সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সমাবেশ

‘নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য জামায়াতকেই ভোট দিতে হবে’


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:১৯

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে আবদুল্লাহ আল ফারুক : পেশিতন্ত্র ও দখলদারিত্ব ঠেকাতে হলে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঘোষিত ৭ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৃণমূল পর্যায় থেকে জামায়াত নেতা-কর্মীদের জেগে উঠতে হবে। গত ১৯ জুলাই শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জাতীয় সমাবেশে সারা দেশ থেকে যোগদান করতে আগত নেতা-কর্মীরা এ অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
রমনার মৎস্য ভবন সংলগ্ন পূর্ব দেয়ালঘেঁষা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াং এনার্জিটিক ১৮ বছরের টগবগে ফর্সা মাঝারি গড়নের যুবক মো. আরিফুল হককে সালাম দিতেই জবাব দিল ওয়া আলাইকুমুস সালাম বলেন। জানান, নরসিংদীর রায়পুরা মোহাম্মদিয়া ফাজিল মাদরাসার প্রথম বর্ষের ছাত্র সে। তার বাড়ি রায়পুরার মরজাম ইউনিয়নাধীন ধুকুন্দীচর গ্রামে। নরসিংদি-৪ সংসদীয় এলাকার একজন সচেতন নাগরিক ও ভোটার হিসেবে তার এলাকার ভোটের হালচাল জানতে চাইলে তিনি জানান, এ আসনে একমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জনাব পনির স্যার এখানকার জামায়াত মনোনীত একমাত্র প্রার্থী। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এমপি রাজু উদ্দিন আহাম্মেদ পলাতক। বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার আশরাফউদ্দিন বকুলের নাম জোরেশোরে প্রচার চলছে। তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সুযোগ না পেলে জামায়াতের পক্ষে জেতার সম্ভাবনা বেশি। তিনি জানান, এখানে জামায়াত প্রার্থী কম পক্ষে ১৫ হাজার ভোট বেশি পাবেন, ইনশাআল্লাহ। তারা রায়পুরা থানা থেকে ২০টি বড় বাস ভরে সকাল ৯টার মধ্যে সমাবেশস্থলে এসে পৌঁছেছেন। জাতীয় সমাবেশে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমাবেশকে সফল করতে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তি অর্জনের জন্য এসেছেন তিনি।
কথা হলো মধ্য বয়সী দেলোয়ার হোসেনের সাথে। বিভিন্ন কথার ফাঁকে জানতে চাইলাম আপনি জামায়াতের সাথে জড়িত কিনা। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন সক্রিয় কর্মী বলে জানালেন। তিনি জানান, পিআর সিস্টেমে নির্বাচনসহ জামায়াতের কেন্দ্র ঘোষিত ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমীরের আহ্বানে সারা দেশ থেকে যেভাবে জনগণের ঢল নেমেছে, তাদের স্বাগত জানাতে এখানে এসেছি। তিনি আরও বলেন, পিআর সিস্টেম চালু হলে জনগণের মুক্তি মিলবে। সন্ত্রাস ৫০% কমে যাবে। প্রতিটি ভোটের সঠিক মূল্যায়ন হবে। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী হাসিনার অবৈধ ক্ষমতা দখলের পর থেকে ১৫ বছর কোনো ব্যবসা করা যায়নি। তবে হাসিনার বিদায়ের পর নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করতে পেরেছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, পেশিশক্তিমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে হলে প্রথমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরই করতে হবে জাতীয় নির্বাচন। তিনি ঢাকার রামপুরার ভোটার ও বাসিন্দা।
কথা হলো শেখ গনি আহমদ (৫৫)-এর সাথে। সুদূর খুলনা থেকে জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন তিনি। তিনি খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকায় বসবাস করেন। তার ভাষায়, “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দেওয়া দীন কায়েমে”র উদ্দেশ্যেই এ জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন তিনি। খুলনা-১ আসনের ভোটার গনি আহমদ জানান, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য জামায়াতকে ভোট দিতে হবে। অন্যায়, অবিচার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস একমাত্র জামায়াতকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে পারলেই দূর হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। তার আসনে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানান এ জামায়াত কর্মী।