জুলাই সনদ নিয়ে জল্পনা : ফ্যাসিবাদের নাশকতা : অচলাবস্থা তৈরির অপচেষ্টা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে মতৈক্য


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩৪

॥ ফারাহ মাসুম॥
জুলাই সনদ কি ঐকমত্য কমিশন এক সপ্তাহের মধ্যে প্রণয়ন করতে পারবে? না পারলে কী হবে? আর রাজনৈতিক দলগুলো কোন পর্যায় পর্যন্ত রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে একমত হতে পারবে- এ ধরনের নানা বিষয় এখন আলোচনার শীর্ষে। ঐকমত্য কমিশন এরই মধ্যে জুলাইয়ের বাকি সময়েই ‘জুলাই সনদ’ তৈরির কথা বলেছে। সব রাজনৈতিক দল একমত হওয়ার বিষয়ের পর এখন অধিকাংশ দল যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেসব বিষয় উল্লেখ শুরু করেছে। সব দল একমত না হলে তখন গণভোট দিয়ে সনদের ব্যাপারে জনসম্মতি নিতে হবে। আর এরই মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সব দল একমত হয়েছে। এর পাশাপাশি কার্যকর সরকার ও নির্বাচন কমিশন এবং স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে বিদায়ের দাবি উঠেছে জোরালোভাবে। সেইসাথে পতিত স্বৈরাচারের মদদে একের পর এক নাশকতার ঘটনা ঘটানোর গোয়েন্দা তথ্যের কথা জানা যাচ্ছে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে ফ্যাসিবাদ যাতে বার বার ফিরে আসতে না পারে, তার জন্য রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এবং গণহত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি ওঠে। এ লক্ষ্যে সরকার ১২টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং এসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। কমিশনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এর প্রধান পদে রাখা হয় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখনো সকল বিষয়ে ঐকমত্যে না পৌঁছালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছার পথে রয়েছে। এ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের চেষ্টার কোনো শেষ নেই। গত ২৩ জুলাই বুধবার বিকালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৩টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে মিলিত হয়েছে। বুধবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছে।
গত ২২ জুলাই মঙ্গলবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক হয়। জুলাইয়ের অবশিষ্ট দিনগুলোয় ‘জুলাই সনদ’ তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ কমিশন। সব দল একমত না হলে গণভোট দিয়ে সনদের ব্যাপারে জনসম্মতি নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আর এরই মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সকল দল একমত হয়েছে।
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ কমিশনের দৈনন্দিন বৈঠকগুলোয় নেতৃত্ব দেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, জুলাইয়ের মধ্যেই ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ ঘোষণা করবে। এই ‘জুলাই সনদ’ হবে এমন একটি জাতীয় ঐকমত্যের দলিল, যেখানে একটি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার বা সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে একটি সমঝোতা সমন্বিত করার চেষ্টা হচ্ছে।
ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে এ পর্যন্ত যেসব ইস্যুতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কিছু আংশিক বা নীতিগত ঐকমত্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে- প্রথমত, নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামোয় বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, জামায়াতসহ বিরোধীদলগুলো ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দাবি করেছে। এ ব্যাপারে সব দল একমত হয়েছে। এ বিষয়ে ঐকমত্যের ধরন একেবারে পূর্ণ না হলেও নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সংস্কার নিয়ে সবপক্ষই একমত যে নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতাবান, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ আছে, তবে অনেকেই ‘বাছাই কমিটি ও সংসদীয় শুনানির’ প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। এ ইস্যুতে নীতিগত ঐকমত্য বিদ্যমান; কাঠামোগত বাস্তবায়ন নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।
