ভারত ও আ’লীগের টার্গেট বিএনপি


১৩ জুন ২০২৫ ০০:২২

॥ জামশেদ মেহদী॥
গত ৬ জুন ছিলো শুক্রবার। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগের সন্ধ্যা ৭টা। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ৪ হাজার ৫২৪ শব্দের একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ। আমি এ ভাষণটি মনযোগের সাথে পড়েছি। সকলের মতো আমারও ধারণা ছিল যে, নির্বাচনের সময় নিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে সেটি প্রশমনের জন্য এ ভাষণে নিশ্চয়ই কিছু থাকবে। যথারীতি সেটি এলো। তবে ভাষণের প্রায় শেষ অংশে। প্রধান উপদেষ্টা জানালেন যে, আগামী এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি তার কাজ করলেন। এর পর বিস্তারিত যা করার সেটি করবে নির্বাচন কমিশন। স্বভাবতই সাধারণ মানুষ বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো উদগ্রীব ছিলো এটি জানতে যে, কখন নির্বাচন হচ্ছে। কারণ দেশের অন্যতম দল বিএনপির সাথে এ নির্বাচনের সময় নিয়েই বর্তমান ইন্টারিম সরকার বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সম্পর্কে দারুণ টানাপড়েন চলছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিএনপির অন্যতম সিনিয়র নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ তো রীতিমতো হুমকি দিয়েছিলেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারন করা না হলে ঈদের পর সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে তারা রাজপথে কর্মসূচি দেবেন। সরকার ও বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পটভূমিতে নির্বাচনের টাইম ফ্রেম জানতে জনগণ এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল উন্মুখ ছিলো। অবশেষে সেই সময়টি জানা গেলো। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপ কতখানি প্রশমিত হলো সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে এর মধ্যে পরিস্থিতি একটি ড্র্যামাটিক টার্ন নিয়েছে। কারণ আজ (শুক্রবার ১৩ জুন) লন্ডন সময় সকাল ৯টা অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় অপরাহ্ন ৩ টায় লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে বৈঠকে বসবেন ড. ইউনূস এবং তারেক রহমান। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মোতাবেক বৈঠকটি চলবে ২ ঘন্টা। এটি হবে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠক। শেষ হবে লন্ডন টাইম ১১টায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা। এই বৈঠকের ফলাফল কি দাঁড়ায় সেটা নিয়েও জনগণ ও রাজনৈতিক দলসমূহ গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আমি কিছুক্ষণ পর জানাচ্ছি। তার আগে তার ভাষণ সম্পর্কে দুটি কথা। কারণ ৫ দিন পর পত্র-পত্রিকাসমূহের প্রিন্ট সংস্করণ বের হলো ১১ জুন বুধবার। আমি মূলধারার পত্রপত্রিকা বলে পরিচিতি ৮টি দৈনিক সংবাদপত্র রাখি। এর মধ্যে দুইটি ইংরেজি। কিন্তু কোনো পত্রিকাতেই প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পূর্ণ বিবরণ দেখলাম না। অথচ সেই ভাষণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে। এসব কথা আপনি সমর্থন করুন আর না করুন, তবে সেগুলো জনগণকে জানানোর প্রয়োজন রয়েছে।
পতিত স্বৈরাচারের আমলে আমরা দেখেছি, প্রতি বছর শুধু নয়, প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর দৈনন্দিন পণ্যসামগ্রীর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। কিন্তু এবার আলু, পেঁয়াজ, ডিম, শাকসবজি, মসলা, তরি তরকারি ইত্যাদি পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। গত রমজানের ঈদের মতো এবারেও ঈদ উপলক্ষে দেশে যাওয়া এবং আসা অনেকটা নির্বিঘ্ন হয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু সে সম্পর্কে সংবাদপত্রে কোনো কথা নাই।
