বাংলাদেশে সর্বাত্মক অশান্তি সৃষ্টির অশুভ তৎপরতা
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৫৩
॥ জামশেদ মেহদী॥
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কেন? এই কেনর উত্তর জানলে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ভারতের গেমপ্ল্যান সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে। পাঠকদের হয়তো স্মরণ আছে যে, যখন হাসিনাকে ভারতে স্থান দেওয়া হয়, তখন খোদ ভারতীয় পার্লামেন্টে (লোকসভা) কংগ্রেসসহ অন্যান্য দল প্রশ্ন তুলেছিলো, যে নেতা তার দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন, তাকে কেন মোদি সরকার ভারতে আশ্রয় দিলে? এই আশ্রয় দেওয়া কি ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে না? সেই উত্তাল দিনগুলোয়, অর্থাৎ গত বছরের ৫ আগস্ট এবং তার পরের ১০-১৫ দিন হাসিনার ভারতে আশ্রয় নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ তোলপাড় হয়েছিলো। তখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল যে, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারত পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশকে অনুরোধ জানিয়েছিল। এসব দেশের মধ্যে এ মুহূর্তে মনে পড়ছে যেসব নাম, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার প্রভৃতি। সবগুলো নাম এখন মনে পড়ছে না। তবে পৃথিবীর কোনো দেশই হাসিনাকে গ্রহণ করা বা আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি।
এসব কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তরফ থেকে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলকে জানিয়েছিলেন। সেই সময় বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে ভারতের নিকট থেকে জানতে চেয়েছিলো যে, শেখ হাসিনাকে ভারত যে আশ্রয় দিলো, সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনার স্ট্যাটাস বা অবস্থান কী হবে? নরেন্দ্র মোদির তরফ থেকে জয়শঙ্কর বলেছিলেন যে, তাকে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে সাময়িকভাবে, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। নরেন্দ্র মোদি আগ বাড়িয়ে বলেন যে, শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের জন্য অনেক কিছু করেছেন। এখন তার এই বিপদের দিনে মানবিক কারণে তাকে আমাদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া উচিত। আমরাও ঐ মানবিক কারণেই তাকে আশ্রয় দিয়েছি। আমরা (ভারত) চেষ্টা করছি, অন্যান্য দেশের সাথে কথা বলতে। অন্য কোনো দেশ যদি তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়, তাহলে আমরা তাকে সেখানে পাঠিয়ে দেবো।
শুক্রবার ৫ সেপ্টেম্বর। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের ১ বছর ১ মাস অতিক্রান্ত হলো। এটিই কি নরেন্দ্র মোদি, জয়শঙ্কর বা অজিত দোভালের সেই ‘সাময়িক আশ্রয়’? এটিই কি জয়শঙ্করের সেই ‘সংক্ষিপ্ত সময়’? শেখ হাসিনাকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা যাতে ভারতে গেড়ে বসতে পারেন, তার জন্য ভারত সরকার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হাসিনাকে যে ভারতে স্থায়ীভাবে রাখা হবে এবং সেই রাখার পেছনে যে ভারতের একটি সুদূরপ্রসারী এবং অনেক বড় গেমপ্ল্যান রয়েছে, সেটা অন্যরা না বুঝলেও চাণক্যের দেশ ভারত সম্পর্কে যাদের ঞযড়ৎড়ঁময কহড়ষিবফমব রয়েছে, তারা ঠিকই বুঝেছিলেন। রাজনীতি এবং ক্ষমতার অলিন্দে যাদের বিচরণ, তারা যখন সমগ্র বিষয়টি ফ্ল্যাশব্যাকে দেখেন, তখন অনেক কিছুই বুঝতে পারেন। এখন ধীরে ধীরে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্যই প্রকাশ পাচ্ছে, যা অনেক দিন ধরে অনেকের কাছে অজানা ছিলো। আসুন, আমরাও একটু ফ্ল্যাশব্যাকে ঘটনাবলি দেখি-
ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্রনাথ ত্রিবেদি একাধিকবার বলেছেন যে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে তার নিয়মিত কথা হয়। আমরা অবশ্য এই নিয়মিত কথাবার্তার মধ্যে উদ্দেশ্যমূলক কোনো কিছু খুঁজি না। ভারত আমাদের অভিন্ন বৃহৎ প্রতিবেশী। দুই দেশের সেনাপ্রধানের মাঝে স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় নিয়ে নিয়মিত কথা হতেই পারে। কিন্তু এখন যা জানা যাচ্ছে, তাতে দেখা যায় যে, স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও তারা রাজনৈতিক অনেক বিষয়ও আলাপ করেছেন।
ইউটিউবে দেখা যায় যে, জেনারেল ত্রিবেদি পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি মোতাবেক গত বছরের ৫ আগস্ট ঠিক সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ফোন করেন। ঐ ফোনে জেনারেল ত্রিবেদি নাকি জেনারেল ওয়াকারকে বলেন, শেখ হাসিনা যেন নিরাপদে ভারত পৌঁছাতে পারেন। তার যেন কোনো শারীরিক ক্ষতি না হয়।
ভারত একটি বিশাল দেশ। তার রয়েছে হাজার হাজার গণমাধ্যম। এগুলোর অনেকগুলো এক্সক্লুসিভ বা একান্ত রিপোর্ট করে, যার মাধ্যমে অনেক অজানা খবর পাওয়া যায়। তেমনি খবর থেকে জানা যায় যে, শেখ হাসিনা যে ভারতে আসছেন, সেটি ভারত সরকার ৫ আগস্ট সকাল থেকেই জানতো এবং তার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ৫ আগস্ট সকাল ১০টার পর একটি কক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত খবর নিচ্ছিলেন। এদিকে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশে; বিশেষ করে ঢাকায় যা কিছু ঘটছে, তার ভিডিওচিত্র প্রতি মুহূর্তে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাচ্ছিলেন। এসব ভিডিওবার্তা থেকে ভারত সরকার বুঝতে পারে যে, শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবতরণ না করা পর্যন্ত তিনি নিরাপদ নন।
