পুশইন হুমকিতে সীমান্ত নিরাপত্তা
১৩ জুন ২০২৫ ০৭:৪০
॥ এফ শাহজাহান॥
সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই বাংলাদেশে জোর করে মানুষ ঠেলে দিচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গত ২৩ দিনে ওপার থেকে ১ হাজার ২৩৯ জনকে জোর করে এপারে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই আরও ২ হাজার ৩৬৯জনকে পুশইনের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানাচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যম। এভাবে প্রতিদিনই সীমান্তের ওপারে মানুষ জড়ো করা হচ্ছে এপারে পুশইন করার জন্য।
পুশইনের কারণে সীমান্ত এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী একাধিকবার মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে। কুড়িগ্রাম সীমান্তে গত সপ্তাহে এমন এক সংঘর্ষে একজন বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী আহত হয়েছেন বলে বিজিবি নিশ্চিত করেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেছেন, ‘‘ভারত থেকে জোর করে মানুষ প্রবেশ করানোর খবর আমরা পাচ্ছি। বাংলাদেশি নাগরিক উল্লেখ করে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মানুষ প্রবেশ বা পুশইন করানোর বিষয়টি ‘গ্রহণযোগ্য’ নয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে জোরপূর্বক প্রবেশের বিষয়ে দিল্লিকে জানানো হয়েছে। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় তাদের পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।’’
ভারতজুড়ে প্রায় ৩ কোটি বাংলাভাষী মানুষকে অবৈধ অভিভাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে ভারত। এক যুগ আগে ২০১২ সাল থেকে ভারত সেখানকার বাংলাভাষীদের বাংলাদেশের পুশইন করার সুযোগ খুঁজছে। সম্প্রতি দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির সুযোগে এদের সবাইকে বাংলাদেশে পুশইন করতে চায় ভারতের বিজেপি সরকার।
আগামী ২০২৬ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সেখানকার বিজেপি সরকার নিজেদের হিন্দুত্ববাদী চেতনা জাগ্রত করার জন্যও পুশইন ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি সরকার এক উগ্র জাতীয়তাবাদী রূপ নিচ্ছে। ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বিতাড়নের প্রচার নির্বাচনে একটি বড় ইস্যু হতে পারে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষক অনুরাধা সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিজেপি তাদের প্রধান ভোটব্যাংক হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করতে চাইছে।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘ভারতের পুশইন নীতি সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। এটা কেবল মানবিক সংকট নয়, কূটনৈতিক বিপর্যয়ও।’’
কূটনৈতিক মহল মনে করছে, শেখ হাসিনার পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। শেখ হাসিনার ভারতপন্থি পররাষ্ট্রনীতি হঠাৎ করেই পাল্টে গেলে ভারতের রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার এ পরিবর্তনকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছে।
এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি অনুযায়ী যেসব মানুষ ‘অবৈধ’ ঘোষিত হয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ বাংলাভাষী মুসলমান।
ভারতে উগ্রপন্থি জাতীয়তাবাদীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ জনগোষ্ঠী ‘বাংলাদেশি’ এবং তাদের ‘নিজ দেশে’ ফেরত পাঠানো উচিত। এ মনোভাব থেকেই ভারত এখন পুশইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে এখন পর্যন্ত পুশইনের ১৮টি হটস্পটের খোঁজ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে ৩৬৯ জনকে পুশইন করা হয়েছে।
ভারতের পুশইন রোধে বিজিবি সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুশইন করায় বিএসএফের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মৌখিক ও লিখিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আমাদের বাহিনী সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছে। সীমান্তে ভারতের পুশইন করার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ভারতকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আমাদের নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ মে) সকাল ১০টায় রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৪তম ব্যাচ ডেপুটি জেলার এবং ৬২ তম ব্যাচ ও মহিলা কারারক্ষী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এ কথা বলেন। এর ১০ দিন আগে গত ১৭ মে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছিলেন ‘‘সীমান্তে আমরা ভারতের পুশইনকে কোনো উসকানি হিসেবে দেখছি না। বরং বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদেরও যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানোর নীতিতে আমরা অটল।”
তিনি আরও জানান, “ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ভারত সরকারকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন পুশইনের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হয়।”
