অবাক দেশ, বিস্মিত বিশ্ব
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:০৪
॥ জামশেদ মেহদী॥
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গত ১৯ জুলাই শনিবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে জাতীয় সমাবেশ করেছে, সেটি আমার মতো বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। সমাবেশের বিশালতা এবং সেই সুবিশাল সমাবেশ শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত নেতাকর্মীদের কঠোর শৃঙ্খলা মানুষকে বিস্মিত করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের এ সমাবেশের বিশালতা মানুষকে হতবাক করেছে এজন্যই যে, এর আগে বাংলাদেশের ৫৪ বছরে এবং তার আগে পাকিস্তান জামানায় এরকম বিশাল সমাবেশ অতীতে আর অনুষ্ঠিত হয়নি। আর জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে এ ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠানের প্রশ্নই ওঠে না। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী রাজনীতি শেখ মুজিবের আমলে নিষিদ্ধ হয়। তখনো কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়নি। এরপর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয় এবং সেটি কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
এ সংবিধানে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ সব ইসলামী রাজনৈতিক দল এবং ইসলামী রাজনীতিই নিষিদ্ধ হয়। অথচ সেই সংবিধানে নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট পার্টিকে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়। নিষিদ্ধ ঘোষণার ফলে জামায়াতের পক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কেন, বাংলাদেশের কোথাও কোনো জনসভা বা রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কোনো সুযোগ থাকেনি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে জামায়াতসহ ইসলামী রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ইতোপূর্বে দেশব্যাপী জামায়াতের হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। শহীদ জিয়ার আমলে জামায়াত ঘর গুছানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। তারপরও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পায়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণ করেন ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি। তারপর শেখ হাসিনার লাগাতার সাড়ে ১৫ বছরের রাজনীতি সকলেই দেখেছেন। জামায়াতের সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠান করা তো দূরের কথা, জামায়াতকে কোনো মানববন্ধনও করতে দেওয়া হয়নি। জামায়াতের নেতাকর্মীদের রাস্তাতেও দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। কারো বাসাবাড়িতে কয়েকজন মহিলা কুরআন শরীফের তাফসির বৈঠক করতে গেলে সেখান থেকেও পর্দানশীন মহিলাদের গ্রেফতার করা হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে জামায়াতকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার অর্থাৎ জামায়াতের শীর্ষনেতৃবৃন্দকে হত্যার উন্মাদনায় মত্ত হয়ে ওঠেন। সাবেক দুইজন মন্ত্রী জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান প্রমুখকে বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। তাদের সাথে আরো ঝোলানো হয় ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র বিএনপির শীর্ষনেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও। বাংলাদেশে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা নবতিপর বৃদ্ধ সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অতঃপর সারা দেশে তুমুল প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দমনে শেখ হাসিনা নির্বিচার গুলি চালালে ২৫৭ ইসলামী নেতাকর্মী শাহাদাতবরণ করেন। প্রবল জনরোষের মুখে মাওলানা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়। কারারুদ্ধ অবস্থায় মাওলানা সাঈদীর হার্ট অ্যাটাক হলে সময়মতো চিকিৎসা না দিয়ে গড়িমসি করা হয়। এভাবে চিকিৎসা না দিয়ে গড়িমসি করার ফলে বলতে গেলে বিনা চিকিৎসাতেই আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মৃত্যুবরণ করেন। জামায়াতের অপর শীর্ষনেতা মাওলানা আবদুস সুবহানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগেই চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এছাড়া বিচার চলাকালে কারাগারে শাহাদাতবরণ করেন শায়খুল হাদীস মাওলানা একেএম ইউসুফ।
জামায়াতের অপর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি এ দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। অতঃপর তিনি রিভিউ পিটিশন করেন। রিভিউ পিটিশনের শুনানির পূর্বেই দেশে শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান। এ গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর অতি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশনের শুনানি হয়। এ শুনানি শেষে এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। খালাসের রায়ে আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ সর্বসম্মত এ রায়ে আজহারুল ইসলামের প্রতি অবিচার করায় দুঃখ প্রকাশ করেন। আদালত স্বীকার করেন যে, এটিএম আজহারুল ইসলামের বিচার প্রহসনমূলক ছিল।
যেসব কারণে এটিএম আজহারুল ইসলামের বিচারকে অন্যায় এবং বেইনসাফি বলেছেন সুপ্রিম কোর্টÑ সেই অবিচার এবং বেইনসাফি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ অবশিষ্ট অন্য ৮ নেতার ক্ষেত্রেও করা হয়েছিল। একটি দলের শীর্ষ ৮ নেতাকে (অধ্যাপক গোলাম আযমসহ) শারীরিকভাবে এলিমিনেট বা নির্মূল করার পর সেই দলের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু গত ১৯ জুলাই শনিবার জামায়াতের ঐতিহাসিক সমাবেশ প্রমাণ করেছে যে, জামায়াত অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলেছে।