তাই ঢাকা থেকে নির্ধারিত রুটে না গিয়ে অনেক ঘুরপথে ঢাকার মিলিটারি বিমান ভারতে প্রবেশ করে। ভারত সীমান্তে প্রবেশ করার পরপরই আগে থেকে প্রস্তুত ফ্রান্সে তৈরি ২টি রাফাল জঙ্গিবিমান শেখ হাসিনার মিলিটারি প্লেনকে এসকর্ট করে। যখন হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি দিল্লির অদূরে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে, তখন ঐ ২টি রাফাল জঙ্গিবিমানের মিশন শেষ হয়। বিমান থেকে বেরিয়ে এলে শেখ হাসিনাকে রিসিভ করেন স্বয়ং অজিত দোভাল। শেখ হাসিনার সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর তাকে তার সেফ হাউসে রেখে অজিত দোভাল তার নিরাপদ অবতরণের খবরটি নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং জয়শঙ্করকে জানান।
ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ার পর বাংলাদেশের সরকার এবং জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন যে, শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে, ভালো কথা, কিন্তু তিনি যেন সেখানে মুখ বন্ধ করে রাখেন। তিনি যেন এসব বিষয় নিয়ে কথা না বলেন।
কিন্তু শেখ হাসিনা কি কথা না বলার মতো বান্দা? খুব বেশিদিন গেলো না, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে অডিওবার্তা ছড়ানো শুরু করেন। তিনি দিল্লির নিরাপদ আশ্রয়ে বসে দেশে এবং বিদেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো শুরু করেন। তিনি তাদের বলেন, তারা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়, যাতে করে সময়মতো আঘাত করা যেতে পারে। তিনি বাংলাদেশের বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানকে আন্দোলন, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব না বলে এটিকে সন্ত্রাসী তৎপরতা বলে অপবাদ দিতে থাকেন।
ওবায়দুল কাদের তো বলেই ফেলেছেন, বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী বিপ্লবটি ছিলো আল কায়েদা এবং লস্করই তৈয়্যেবার অপারেশন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেলো, ভারতের মাটিতে বসেই প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাত, আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ ভারত থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং বাংলাদেশে তাদের সমর্থকগণকে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের জন্য উসকানি দিতে থাকেন।
ভারতের নেতৃস্থানীয় ইংরেজি পত্রিকা, ‘ঞযব চৎরহঃ’ এ সম্পর্কে যে লম্বা রিপোর্ট ছেপেছে, তার অংশ বিশেষ নিম্নরূপ-
ভারতের হিসাবে, হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা যায়, তাহলে পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য থেকে কূটনীতি, যেকোনো প্রশ্নেই দিল্লি সেই হাসিনা কার্ডকে দরকষাকষির জন্য ব্যবহার করতে পারবে। ভারত একদম মোক্ষম সময়ে এই ‘হাসিনা তাস’কে টেবিলে ছুড়ে দেবে। এখন ভারত অতীতের মতোই বালুচ বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে আগলে রেখেছে।
এর চেয়েও ভয়াবহ আরেকটি আশঙ্কা রয়েছে। এমনও হতে পারে, ভারত সত্যি সত্যি ছক এঁকে বসে আছে, আজ হোক বা কাল, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরবেন। হাসিনা নিজে সে কথা বলেছেন, আওয়ামী লীগ যে এখনো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশা করে, তার আরও একটি আলামত আমরা কয়েক সপ্তাহ আগে সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে জেনেছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত অফিসারের নেতৃত্বে শ চারেক আওয়ামী কর্মী নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। ভারতের কাছ থেকে সবুজ সংকেত ছাড়া খোদ রাজধানীতে এমন দুঃসাহসী কর্মযজ্ঞে তাঁরা নামবেন, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।
ভারতের এই গেমপ্ল্যানের সাথে আপনি যদি গোপালগঞ্জে আওয়ামী মাস্তানদের পেশিশক্তি সঞ্চালন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে লতিফ সিদ্দিকী, হাফিজুর রহমান কার্জন প্রমুখের জুলাই বিপ্লববিরোধী উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে গ্রেফতার, ভিপি নূরের ওপর হামলায় আওয়ামী মাস্তানদের অংশ গ্রহণ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর ছদ্মবেশে হেলমেট বাহিনীর আক্রমণ এবং ৫শত শিক্ষার্থীকে আহত করা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং হামলাকারীদের মধ্যে ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশ ইত্যাদি সব ঘটনা মিলিয়ে দেখেন, তাহলে বুঝতে মোটেই অসুবিধা হবে না যে, ভারত বাংলাদেশে সর্বাত্মক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য মরিয়া হয়ে লেগেছে। আগামী ফেব্রুয়ারির আগেই আরো বড় কিছু এক বা একাধিক ঘটনা ঘটবে বলে রাজনৈতিক সমীক্ষকগণ আশঙ্কা করছেন।
Email:[email protected]