার পর সকলেই নিজ নিজ ছাত্র সংগঠনের নাম একপাশে সরিয়ে রাখেন।
১৪ জুলাই আন্দোলনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। ঐদিন এক সংবাদ সম্মেলনে বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সম্পর্কে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা পাবে না তো কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ শেখ হাসিনার এ উক্তির বিরুদ্ধে ছাত্র অসন্তোষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সেই দিন প্রায় সব হল প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এক নতুন স্লোগানে। সেটি হলো, ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ এ স্লোগানের প্রতিধ্বনি শোনা যায় ছাত্রী হলেও। এ স্লোগান শুনে পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন করেন সেই উদ্ধৃত উক্তি, ‘ওদেরকে শায়েস্তা করার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’
ঐদিন অর্থাৎ ১৫ জুলাই পুলিশ এবং ছাত্রলীগের হেলমেটধারীরা সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় ছাত্রদের ওপর। তারা ছাত্রীদেরও তাদের হামলা থেকে বাদ দেয়নি। তাদের হামলায় ২০০ জনেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী আহত হন। ছাত্রলীগকে মোকাবিলা করার জন্য নাহিদ সারজিসরা ছাত্রশিবিরের সাদিক কায়েমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ২০-২৫ জন সাহসী ছাত্র পাঠিয়ে দেন, যারা আসে স্ট্যাম্প নিয়ে।
১৫ জুলাইয়েই ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার পরদিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই অকস্মাৎ জেগে ওঠেন সব ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে শহীদ হন রংপুরে আবু সাঈদ। আন্দোলনকারীরা ১৬ জুলাই শহীদ মিনারে সমাবেশের ডাক দেন। পক্ষান্তরে ছাত্রলীগ টিএসসিতে জমায়েত হয়। ছাত্রলীগে ছিলো চকবাজারের মাস্তান সাবেক এমপি হাজী সেলিমের অসংখ্য সশস্ত্র ক্যাডার। তাদের সকলের মাথায় ছিলো হেলমেট।
সন্ধ্যার পর শহীদ মিনার থেকে প্রায় ১০ হাজার ছাত্রের একটি মিছিল বিভিন্ন হল অভিমুখে রওনা হয়। প্রত্যেকের হাতে ছিল লাঠি এবং স্ট্যাম্প। আন্দোলনকারী ছাত্রদের রণরঙ্গীমূর্তি দেখে প্রত্যেকটি হল থেকে ছাত্রলীগ পালিয়ে যায়। এমনকি মেয়েদের হলগুলো থেকেও ছাত্রলীগের মহিলা পাণ্ডারা পালিয়ে যায়। পরদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদরাসার ছাত্ররা এ আন্দোলনে শামিল হন এবং আন্দোলনের গতি বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। এমন একটি পরিস্থিতিতে ডিজিএফআই থেকে উদিত হন কর্নেল সরোয়ার। তিনি বলেন, ডিজিএফআই প্রধান ছাত্রনেতাদের সাথে বসতে চান। ছাত্রনেতারা কৌশলে এ বৈঠক এড়িয়ে যান। ১৯ জুলাই পালিত হয় কমপ্লিট শাটডাউন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রতিদিনের কর্মসূচিতেই কিছু না কিছু ছাত্র এবং জনতা শহীদ হচ্ছেন। ডিজিএফআই পুনরায় আলোচনার জন্য ডাকলে ছাত্ররা জবাব দেন, ‘গর্দানের সাথে তরবারির কোনো সংলাপ হয় না।’
২০ জুলাই ছাত্রনেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হন এবং তাদের নেওয়া হয় ‘আয়নাঘরে’। সেখানে আন্দোলন প্রত্যাহার করার জন্য তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের পর তাদের ইনজেকশন দেওয়া হয়। প্রতিদিন নির্যাতনের পর ইনজেকশন- এভাবে দিনে তিনবার ইনজেকশন দেওয়া হয়। পরে পুলিশ হসপিটাল থেকে জানা যায় যে, ওগুলো ছিলো প্যাথেডিন ইনজেকশন।
এর মধ্যে সেনাবাহিনী নামানো হয়। অর্থাৎ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং সোয়াট আগেই নামানো হয়েছিলো। এখন এসে যুক্ত হলো সেনাবাহিনী। জারি করা হয় সান্ধ্য আইন বা কারফিউ। এর আগে আয়নাঘর থেকে আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দকে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে আনা হয়। ২৪ জুলাই আসিফ মাহমুদকেও সেখানে আনা হয়। এর মধ্যে একজন আন্দোলনকারীর সাথে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের দেখা হয়। মির্জা ফখরুলকে জানানো হয় যে, আন্দোলন এক দফা অর্থাৎ শেখ হাসিনার পতনের দিকে যাচ্ছে। শুনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সরকার পতনের ব্যাপারে বিএনপির কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’