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ‘বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, “পুশইনের মাধ্যমে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশে প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। আমরা এ অপতৎপরতা প্রতিহত করতে সতর্ক রয়েছি এবং এতে আমরা সফল হবো বলে আশাবাদী।”
অপরদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা কাউকে জোর করে পাঠাচ্ছে না বরং এরা “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এসব মানুষের কোনো বৈধ বাংলাদেশি পরিচয় নেই, জন্মস্থানও ভারত।
ভারতের শুধু আসামেই মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলেন এমন প্রায় তিনলাখ ভারতীয় নাগরিক দেশটি থেকে বহিষ্কারের মুখে রয়েছেন। কয়েক দশক ধরে ধরে ভারতে বসবাস করে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ভোটার তালিকায় নাম উঠানো ২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৭৯ জনের নাগরিকত্ব নিয়ে এরইমধ্যে তোলা হয়েছে প্রশ্ন। এ তালিকা বাড়ছে প্রতিদিনই।
আসামজুড়ে ৩৬টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে চলছে এদের বিচার কার্যক্রম। এসব ট্রাইব্যুনালে গত ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৭টি মামলা অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও এদের সবাইকে এখনো আটক করা হয়নি। তবে মামলা শেষে পরোয়ানা জারি করা হবে।
ভারতজুড়ে ‘বিদেশি খেদাও’ কর্মসূচির অধীনে ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে এসব মানুষকে নাগরিকহীন করে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার প্রক্রিয়া অনেকটাই চূড়ান্ত করা হচ্ছে প্রায় এক যুগ আগে থেকেই। এবার ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে ভারত পুশইন ইস্যুকে কাজে লাগানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে।
এ নিয়ে লিখিত ও মৌখিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। একই সঙ্গে পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাতভর বিজিবির সঙ্গে স্থানীয় জনতাও সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া এভাবে সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও সীমান্ত আইনের পরিপন্থি বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ জেলায় সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি জেলার সীমান্ত বেশি স্পর্শকাতর। এসব সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই ওপার থেকে এপারে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিএসএফ। এর মধ্যে তাদের দেশের বাংলা ভাষাভাষীদেরও পাঠিয়ে দিচ্ছে। পুশইনের শিকার মানুষগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ারও শঙ্কায় রয়েছেন।
বিজিবি জানিয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুশইন করায় বিএসএফের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মৌখিক ও লিখিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। এ ছাড়া পুশইন রোধে বিজিবি সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিজিবির পরিসংখ্যান বলছে, গত ৭ মে থেকে ৩১ মে শনিবার পর্যন্ত ২৩ দিনে সীমান্ত দিয়ে ১ হাজার ২১১ জনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৬৯ জনকে পুশইন করেছে ভারত। এরপর খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ১৩২ ও সিলেট সীমান্ত দিয়ে ১১৫ জনকে পুশইন করা হয়। একই সময়ে হবিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ৪১, সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ১৬, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ১৩, ফেনী সীমান্ত দিয়ে ৫২, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৯৩, লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে ৮৫, ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ১৯, পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে ৩২, দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে ১৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ১৭, চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ২৯, মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ৩০, ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ৫২ এবং সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ২৩ জনকে পুশইন করেছে ভারত। এ ছাড়া সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের মান্দারবাড়িয়া এলাকায় ৭৮ জনকে পুশইন করা হয়েছে।
সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ‘বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, সীমান্তে ভারতের পুশইনের ঘটনা সুপরিকল্পিত এবং ন্যক্কারজনক। ভারত সে দেশের শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ পুশইন করছে। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