তৃতীয়ত, দলগুলো পুরোপুরি ইভিএম বর্জনের পক্ষে। বাস্তব সংকটের কারণে (কারিগরি/লজিস্টিক) ব্যালটের দিকেই গেছে। এক্ষেত্রে ব্যালট পেপার ব্যবহারের ব্যাপারে কার্যত একটি ট্যাকটিক্যাল ঐকমত্য গড়ে উঠেছে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে ঐকমত্য রয়েছে। তবে কারা পর্যবেক্ষক হবে, এ বিষয়ে রাজনৈতিক মতানৈক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে নীতিগতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গ্রহণযোগ্য, তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা রয়েছে।
পঞ্চমত, নির্বাচনী সহিংসতা, ধর্মীয় উসকানি, রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যÑ এসব বিষয়ে সব পক্ষ সম্মত যে আচরণবিধি থাকা উচিত। তবে প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কে হবে এবং সেই প্রয়োগ নিরপেক্ষ হবে কিনা, এতে সন্দেহ ও দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে নীতিগত সমর্থন রয়েছে, তবে বাস্তবায়নে আস্থার ঘাটতি।
ঐকমত্য কমিশনের গত ২২ জুলাই মঙ্গলবার বৈঠক শেষে কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না- এ বিষয়ে তিন-চতুর্থাংশ রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হয়েছে। কিছু দল ও জোট (বিএনপিকে ইঙ্গিত করে) এ বিষয়ে ভিন্নমত ব্যক্ত করেছে। এই দল ও জোটগুলো জাতীয় সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিতে পারবে।
বিএনপি একই ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান রাখার পক্ষে। তবে জামায়াতে ইসলামী প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি একই ব্যক্তি সংসদ নেতা হওয়ার বিষয়ে একমত। যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাকে একইসাথে দলীয় প্রধান হিসেবে চায় না। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এটিকে সমর্থন করে বলে জানা যায়।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। দলগুলোর সাথে আলোচনায় এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে গত ২০ জুলাই রোববার রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কমিশন একটি সংশোধিত ও সমন্বিত প্রস্তাব সব দলের কাছে প্রেরণ করে। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দলগুলোকে মতামত প্রদান করতে বলা হয়। বিএনপি কমিশনের অধিকাংশ প্রস্তাবের সাথে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে তাদের মতামত উপস্থাপন করে।
প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, তবে ‘র‌্যাঙ্কড চয়েস’ পদ্ধতির ব্যবহার বিষয়ে এখনো একমত হওয়া যায়নি। আবার আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংলাপ শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ৭০ অনুচ্ছেদে যেমন ভিন্নমত (ডিসেন্টিং ভয়েস) রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটিও সেভাবে রাখা যেতে পারে। বিএনপির অবস্থান হলো, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না- এমন বিধান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কোথাও নেই। এটি তার একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। পার্লামেন্টারিয়ানরা যাকে চাইবেন, তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী হবেনই- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আবার তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেয়ারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে গত ২২ জুলাইয়ের বৈঠকে বিএনপি সংশোধিত প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, কমিশনের পক্ষে প্রস্তাবিত ৫৮ অনুচ্ছেদের সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে- সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে বা মেয়াদপূর্তির বাইরে ভেঙে গেলে তার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। এখানে কোনো ভিন্নমত নেই। বিএনপি তাদের প্রস্তাবে বাছাই কমিটিতে চারজন সদস্য- প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) রাখার কথা বললেও ২২ জুলাইয়ের আলোচনায় আরেকজন সদস্য যোগ করে মোট পাঁচজনের একটি বাছাই কমিটির প্রস্তাব ওঠে। এ পঞ্চসদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দল থেকেও একজন প্রতিনিধি রাখা হবে।
