সুশাসন নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ পৃথক করতে হবে
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০৪
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ইরানসহ অনেক দেশেই আলাদা
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
মানুষের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। শত শত বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক এ রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গঠিত এসব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য পরিচালনা করতো রাজা ও সম্রাটগণ। তারা শক্তির জোরে একেকটা অঞ্চল দখল করে রাষ্ট্র গঠন করে জনগণের ওপর তাদের একক শাসন কায়েম করতো। সম্রাট বা রাজারা তার একদল রাজন্যবর্গ দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করতো। তারা নিজেদের স্বার্থে নিজেদের মতো করে আইন করেই রাষ্ট্র শাসন করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিশ্বে রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনায় যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি নতুন নতুন মডেলও প্রয়োগ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমরা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফত কায়েম করেছে, তেমনিভাবে সেক্যুলার ও পুঁজিবাদীরা গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অপরদিকে কমিউনিস্ট চিন্তাধারায় প্রভাবিত লোকজন নাস্তিক্যবাদী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভিন্ন চিন্তা ও মতের রাষ্ট্রনায়করা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের শান্তি সমৃদ্ধি ও কল্যাণের চেষ্টা চলছে। এসব শাসন ব্যবস্থারও বিভিন্ন পদ্ধতি ও মডেল যেমন উদ্ভাবন করা হয়েছে, তেমনি তার প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে এসব শাসন ব্যবস্থা ও মডেল বাস্তবায়ন করে সাধারণ জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ ও শান্তি নিশ্চিত করার কোশেশ করা হয়েছে। যেমন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কোনো রাষ্ট্র রাজার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক মডেল আবার কোনো রাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট শাসিত মডেল। তেমনিভাবে মুসলিম বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও শাসন ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মডেল রয়েছে। শাসন পদ্ধতির এসব মডেল প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়েছে রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা ও সর্বাধিক কল্যাণের নিমিত্তে। তারপরও অনেক দেশেই এসব মডেল যেমন সফল হয়েছে, কোনো কোনো দেশ ব্যর্থও হয়েছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদরা কোন কোন শাসন ব্যবস্থা ও মডেল বেশি জনবান্ধব ও কল্যাণকর, তা নিয়ে চিন্তা গবেষণা ও প্রয়োগ করেই যাচ্ছেন।
বিশ্বের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়করা দেশ ও জনগণের কল্যাণের নিমিত্তে বিভিন্ন মডেলের শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন এবং প্রয়োগ করেছেন। একটি দেশের নিজস্ব মডেলে প্রণীত শাসন পদ্ধতি অনুসরণ করেই দেশ শাসন তথা পরিচালনা করে থাকে। বিভিন্ন মডেল উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যই হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এমন অনেক দেশ আছে রাষ্ট্রের শাসন পদ্ধতিকে দাবি করা হয়েছে উন্নত মডেলের, কিন্তু দেশ ও জনগণের উন্নয়ন তো হয়নি, বরং দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গেছে এবং সাধারণ জনগণ স্বাভাবিক জীবনধারণ করতেই হিমশিম খাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশ বিগত ৫৪ বছরে অনেক শাসন মডেল প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু না হয়েছে দেশের উন্নয়ন আর না হয়েছে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কল্যাণ। পাশের দেশ ভারতে বিগত ৭৫ বছর ধরে সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ভারতে কী সাধারণ জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। বরং ভারত প্রজাতন্ত্র নামক রাষ্ট্রটি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তাও দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংসদীয় মডেলে বাংলাদেশ সফল হতে পারেনি