২৭ জুলাই সারজিস, হাসনাত, নাহিদ, আসিফ ও বাকেরকে গ্রেফতার করে ডিবি অফিসে আনা হয়। পরদিন আনা হয় নুসরাত তাবাসসুমকে। হান্নান, রিফাত ও কাদেরকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় ডিবি। কিন্তু গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশের নির্যাতনে নাহিদের সুগার লেভেল নেমে যায় ৩.৫০ এবং আসিফের ৪.১০-এ। অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে ডিবি তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। নাহিদদের অনুপস্থিতিতে ২ আগস্ট থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কাদের, মাসউদ আর রিফাত।
২ আগস্ট থেকে আন্দোলন ফাইনাল স্টেজে যায়। ঢাকাসহ সারা দেশে লাখোকাটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যান।
এই ছিল আন্দোলনের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত দিনলিপি। ১৪শত ছাত্র-জনতা শহীদ এবং ২৬ হাজার ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার বিনিময়ে বিতাড়িত হলেন শেখ হাসিনা এবং তার ঈৎড়হু ঈধঢ়রঃধষ (আত্মীয় পুঁজিতন্ত্র) এবং কষবঢ়ঃড়পৎধপু (চোরতন্ত্র)। কিন্তু জনগণ কী পেলেন?
৫ আগস্ট বেলা ১১টা থেকেই শেখ হাসিনার সরকার ভ্যানিশড হয়ে যায়। একটি সামরিক বিমানে চড়ে তিনি ভারত পালিয়ে যান। যেখানে কোনো সরকার ছিলো না, সেখানে শেখ হাসিনাকে ভারত যাওয়ার অনুমতি দিলো কে? আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন ছাত্ররা। যোগদান করলেন কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। কিন্তু হাসিনা ভারতের উদ্দেশে সামরিক বিমানে চড়ার আগেই বিএনপিসহ রাজননৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্যান্টনমেন্টে জড়ো হলেন কেন? সেদিনই কি আন্দোলন জনতার হাত থেকে ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত হলো না? দেশে কোনো সরকার নেই। কিন্তু সংবিধানের ১০৬ ধারা মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টে ইউনূস সরকারের (তখনো ড. ইউনূস দেশে আসেননি) বৈধতা চেয়ে কে রেফারেন্স পাঠালেন? কার পরামর্শে কে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিলেন? বর্তমানে বহাল সংবিধানের অধীনে এ সংবিধান রক্ষার ওয়াদা নিয়ে ড. ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদ শপথ নিলেন কেন? ছাত্ররা তো চেয়েছিলেন ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার। বিএনপি সেই সরকারে যোগদানের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলো কেন? আন্দোলন করলেন ছাত্ররা আর ৫ আগস্ট ক্যান্টনমেন্টে ছাত্রদের দেখা গেল না কেন? ৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর বঙ্গভবনেও ছাত্রদের দেখা যায়নি কেন? ড. ইউনূস ছাড়া আর যাদের উপদেষ্টা বানানো হলো, তাদের কারো নিয়োগের বেলায় ছাত্রদের সাথে আলোচনা করা হয়নি কেন?
এই বিপ্লবে জনগণের আকাক্সক্ষা বা অভিপ্রায় কী ছিল? শুধু কি হাসিনাকে তাড়িয়ে একটি ইলেকশন করে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ১৪শত মানুষ জীবন দিলেন এবং ২৬ হাজার মানুষ আহত হলেন? আজও আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট গদিতে কেন? একটি বিপ্লবের পর; এমনকি বিপ্লব না বলে গণঅভ্যুত্থানের পর পুরনো সংবিধান বাতিল করা হয়। ৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিলো পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বানানোর জন্য। কিন্তু তারা স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র বানালেন। এর কোনো সাংবিধানিক বৈধতা নেই। অনুরূপভাবে এবারের বিপ্লবের পর একটি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করে জনগণের অভিপ্রায় ধারণকারী একটি সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদের নির্বাচন করা প্রয়োজন ছিলো। আজ সেখানে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনে পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
৫ আগস্ট জনগণের বিপ্লবের পর সকলের অগোচরে ৬ আগস্ট একটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটে গেছে।