এ কমিটি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর কাছ থেকে প্রার্থীদের নাম আহ্বান করবে এবং নাম যাচাই করে একজন প্রধান উপদেষ্টার নাম নির্ধারণের চেষ্টা করবে। যদি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না যায়, তাহলে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন, সরকারি দল থেকে পাঁচজন এবং তৃতীয় বৃহত্তম দল থেকে দুজন করে মোট ১২ জনের তালিকা তৈরি হবে, যার মধ্য থেকে কমিটি একজনকে নির্বাচিত করার চেষ্টা করবে। তবে যদি এখানেও একমত হওয়া না যায়, তখন কমিশনের একটি প্রস্তাব ছিল ‘র‌্যাঙ্ক চয়েস ভোটিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার। এ বিষয়ে বিএনপি একমত নয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাছাই কমিটি যদি সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে ভালো। না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর (১৩তম) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। তবে বিএনপি তাতে রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিধানটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যকর হলে সংবিধানের ১২৩(৩) ধারা ও ৭২(১) ধারা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। প্রথমটি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন হলে আগের সংসদের সদস্যদের বহাল থাকার বিতর্কিত বিধান সম্পর্কিত, আর দ্বিতীয়টি অধিবেশন আহ্বান নিয়ে ৬০ দিনের সময়সীমার সাথে সম্পর্কিত। বিএনপির মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যকর হলে এসব অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধনের প্রয়োজন হবে এবং এতে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নেই।
একজন ব্যক্তি দলীয় পদে থাকার কারণে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, এটা ওই ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হবে- বিএনপির এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশকে এখন রিফর্ম করা হচ্ছে এবং চেঞ্জ আসছে। সেভাবে দলগুলো যেন ডেমোক্র্যাটিক হয়, সেই চেষ্টাও করতে হবে। কারণ ডেমোক্র্যাসির ভায়োলেশন হয় তখনই, যখন নিজ দলেই ডেমোক্র্যাসি থাকে না। আমাদের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পাওয়ার ডিসেন্ট্রালাইজেশন করা। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পাওয়ার ডিসেন্ট্রালাইজ হয়, সেটি দলীয়ভাবে ডিসেন্ট্রালাইজ হতে পারে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, কেয়ারটেকার সরকারের ফরমেশন (গঠন) নিয়ে একটা সার্চ কমিটি হবে। বিএনপি প্রথমে চারজনের কথা বলেছিল, আমরা বলেছি পাঁচজন হবে। পরে বিএনপিসহ অধিকাংশ দলেই পাঁচজনের ব্যাপারে একমত হয়েছে অনেকটা। এখনো ফাইনালি ডিভিশন হয়নি। আর বিএনপি বলেছে, একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, লিডার অব দ্য পার্লামেন্ট, অ্যান্ড হেড অব দ্য পার্টি হতে পারবে। আবার এনসিপিসহ কোনো কোনো দল বলেছে, ‘তিনটাতে তিনজন আলাদা ব্যক্তি থাকতে হবে। আমরা বলছি, প্রধানমন্ত্রী এবং লিডার অব দ্য হাউস একজন হতে পারবে এবং একজন হওয়া উচিত। কারণ লিডার অব দ্য হাউস আর প্রাইমমিনিস্টার যদি এক ব্যক্তি না হন, তাহলে পার্লামেন্টের ভেতরে সামঞ্জস্যতা হবে না, ডিফারেন্স হবে। যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তিনি একই সময়ে দলীয় প্রধান হতে পারবেন না।
প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হওয়া নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, এক ব্যক্তির কাছে সব ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা গণতন্ত্রের জন্য হুমকির। তাই আমরা তিনটি ভূমিকায় তিনজন ভিন্ন ব্যক্তি থাকার পক্ষে। তবে বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি যে, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা একই ব্যক্তি হতে পারেন, তবে তিনি দলীয় প্রধান হবেন না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে এনসিপির বক্তব্য হলো, বিচার বিভাগকে বাধ্যতামূলকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অংশ করার আগের সংবিধান সংশোধনীর ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবে আমরা একমত পোষণ করেছি। এ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের একজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে, যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে মনোনয়ন দেবেন। আমরা র‌্যাঙ্কড চয়েস ভোটিংয়ের মাধ্যমে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছি- যাতে রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
তৃতীয় আলোচ্য বিষয় এনসিসি প্রসঙ্গে এনসিপির বক্তব্য হলো, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ দেয়ার যে প্রস্তাব ছিল, তা থেকে সরে এসে এখন আলাদা আলাদা কমিটি বা বডির কথা বলা হচ্ছে। তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে বাদ দেয়া হয়েছে- এতে আমাদের উদ্বেগ আছে।
জুলাই সনদ সম্ভব হবে?