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থেকে জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম(৫৭)। তিনি জামায়াত সমর্থক। গত ডিসেম্বর ২০২৪-এ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ফরম পূরণ করে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন তিনি। জামায়াতে যোগ দেয়ার আগে তিনি বিএনপি কর্মী ছিলেন। এত কষ্ট স্বীকার করে জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে জামায়াত আমীরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছি’’। টাঙ্গাইল-৩ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তিনি। এ আসনে জামায়াত মনোনিত প্রার্থী হয়েছেন হোসনি মোবারক বাবুল। জামায়াতের জনসমর্থন দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এ এলাকায়। তবে বিএনপি একক প্রার্থী দিতে পারলে এ আসনে বিএনপির জেতার সম্ভাবনাই বেশি বলে জানান তিনি। তিনি আরো জানান, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে জামায়াতসহ ইসলামপন্থীদের জন্য ভালো। জামায়াত ক্ষমতায় এলে জনগণের লাভ কী? জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, একমাত্র জাামায়াত ক্ষমতায় আসলেই দেশ ও জনগণের লাভ। দেশ হবে দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত।
একই এলাকা থেকে এসেছেন আব্দুল আজিজ। তিনি লেখাপড়া করেছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। পেশা তার ব্যবসা। বয়স ৭০ বছর। তিনি ৪০ বছর জামায়াতের সাথে আছেন কর্মী হিসেবে। এত বয়সে কষ্ট করে এসমাবেশে এসেছেন কেন? জানতে চাইলে বলেন, আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের ঘোষিত ৭ দফা দাবি জোরালো করতে এ সমাবেশে যোগ দিয়েছি। এটা দীন প্রতিষ্ঠা করার কাজের অংশ। কাজেই এ সমাবেশে এসে মৃত্যু হলেও ভালো।
মো. ওমর ফারুক (৩০) একজন প্রবাসী। বাহরাইন থেকে ছুটিতে বাড়ি এসেছেন বিগত ১ মাস। ছোটবেলা থেকেই জামায়াত ও শিবিরকে ভালো বাসতেন বলে জানান তিনি। সমাবেশে আসার উদ্দেশ্য কী জানতে চাইলে বলেন, জামায়াত ঘোষিত ৭ দফার সাথে একমত হয়ে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের রায়কোট দক্ষিণ গ্রামে তার বাড়ি। কুমিল্লার এ সংসদীয় আসনটি বর্তমানে নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও লালমাই এই ৩টি থানা ও উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ সংসদীয় আসনটির সীমানা সংক্রান্ত মামলা এখনো অনিষ্পত্তি অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ আসনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াত নেতা ইয়াছিন আরাফাতকে মনোনীত করেছে। এ আসনের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পলাতক এমপি লোটাস কামাল এখন নিরুদ্দেশ। বিএনপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে মাঠে প্রচারণায় আছে মনিরুল হক চৌধুরী, গফুর ভুঁইয়া ও মুবাশ্বির আলম ভুঁইয়াসহ অনেকে। বিএনপি একক প্রার্থী দিতে না পারলে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বলে তিনি জানান। জামায়াত ক্ষমতায় এলে জনগণের লাভ হলো দুর্নীতিমুক্ত সমাজ পাবে জনগণ বলে জানান তিনি।
মো. দেলোয়ার হোসেন (৩৭) একজন জামায়াত কর্মী। বাসন মেট্রো থানা তথা গাজীপুর-২ আসনের ভোটার ও বাসিন্দা তিনি। জামায়াতের কেন্দ্র ঘোষিত ৭ দফা দাবির বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য এখানে আসা বলে জানান তিনি। জামায়াত ক্ষমতায় এলে জুলুমের অবসান হবে। আর পিআর সিস্টেম চালু হলে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজীপুর-২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন হোসেন আলীকে। বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে হাসান উদ্দিন সরকার ও সাবেক এমপি অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের ছেলের প্রার্থিতার মাঠে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে।