জামায়াতে ইসলামীর মতোই সম আদর্শে বিশ্বাসী মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠার ৮৪ বছর পর ক্ষমতায় যায়। প্রধানমন্ত্রী হন জনাব মুরসি। এ ৮৪ বছরে সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও অন্তত ৯ শীর্ষনেতাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যার খবর পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে জামায়াতের ওপর শেখ মুজিব এবং শেখ হাসিনার নজিরবিহীন জুলুমের স্টিমরোলার চালানোর মধ্যেও জামায়াত ও শিবিরের কর্মীরা নীরবে আদর্শ ও সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটাতে থাকেন। ২০১৮ সালের রাতের ভোটের ১ দিন পর জামায়াতের একজন শীর্ষনেতা এ ভাষ্যকারের বাসায় আসেন এবং বলেন যে, শেখ হাসিনার আমলে তারা দাওয়াতি কার্যক্রমে নিযুক্ত থাকবেন। এ দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে জামায়াত এবং শিবির যে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, সে খবর অন্য কেউ না রাখলেও ১৯ জুলাইয়ের সমাবেশ সেটি প্রকাশ করে দিয়েছে।
এ ভাষ্যকার বিগত ১৯ জুলাইয়ের পর তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিক বন্ধুরা এবং অনেক পরিচিতজনদের সাথে আলোচনা করেছেন। তারা বলেছেন যে, পাকিস্তান আমলের কথা তারা বলতে পারবেন না। কারণ তখন অনেকের জন্ম হয়নি। আর যাদের জন্ম হয়েছে, তারা কিশোর ছিলেন। তাই ঐসব মনে করতে পারছেন না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত তারা গভীরভাবে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পর্যবেক্ষণের পর তারা দেখেছেন যে, বাংলাদেশ আমলের এ ৫৪ বছরের এত বড় সমাবেশ তারা আর দেখেননি। আরো অবাক করা বিষয় হলো এই যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটাই জামায়াতের প্রথম সমাবেশ এবং বাংলাদেশের স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশ।
সংগঠনটি কতখানি মজবুত এবং সুশৃঙ্খল যে এত বিশাল সমাবেশে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, তার জন্য ৬ হাজার জামায়াতকর্মী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। এমনকি যখন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বক্তৃতাকালে ২ বার মঞ্চে লুটিয়ে পড়েন, তখন লাখো জনতার মধ্যে কান্নার রোল সৃষ্টি হলেও এ জনতা হই-হুল্লোড় করে মঞ্চে তাদের আমীরকে দেখতে যাননি। কারণ এভাবে হুটোপুটি করে আমীরকে দেখতে গেলে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো, তার ফলে জনসভা পণ্ড হয়ে যেত।
সমাবেশ শেষে এর ইতিবাচক প্রভাব কী, এটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে এবং সোশ্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে। অনেকে বলছেন যে, দলটির সততা এবং সত্যনিষ্ঠতার প্রমাণ তো আগেই পাওয়া গেছে। কিন্তু আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান যে একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা, সেটি বিগত ১১ মাসে তার কার্যকলাপে পরিস্ফুটিত হয়েছে। যে জামায়াতকে শেখ হাসিনার নির্দেশে সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে পুলিশের সাধারণ কনস্টেবল পর্যন্ত রাস্তায় বের হতে দিতো না, সেই আমীরের অসুস্থতায় তাকে তৎক্ষণাৎ ইবনে সিনা হাসপাতালে দেখতে গেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই রাতেই টেলিফোনে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। এ বিষয়টি ১১ মাস আগে কল্পনাও করা যেত না।
যে জামায়াতের রাজনৈতিক তৎপরতার খবরাখবর বিদেশ তো দূরের কথা, দেশের অভ্যন্তরেই ব্ল্যাকআউট করা হতো, সেই জামায়াতের এ সমাবেশের খবর ফলাও করে ছাপা হয়েছে যেসব বিদেশি মিডিয়ায়, তাদের মধ্যে রয়েছে- অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আবুধাবির ভিডিও নিউজ এজেন্সি ভাইরি, কওব ৪ নিউজ, দ্য ইন্ডিয়া টুডে, ওয়াশিংটন পোস্ট, আল-জাজিরা, এএফপি, দ্য হিন্দু, ফ্রান্স ২৪ ডট কম, ইয়াহু নিউজ, ফক্স নিউজ, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ইকোনমিক টাইমস, আরব নিউজ, টিআরটি নিউজ, দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, পাকিস্তানের ডনসহ আরও অনেক সংবাদমাধ্যম।
জুলাই বিপ্লবের আগে যেসব দৈনিক পত্রিকা আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার অন্ধ অনুসারী ছিল সেসব পত্রিকাও এখন জামায়াতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এ ধরনের একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার উপসম্পাদকীয় নিবন্ধের অংশবিশেষ নিচে উদ্ধৃত করছি।
“বিগত শাসনামলে কঠিনভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরও দলটি যে দুর্বল হয়নি- এই সমাবেশ তারও প্রমাণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও জামায়াত-শিবিরের ভূমিকা ছিল। ক্ষমতাচ্যুতদেরও মানতে হবে, নজিরবিহীন দমন-পীড়নেও জামায়াত কিংবা বিএনপিকে দুর্বল করা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে রাখা ভূমিকা ঘিরে এর শীর্ষনেতাদের বিচারে একের পর এক মৃত্যুদণ্ডেও দলটি কিন্তু নিঃশেষ হয়নি। জামায়াতের সুবিশাল সমাবেশ দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মন খারাপের কারণ হবে। কিন্তু দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যে এ দেশের একাংশ, সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। সেনাশাসন অবসানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার ভোট হয়তো আরও বাড়বে।”
সচেতন জনগোষ্ঠী তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন- আসন্ন ইলেকশনে জামায়াত কেমন করবে? এ সম্পর্কে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে খেটে খাওয়া মানুষদের অনেককে বলতে শোনা গেছে, অতীতে তো আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে ভোট দিয়েছি। আমাদের তো অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। এবার বরং দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে দেখা যেতে পারে, আমাদের অবস্থার ন্যূনতম পরিবর্তনও ঘটে কিনা।