জুলাইয়ের মধ্যে ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করার কথা বলেছে। এটি সম্ভব হবে, যদি রাষ্ট্রীয় অনুমোদন বা রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সংগঠন একে স্বীকৃতি দেয় এবং এতে স্বাক্ষর করে। এটি আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করে, যা পরবর্তীতে আইন বা সংবিধানে রূপ নিতে পারে।
যদি ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করতে না পারে, তাহলে সম্ভবত নিচের পরিস্থিতিগুলোর একটি দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা বজায় থাকবে। বড় দলগুলোর সমঝোতা না হওয়ায় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংকট বাড়বে। সরকার একক সিদ্ধান্তে অগ্রসর হতে পারে, যা নির্বাচন ও ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এতে রাজপথে সংঘাত বা আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়বে। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যেতে পারে; বিশেষ করে যদি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতামতের প্রভাব থাকে।
যদি ঐকমত্য কমিশন ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে আদালতের হস্তক্ষেপে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। নতুন তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর আইন প্রণয়নে অধ্যাদেশ জারি হতে পারে।
ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করতে পারবে, যদি তার কাজের পরিধি ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি থাকে। না পারলে এটি হবে একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যার পরিণামে দ্বন্দ্ব, নির্বাচন সংকট ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
কেমন হতে পারে জুলাই সনদ
‘জুলাই সনদের’ কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করছে এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। জুলাই শেষে বোঝা যাবে কতটুকু ঐকমত্য এতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এর একটি সম্ভাব্য কাঠামো সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
‘ঐকমত্য কমিশনের’ সনদে তফসিলপূর্ব, তফসিল-পরবর্তী ও নির্বাচনের সময়কালীন কাঠামো নির্ধারণ করা হতে পারে। এর মূল বিষয়ে থাকতে পারে-
১. নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো : সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন/তদারকি সরকার গঠন হবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর। প্রধান উপদেষ্টা বা তদারক প্রধানমন্ত্রী হবেন দলনিরপেক্ষ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি/প্রধানমন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যিনি সর্বসম্মতভাবে মনোনীত হবেন। মন্ত্রিসভায় সব দলের সীমিত প্রতিনিধি থাকবেন।
২. নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ সংস্কার: কমিশনের সদস্যদের নতুন করে গঠন করতে হবে। সকল দলের পরামর্শে নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ। কমিশনের বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আনুপাতিক ও সরাসরি ভোটের মিশ্র পদ্ধতি চালু : সংসদের ৫০% আসন সরাসরি এফপিটিপি ও ৫০% আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে বা পিআরে ভাগ হবে। সংবিধান সংশোধন ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। অথবা দুই কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার উচ্চকক্ষের সদস্যরা আনুপাতিক পদ্ধতি এবং নিম্নকক্ষের নারী সদস্যসহ ৪০০ আসনের এক-তৃতীয়াংশ আনুপাতিক এবং দুই তৃতীয়াংশ প্রচলিত এফপিটিপি পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতে পারে।
৪. ইভিএম ব্যবহারের নীতিমালা: যেখানে সব দল সম্মত, সেখানে সীমিত পরিসরে ইভিএম; বাকিগুলো ব্যালট পেপারে নির্বাচন হতে পারে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণবিধি: নির্বাচনী প্রচারে অস্ত্র, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ভাষা নিষিদ্ধ থাকবে। প্রত্যেক দল প্রচারের ব্যয় ও আচরণবিধিতে স্বাক্ষর করবে।
৬. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ অনুমোদন। মিডিয়া এক্সেস, বিতর্ক অনুষ্ঠান ও সমান সময় নিশ্চিত করা হবে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন
রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে- এ প্রশ্ন আসছে। এখানে জুলাই সনদের তিনটি অংশ রয়েছে। এর একটি হলো রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন, যেখানে সংবিধান ও আইনি সংশোধনের বিষয় রয়েছে। দ্বিতীয়ত, গণহত্যার বিচারিক প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নেয়া এবং কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিচার সম্পন্ন করা। তৃতীয়ত, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন করা।
জুলাই সনদে একমত হওয়ার পর দুই কক্ষের সংসদ, মিশ্র ব্যবস্থার নির্বাচন, তত্ত্বাধায়ক সরকারের কাঠামো নির্ধারণ, যে নামেই হোক স্থায়ী নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে ঐকমত্য হলে সেটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে কর্যকর করে তার ভিত্তিতে নির্বাচন হতে পারে। সনদ অনুসারে নির্বাচনোত্তর সরকার সংসদে সেটি পাস করবে।
এ বিষয়টি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর করতে পারে। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে কাঠামো জুলাই সনদে অনুমোদন হবে, সেই কাঠামো অনুসারে নির্বাচনের তিন মাস আগে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হতে পারে। সে সরকার নির্বাচন পরিচালনা করবে। এ সরকারের নেতৃত্ব অধ্যাপক ইউনূসের হাতেও থাকতে পারে। আবার ড. ইউনূস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে অভিভাবকের ভূমিকায় গিয়ে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হতে পারে। সেটি হলে স্বাভাবিক অবস্থার মধ্য দিয়ে সংস্কার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হতে পারে।