বাংলাদেশেও উন্নয়ন, শান্তি, সমৃদ্ধি ও জনগণের নিরাপত্তা এবং কল্যাণার্থে বিগত ৫৪ বছরে কোনো সময় প্রধানমন্ত্রী তথা সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও আবার কোনো সময় প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থার প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো মডেলেই বাংলাদেশের আপামর জনগণের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরং প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছেই। শাসন পদ্ধতির পরিবর্তনের পাশাপাশি শাসক ও শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন করেও জনগণ তার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ও কল্যাণ পায়নি। বাংলাদেশে এখনো এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষের নিজস্ব বাসস্থান নেই, সাধারণ জনগণের চিকিৎসার নিশ্চয়তা নেই। বরং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রে সুশাসন তো নেই, বরং প্রতিনিয়ত দুর্নীতি বাড়ছে। অপরদিকে রাষ্ট্র সরকার প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। এতে করে দেশে ধনী-গরিবের ব্যবধান না কমে বরং বৈষম্যই বাড়ছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোর এ সংকট ও দুর্বলতা অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনেও তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন ২০২৫ ভবিষ্যতের পথরেখা বইয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ পটভূমি অধ্যায়ে ১ম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মহান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতিকে ধারণ করে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের যে আকাক্সক্ষা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৪ বছরেও তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সংহতি বিকাশের ধারা বার বার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। ওই বছরই এক সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার পতন ঘটে। নানামুখী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের ফলে ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ আবারও গণতন্ত্রে প্রবর্তন করে। কিন্তু সেই গণতন্ত্রিক অভিযাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যে কারণে বিগত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রের সাংিবধািনক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা যায়নি এবং এগুলো অত্যন্ত ন্যুব্জ ও দুর্বলভাবে কাজ করেছে।’
ব্যর্থতার কারণ কী?
দেশটিতে সুশাসন ও উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতি ও দরিদ্রতা বৃদ্ধির কারণ কী? তার পর্যালোচনা রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের যেমন করা উচিত, তেমনিভাবে রাজনীতিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদেরও তা নির্ধারণে যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। অধিকাংশ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অভিমত, বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে দেশটির রাষ্ট্র ও সরকারের শাসন কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের সংকট। বিগত ৫৪ বছরের পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে, দেশটির রাষ্ট্র ও সরকারের শাসন পদ্ধতি ও কাঠামোর কারণে পুরো ক্ষমতা এক ব্যক্তি ও একটি শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত হয়ে আছে। বিদ্যমান শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় রাষ্ট্রের যে তিনটি বিভাগ রয়েছে সব বিভাগ এক ব্যক্তির কাছে জিম্মি। গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যিনি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, তিনি একসাথে যেমন সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের প্রধান, তেমনিভাবে তিনি আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদেরও নেতা। যার কারণে নির্বাহী বিভাগ জাতীয় সংসদের কাছে যথাযথ জবাবদিহির মধ্যে আসছেন না। একটি ছদ্মনাম দিয়ে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। যেমন মি. ‘ক’, যিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই জাতীয় সংসদের নেতা নির্বাচিত হন। ঐ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দলটি মি. ‘ক’কেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করছেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন। জাতীয় সংসদও নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন। কিন্তু মি. ‘ক’ যখন একই সাথে নির্বাহী বিভাগের প্রধান ও আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদের প্রধান, তখন তো যথাযথ জবাবদিহি হওয়ার কথা নয়। তাই বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগকে কোনো সময়ই জাতীয় সংসদ যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনি। যদি মি. ‘ক’ জাতীয় সংসদ নেতা আর মি. ‘খ’ নামক এক ব্যাক্তি যদি প্রধানমন্ত্রী হতেন মি. ‘ক’ তখনই মি. ‘খ’ কে জবাবদিহি করতে পারতেন। তাই ব্রিটিশ মডেলের আংশিক পদ্ধতি অনুসারে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাহি বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারছে না। আমাদের দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতিতে আইন প্রণয়ন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ পৃথক না থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন হচ্ছে, তেমনিভাবে যথাযথ জবাবদিহিও গড়ে উঠছে না। তাই সুশাসনের পরিবর্তে অপশাসন ও দুর্নীতিই বাড়ছে। তাই বাংলাদেশে প্রতি দশকেই একজন করে স্বৈরাচার জন্ম নিচ্ছে। বিগত পাঁচ দশকে বেশ কয়েকজন স্বৈরাচারের উদ্ভব হয়েছে, তাদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে।
ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রয়োজন দুই বিভাগ পৃথকীকরণ
রাষ্ট্রের শাসন পদ্ধতিটা যদি এমন হতো যে আইন বিভাগের প্রধান তথা জাতীয় সংসদের নেতা নির্বাহী বিভাগের প্রধান হতে পারবেন না। যেটা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রয়োগ করা হয়েছে। তখন ঠিকই নির্বাহী বিভাগের প্রধান জাতীয় সংসদের কাছে যথাযথ জবাবদিহি করতে বাধ্য হতেন। আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদ নির্বাহী বিভাগের ওপর যথাযথ জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারতেন। তাই নির্বাহী বিভাগকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে হলে অবশ্যই আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদকে নির্বাহী বিভাগ তথা সরকার থেকে পৃথক করতে হবে। দুই বিভাগের প্রধান একই ব্যক্তির পরিবর্তে দুজনের ওপর দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।
একটি দেশের আইন প্রণয়ন বিভাগের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংসদ সদস্য যখন নির্বাহী বিভাগের মন্ত্রী হন, তখন আইন বিভাগটি যেমন দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি নির্বাহী বিভাগও তখন আইন বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করে। সাধারণত আইনপ্রণয়ন বিভাগ তথা সংসদের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ সদস্যরাই নির্বাহী বিভাগের মন্ত্রী হয়ে থাকেন। তাই আইন বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ওপর তার কর্তৃত্ব হারায়, তখন জবাবদিহি থাক, দূরের কথা নজরদারির চিন্তাও করতে পারে না।
মার্কিন সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা জেমস ম্যাডিসনের মতে, ‘ক্ষমতা ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।’ তাই আইনপ্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ অপরিহার্য। গার্নারের মতে, আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ না হলে সাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। তাই আধুনিক বিশ্বে অনেক দেশেই এখন নির্বাহী বিভাগ আইন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সর্বোপরি জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন আনতে হলে এ দুই বিভাগকে পৃথক করতে হবে।
যেসব দেশে আইনপ্রণেতারা নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বে নেই
বিশ্বের একক পরাশক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ ব্রাজিল, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোয় আইন বিভাগ থেকে নির্বাহী বিভাগকে পৃথক করা হয়েছে। বিশ্বে যেসব দেশে আইনপ্রণেতারা (Legislators) নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বে থাকে না, সেসব দেশে সাধারণত Presidential System বা শক্তিশালী ক্ষমতার বিভাজন (Separation of Powers) বিদ্যমান। এ ধরনের ব্যবস্থায় আইনপ্রণয়ন তথা সংসদ (Legislature) ও সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ (Executive) পরস্পর থেকে পৃথক। যেসব দেশে প্রেসিডেন্টই নির্বাহী বিভাগের প্রধান এবং তিনি আইনসভা বা পার্লামেন্টের তথা সংসদ সদস্য হন না। অন্যদিকে মন্ত্রীরাও সংসদ সদস্য হন না, হওয়ার সুযোগই নেই এবং হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। নির্বাহী বিভাগের কোনো দায়িত্ব তথা মন্ত্রী হতে হলে তাকে আইন বিভাগ তথা সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সংসদের সদস্য নন, তেমনিভাবে আইন প্রণয়ন বিভাগ তথা কংগ্রেসের সদস্যরা নির্বাহী দায়িত্ব নেন না। ব্রাজিল, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, চিলি, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, বতসোয়ানা ও উগান্ডার মতো অনেক দেশের প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হন না। এসব দেশে আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কঠোর ক্ষমতার বিভাজন করা হয়েছে। এভাবে বিশ্বের অনেক দেশেই প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির দেশগুলোয় আইনপ্রণেতারা নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বে থাকে না।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ পৃথক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত, যা দেশব্যাপী নীতি ও আইনপ্রণয়নের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে আইনপ্রণেতারা (Congress সদস্যরা) নির্বাহী বিভাগের কোনো পদে থাকতে পারেন না। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের Article I, Section 6, Clause ২-এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এটি Incompatibility Clause/অযোগ্যতা ধারা নামে পরিচিত। ধারাটিতে বলা হয়েছে যে, কংগ্রেসের কোনো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ‘Office under the United States’ অর্থাৎ নির্বাহী বা বিচার বিভাগের কোনো পদে একই সময়ে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। সহজভাবে এটাই বলতে হবে, একজন ব্যক্তি একসাথে আইনপ্রণেতা (Legislator) এবং নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা (Executive Officer) হতে পারবেন না।