তিনি আরো বলেন, বিএসএফ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় পুশইন করেছে। এমন জায়গায় করেছে যেখানে জনগণ নেই, জনবসতি নেই সেসব জায়গায়। আপনারা জানেন যে, সীমান্তের প্রতিটি স্পট ফিজিক্যালি অকুপাই করে রাখা যায় না। যে জায়গায় কেউ ছিল না, সেখানেই পুশইন করেছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়ে পুলিশের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন করে যাদের বাংলাদেশি পেয়েছি তাদের কেউ গত দুই থেকে তিন বছর এবং কেউ ২০ থেকে ২৫ বছর আগে নানা কাজে ভারতে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকের সন্তানাদি আছে যারা আগে গিয়েছিল তারা কিন্তু ভারতের আধার কার্ডসহ অন্যান্য ডকুমেন্টস পেয়েছে। ভারতের পুলিশ বা বিএসএফ সেগুলো রেখে দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ভারতের পুশব্যাক নীতি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং এতে মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে চাপে রাখতে পুশইনের নতুন এ কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে ভারত। সীমান্তে বিজিবির নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে এটি সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান বলেন, পুশইন কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য না। এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। কারণ কারা এখানে আসছে সেই ব্যাপারে আগে থেকে আমাদের ধারণা থাকে না। আমাদের সব পন্থায় এটা প্রতিহতের চেষ্টা করা উচিত। সীমান্তে পাহারা বৃদ্ধি করতে হবে। আর আমাদের কূটনৈতিক যে পন্থা আছে, সেখানে ভারতের কাছে জোরালেভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, সীমান্তে ভারত যে পুশইন করছে, এটা মানবতাবিরোধী কাজ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ৩০ মে শুক্রবার দিবাগত রাতে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা সীমান্তে বিএসএফের পুশইন ঠেকাতে প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় মানব দেয়াল সৃষ্টি করে রাতভর পাহারা দেয় স্থানীয় জনতা।
কুড়িগ্রাম-২২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহাবুব উল হক জানান, সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ অবৈধভাবে কাউকে যেন পুশইন করাতে না পারে সেজন্য বিজিবি, আনসার সদস্যসহ সীমান্তবাসী যৌথভাবে পাহারা দিচ্ছে। টহল জোরদার করা হয়েছে সীমান্তে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, পুশইন শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও যেহেতু এটিকে থামানো যায়নি, এখন উচিত হবে আরও জোরালো ভাষায় কথা বলা। কারণ সীমান্তের যে নাজুক অবস্থা অনেক পয়েন্টেই অবৈধ অনুপ্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
ভারতের ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ফেরত পাঠানোর সুযোগ থাকার পরও শত শত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে কেন আটকে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রশ্ন করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত প্রশ্ন করেছে, ‘কোনো অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী অভিযুক্ত অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেলে, এটি কি প্রমাণিত হয় না যে, তিনি ভারতের নাগরিক নন? তাহলে শত শত অবৈধ অভিবাসীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প/কারেকশনাল হোমে রাখা হচ্ছে কেন?’
কলকাতা হাইকোর্টের স্বপ্রণোদিত মামলা, যা পরে সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তরিত হয়, তার শুনানিতে এ প্রশ্ন করে দুই সদস্য বিশিষ্ট বিচারকের সমন্বিত একটি বেঞ্চ।
ভারতের এ আগ্রাসী অবস্থান চীন ও পাকিস্তানের জন্য কৌশলগত সুযোগ এনে দিয়েছে। চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে সীমান্ত সুরক্ষা ও আশ্রয়প্রার্থী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে। পাকিস্তানও এ ইস্যুকে দক্ষিণ এশিয়ার “হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ” হিসেবে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে । কিন্তু বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা ও সম্পর্ক এতটাই নাজুক যে, আলোচনা শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ বার বার আলোচনার কথা বললেও ভারত কোনো ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না।
ভারতের পুশইন নীতির ফলে শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অস্থিরতার ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে উভয় দেশকেই আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ করে একটি মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা। তা না হলে দক্ষিণ এশিয়ার এ দুই প্রতিবেশীর দ্বন্দ্ব পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলবে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের চাপ এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।