অনেকে বলেন, যে অর্থনীতির অবস্থা নাকি খুব খারাপ। অর্থনীতির অবস্থা খুব ভালো, একথা আমি বলছি না। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক বেড়েছে। ভারতের আদানি গ্রুপ হুমকি দিয়েছিলো যে, তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি বন্ধ করবে। কারণ তাদের নাকি অনেক বকেয়া পাওনা বাংলাদেশের কাছে রয়েছে। অথচ, গত রমজান থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ৩ মাসে আমরা কোনো লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হইনি। কারণ, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ব্যয় সংকোচন করে সরকার ৪৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় করেছেন। সেই টাকার একটি অংশ আদানি এবং অন্যান্য পাওনাদারদের বকেয়া পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। এজন্য তারা বিদ্যুৎ রফতানি বন্ধ করতে পারেনি। আর আমরাও লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হইনি।
সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো গুম, খুন, জুলাই বিপ্লব, শাপলা ম্যাসাকার প্রভৃতি হত্যাকাণ্ডের বিচার করা। এটি একটি সময় সাপেক্ষ এবং হারকুলিয়ান টাস্ক। তবে ইতোমধ্যেই জুলাই হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনাকে সুপিরিয়র কমান্ড আসামি হিসেবে দায়ী করে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিসহ অনেকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সেই চার্জশিট প্রদান বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অনেক রাঘববোয়ালসহ বড় বড় আমলার বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই লুটপাট হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যেই পূর্ণোদ্যোমে কাজ শুরু করেছে। শেখ হাসিনার ট্রাইব্যুনালের মতো বিচারের নামে প্রহসন না করে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এ সরকারের আইসিটি কাজ করছে।
এই সরকার সবচেয়ে দুঃসাহসি যে কাজটি করেছে সেটি কেউ স্বীকারও করছেন না অথবা সেসব কথা মুখেও আনছেন না। আর সেটি হলো, শেখ মুজিবের ওপর আরোপ করা দেবত্বের খোলস উন্মোচন করা হয়েছে। ড. ইউনূস বলেছেন যে, দেশের ১ হাজারের বেশি অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের নাম পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো। তার মধ্যে ছিলো কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্র আরো বহুকিছু। এগুলোর সব নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান। এক সময় প্রযুক্তিগত উন্নতিতে জাপান পৃথিবীতে আমেরিকার পরে দ্বিতীয় স্থানে ছিলো। সেই জাপানে গতমাসে ড. ইউনূস সফরে গিয়েছিলেন। এই সফরের নিট ফলাফল এই যে, জাপান বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ২০ হাজার করে ৫ বছরে ১ লক্ষ শ্রমিক নেবে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট সুখবর।
এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, বড় বড় পলিটিশিয়ানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি না জেনে, না শুনে অনেক কথা বলেন, যেগুলো অপপ্রচারে পর্যবসিত হয়। তেমনি একটি বিষয় হলো, চট্টগ্রাম দিয়ে রাখাইনে মানবিক করিডোর। ড. ইউনূস সরকার প্রধান। তিনি স্বয়ং বলেছেন যে, মানবিক করিডোর নয়, ত্রাণ চ্যানেল দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ অনুরোধ করেছিলো। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকার এক কদমও এগুয়নি। আর ভবিষ্যতেও এগোবে না। তারপরেও সরকার আমেরিকার হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিচ্ছে, এমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের দেওয়া হচ্ছে। আসল কথা হলো, বন্দর নয়, কন্টেইনার টার্মিনালের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে বন্দরের ইনকাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি করার পক্ষে ড. ইউনূস যুক্তি দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিপক্ষে যুক্তি দেখান। তাদের যুক্তি যদি সরকারি যুক্তির চেয়েও সবল হয় তাহলে সেটি করা হবে না। কিন্তু এসব নিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গেলো গেলো বলে রব তোলা কতদূর সমীচীন সেটা বিজ্ঞজনরা ভেবে দেখবেন।