৫০টি স্টেট তথা রাজ্যের সমন্বয়েই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রাষ্ট্রটি যেমন তিনটি বিভাগ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তেমনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যের শাসন কাঠামোয় তিনটি প্রধান বিভাগ রয়েছে – আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ।
প্রতিটি রাজ্য নিজস্ব সংবিধান, আইন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা (যেমন, পৌরসভা) দ্বারা পরিচালিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অধীনস্থ হলেও কিছু ক্ষেত্রে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রাখে। এই ব্যবস্থা ‘ফেডারেলিজম’ নামে পরিচিত, যেখানে ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে ভাগ করা হয়।
আইনসভা : প্রতিটি রাজ্যে একটি আইনসভা থাকে, যা রাজ্য পর্যায়ের আইনপ্রণয়ন করে। এটি সাধারণত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হয়, যেমন সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ।
নির্বাহী বিভাগ : রাজ্যের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন একজন গভর্নর, যিনি রাজ্য প্রশাসনের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে নির্বাহী বিভাগ অন্যান্য বিভাগের সাথে সমন্বয় সাধন করেন।
ইরানেও পার্লামেন্ট নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক
ইরানের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ধর্মীয় নেতার তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েকটি সংস্থা ও পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তন্মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় নেতা, প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগ, অভিভাবক পরিষদ, মজলিস তথা পালামেন্ট, বিশেষজ্ঞ পরিষদ।
ইরানের ধর্মীয় নেতাই হচ্ছেন সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader)। তিনিই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করেন। বিচার বিভাগের প্রধান এবং রাষ্ট্রের প্রধান গণমাধ্যম নেটওয়ার্কের প্রধানকেও তিনিই নিয়োগ করেন। দেশের সার্বিক নীতিনির্ধারণ এবং তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা তার কাছে। বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা তাকে নির্বাচিত করেন।
বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) : সাধারণ জনগণের ভোটে ইরানে ৮৬ জন ধর্মীয় পণ্ডিতের সমন্বয়ে এ বিশেষজ্ঞ পরিষদ গঠিত। এ নির্বাচিত সংস্থার সদস্যরাই দেশটির প্রধান ধর্মীয় নেতা নির্বাচন, তত্ত্বাবধান এবং প্রয়োজনে অপসারণ করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট (President) : সর্বোচ্চ নেতার পরে প্রেসিডেন্ট হলেন দেশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তিনি সরকার প্রধান এবং নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনগণের সরাসরি ভোটে চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং পরপর দু’বার নির্বাচিত হতে পারেন। মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন এবং এর সভাপতিত্ব করেন।
আইনসভা (Legislature) : ইরানের আইনসভা দুটি পরিষদ নিয়ে গঠিত : একটি হচ্ছে ইসলামিক পরামর্শক পরিষদ তথা পার্লামেন্ট (Islamic Consultative Assembly বা Majlis), এটি ২৯০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। এটি এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, যারা চার বছরের জন্য জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন।
অপরটি হচ্ছে অভিভাবক পরিষদ (Guardian Council) : এটি সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম। মজলিস তথা পার্লামেন্টের পাস করা যেকোনো আইন ইসলামী আইন ও সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা খতিয়ে দেখে। এ পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১২ জন। তাদের মধ্যে ৬ জনকে নিয়োগ করেন ধর্মীয় নেতা এবং বাকি ৬ জন আইনজ্ঞকে পার্লামেন্ট থেকে নির্বাচন করা হয়ে থাকে। এ অভিভাবক পরিষদ প্রেসিডেন্ট, সংসদ সদস্য এবং বিশেষজ্ঞদের পরিষদের প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে মনোনয়নের সনদ দিয়ে থাকে। কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স সবসময় পার্লামেন্টের ওপর নজর রাখে। প্রভাবশালী এ পর্ষদ পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইন শরিয়া আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা বা সাংঘর্ষিক কিনা, তা যাচাই করে।
ইরানের শাসন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার তত্ত্বাবধানে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রধান ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রাধান্য থাকে।
ইরানের সংবিধানের ৫৭ নম্বর ধারা (Article 57) অনুযায়ী আইন বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক। এ ধারায় বলা হয়েছে যে, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রে আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ পরস্পর থেকে স্বাধীন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৭-ই আইন বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সাংবিধানিক ভিত্তি। ইরানের মজলিস তথা পার্লামেন্ট সদস্যরা সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হতে পারবেন না। নির্বাহী বিভাগের মন্ত্রী হতে হলে তাকে আইনসভা থেকে পদত্যাগ করতে হবে। অপরদিকে মন্ত্রীদের পার্লামেন্ট সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক না। তবে ইরানের সংবিধানের ৭০ ধারাবলে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীবর্গ পার্লামেন্টের অধিবেশনে যোগদানের অধিকার দিয়েছে। অপরদিকে পার্লামেন্টের সদস্যরা যদি মনে করেন রাষ্ট্রের কোনো বিষয়ে তারা মন্ত্রীদের থেকে জানতে চান তখন তারা পার্লামেন্টে যোগদান করতে বাধ্য।
পৃথককরণে বিশেষজ্ঞদের মতামত
ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা মন্টেস্কুর মতে, ‘যদি আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী ক্ষমতা একই ব্যক্তির বা একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তবে স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়।’ তিনি বলেন, আইনপ্রণয়ন বিভাগকে অবশ্যই নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখতে হবে, নইলে স্বৈরাচার জন্ম নেয়। জন লক মনে করতেন, আইন প্রণয়ন বিভাগ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর হলেও এ বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গেটেল বলেন, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি আইন তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করে তবে জনগণের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। সুতরাং দুটি বিভাগের পৃথক অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অভিমতে আইনপ্রণয়ন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। এ পৃথকীকরণ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং স্বৈরশাসন প্রতিরোধ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানসহ অনেক দেশ তার জ¦লন্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশে আইন বিভাগের পৃথকীকরণ প্রয়োজন
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করে আর ঐ দলের সিনিয়র সদস্যরাই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়ে থাকেন। তাই ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদের মধ্যে সিনিয়র ৫০-৫৫ জন এমপি মন্ত্রী মনোনীত হন যারা প্রধানত দায়িত্ব পালন করেন রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে। তখন তারা সরকার পরিচালনা তথা নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেই অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন। এতে করে আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদে উনারা যেমন সময় দিতে পারেন না, তেমনিভাবে আইন বিভাগও তাদেরকে যথাযথভাবে পায় না, তাই সংসদ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এমপিদের জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন নিয়েই কাজ করা প্রয়োজন। এমপিদের মন্ত্রীত্ব নয় আর মন্ত্রীদের এমপি হতে হবে এ বিধান বাতিল করা দরকার। এ বিষয়ে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ যদি পৃথক থাকতো তখন এমপিদের মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থাকত না। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর সিনিয়র সদস্যরা এমপি না হলেও নির্বাহী বিভাগে মন্ত্রী হতে পারতেন। তখন এমপি হওয়ার জন্য বর্তমানে যে ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা তা অনেকাংশে হ্রাস পেতো।
তাই বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাহী বিভাগকে আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদ থেকে আলাদা করতে হবে। সাধারণ জনগণসহ সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগ তথা শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। তাই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে তথা আপামর জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে উন্নীত করতে হলে আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদ থেকে নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারকে পৃথক করতে হবে ।
ইমেইল: [email protected]