মো. আব্দুল মান্নান (৪২) শেরপুর-২ (নালিতাবাড়ী ও নকলা) সংসদীয় এলাকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের একজন কর্মী। জামায়াত আমীরের আহ্বানে কেন্দ্র ঘোষিত ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এ জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ সংসদীয় আসনে মো. গোলাম কিবরিয়া সাহেবকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে প্রার্থীতা নিয়ে বিএনপি এখানে ২ ভাগে বিভক্ত। বিএনপির সাবেক এমপি ও হুইপ জাহিদ চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী এবং স্থানীয় সংগঠক দুলাল চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কোন্দল চরমে। প্রচুর বিএনপির কর্মী-সমর্থক জামায়াতে চলে আসছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এ আসনে জামায়াত প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
একই এলাকার মো. সাইদুল ইসলাম (সাবেক বিএনপি কর্মী) জামায়াত কর্মী বলেন, বিএনপির চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসকে মানুষ ঘৃণা করে। তাই প্রচুর লোক জামায়াতে যোগ দিচ্ছে।
মো. মিজানুর রহমান (৪৫) জামায়াত কর্মী ও ওয়ার্ড সহ-সভাপতি, পিরোজপুর-১ জিয়ানগর (ইন্দুরকানী) উপজেলার বাসিন্দা ও ভোটার তিনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-এর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিগত সময়ে এখানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কয়েকবারের এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। আর বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলমগীর হোসেনের নামে প্রচার প্রচারণা চলছে। তবে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। এখানে মাসুদ সাঈদীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে জানান তিনি। তিনি পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চালু করার জন্য জোর দাবি জানান- যাতে প্রতিটি ভোটই কাজে লাগবে বলেন। তিনি গোপালগঞ্জে পরবর্তী মহাসমাবেশের কর্মসূচি প্রদানের আহ্বান জানান।
মো. নাজিম উদ্দিন (৫৫) জাতীয় সমাবেশে সুদূর কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে এসেছেন বলে জানান। তিনি কৃষি ও খাদ্য পণ্যের একজন পাইকারি ব্যবসায়ী। জামায়াতের কর্মী ও ওয়ার্ডের বায়তুলমাল সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তিনি কক্সবাজার-১ আসনের বাসিন্দা ও ভোটার। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ আসনে জামায়াতের কক্সবাজার পৌর আমীর আব্দুল্লাহ আল ফারুককে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এনামুল হক মঞ্জু একবার এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির পক্ষে নিশ্চিত প্রার্থী। ১৮ সালের রাতের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জাফর আলম এমপি হন। আর ২৪ সালের ডামি নির্বাচনে নৌকা প্রতিক নিয়ে এমপি হন কল্যাণ পার্টির চোয়ারম্যান মে. জে. (অব.) ইব্রাহীম বীরপ্রতীক। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৭ দফার দাবিকে জোরালো করতে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন তিনি। সমাবেশে আসতে পেরে খুব খুশি এবং আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন তিনি।
মো. দুলাল হোসেন (৩৮) বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের টাঙ্গাইল ধনবাড়ী উপজেলা শাখার কোষাধ্যক্ষ। ৫ আগস্টের পর থেকে সংগঠনে সক্রিয় কর্মী হন তিনি। টাঙ্গাইল-১ সংসদীয় আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রিন্সিপ্যাল মুহাম্মদ মুন্তাজ আলীকে মনোনীত করেছে। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী মো. আলী স্বপন ফকির। এখানে পলাতক হাসিনার দোসর ড. আব্দুর রাজ্জাক ২/৩ বারের এমপি। জামায়াত প্রার্থীর সম্ভাবনা ভালো বলে জানান তিনি। পিআর পদ্ধতিসহ জামায়াতের কেন্দ্র ঘোষিত ৭ দফা কর্মসূচিকে জোরালো করতে ও সমাবেশ সফল করতে জাতীয় সমাবেশে আসা। খুনি হাসিনাসহ দোসরদের দ্রুত বিচার দাবি করেন তিনি।