এবার লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য ইউনূস-তারেক বৈঠক সম্পর্কে দুটি কথা। আমরা জানিনা, তাদের মধ্যে কোনো পলিসি ইস্যু নিয়ে আলোচনার কিছু আছে কিনা। বিএনপি তো বার বার বলছে, এ সরকারের সামনে একমাত্র নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোনো ম্যান্ডেট নেই। ইলেকশন ছাড়া বাকি সব কাজ করবে নির্বাচিত সরকার। তাদের কথা মোতাবেক ইউনূস-তারেক বৈঠকে ইলেকশন ছাড়া আর কি আলোচনা হতে পারে? ইলেকশন নিয়েও তো একটি টাইম ফ্রেম ড. ইউনূস দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, মাওলানা মামুনুল হকের হেফাজতে ইসলাম, প্রভৃতি ইসলামিক দল ড. ইউনূসের টাইম ফ্রেমকে ওয়েলকাম করেছে। এনসিপি শর্ত সাপেক্ষে ওয়েলকাম করেছে। বলেছে, জুলাই চার্টারের পর ইলেকশনের টাইম ঘোষণা করলে ভালো হতো। পক্ষান্তরে বিএনপি ডিসেম্বরেই অনড়। লন্ডন বৈঠকে এ ডিসেম্বর আর এপ্রিল নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
কিন্তু, ইলেকশনের এ ৪ মাস নিয়ে সারা দেশ উথাল-পাতাল করার কোনো যুক্তি সাধারণ মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেকে তো বলছেন যে, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে জুলাই বিপ্লব যদি না হতো তাহলে তো বিএনপিকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। অর্থাৎ আরও সাড়ে ৪ বছর অপেক্ষা করতে হতো। সাড়ে ৪ বছর অপেক্ষা করতে পারলে এ ৪ মাস অপেক্ষা করা কেন সম্ভব নয়? সেটি জনগণের কাছে বোধগম্য নয়। তারপরেও লন্ডনে বৈঠক করে তারেক রহমান যদি ইলেকশন আরো এগিয়ে এনে ফেব্রুয়ারিতে করতে পারেন তাহলে অন্যেরা নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না।
এসব বিষয় নিয়ে বিএনপির একজন সিনিয়র বুদ্ধিজীবী ড. দিলারা চৌধুরী কিছু মূল্যবান কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বিএনপির যে, দোদুল্যমানতা ছিলো সে সম্পর্কে তিনি বলেন যে, বিএনপি এ ব্যাপারে জনগণের দোহাই দেয়। কিন্তু জনগণ তো ৫ অগাস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির একমাত্র পুঁজি ছিল শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার। বিএনপি কি শেখ মুজিবের ইমেজ ভাঙতে পারতো? কিন্তু শেখ মুজিবের প্রায় ৪ হাজার মূর্তি ভেঙে এবং শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি ভেঙে বিপ্লবের পরেও জনগণ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
বিএনপির বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি বলেন, বিএনপি দুর্বোধ্য কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে। কিন্তু তারা কি একবারও ভেবেছে যে, আওয়ামী লীগের হাতে আছে লক্ষ কোটি টাকা। আছে অস্ত্র। আর আছে পেশিশক্তি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও তারা কি রুখতে পারবে আওয়ামী লীগের এসব শক্তি? ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বিএনপির অনেকে মনে করেন যে, ভারতের সাহায্য ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়াও যেমন কঠিন, তেমনি ক্ষমতায় টেকাও কঠিন। কিন্তু জুলাই বিপ্লব সেই ধারণা চুরমার করে দিয়েছে।
ড. দিলারা চৌধুরী কয়েকটি হুঁশিয়ারি দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি অরাজকতার মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অজানা। তার সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। মানবিক করিডোর, বন্দর ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকাকে চটিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে প্রধান দল বিএনপি নিশ্চুপ থাকায় চীনও বিএনপির পেছনে এ মুহূর্তে নেই। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের এ মুহূর্তের এবং চিরকালের শত্রু হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং আওয়ামী নিকৃষ্ট নাৎসিবাদ। একমাত্র নির্বাচন ছাড়া বিগত ১০ মাসে বিএনপি আর কোনো ইস্যুকে সামনে আনেনি। ভারত সম্পর্কে কোনো কথা বলেনি। কিন্তু ভারত এ ১০ মাসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশে তাদের একামাত্র প্রতিনিধি। ড. ইউনূস এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইউনূস ক্ষমতা থেকে সরে গেলে ভারত এবং আওয়ামী লীগের টার্গেট হবে বিএনপি।
মনে হয় বিএনপি রাজনীতির এ অঙ্কটি সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি।