সম্পাদকীয়

ছাত্র সংসদ নির্বাচন : নতুন বাংলাদেশ গড়ার শুভ সূচনা

একেএম রফিকুন্নবী
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৪৪

একেএম রফিকুন্নবী

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দেশে থেক পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের চেষ্টায় শিক্ষাব্যবস্থায় কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সুফল ফলতে শুরু করেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শেখ হাসিনার আমলে র‌্যাগিং, গেস্টরুম অপকালচারের নামে ছাত্রলীগের মাস্তান তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছিল। ভিন্নমতের প্রকাশ, ভারতের আধিপত্যবাদের প্রতিবাদ ও ইসলামের পক্ষে কথা বললেই তাকে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হতো। নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নির্যাতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু বকর, বুয়েটের আবরার ফাহাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানীসহ আওয়ামী লীগের বিগত দেড় দশকে নিহত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। আওয়ামী লীগের দেড় দশকে ছাত্রলীগের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ৩৯ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এখানে শুধু উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডগুলো এসেছে। অনেক ঘটনাই মামলা-হামলা ও হয়রানির ভয়ে নিহতদের পরিবার প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো, গত ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ (চবি) দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে লাশ হয়েছেন ২৪ শিক্ষার্থী। এ ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ জন, রাজশাহীতে ৫ জন, ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জন, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ জন। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো ৩ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের ১৭টি ঘটেছে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে।
আমরা জানি, দেশের কারাগারগুলো পরিণত হয়েছিল ভিন্নমত দলনের টর্চার সেলে। প্রকাশ্য কারাগারের বাইরেও ছিল আয়নাঘর নামের অনেক অদৃশ্য টর্চার সেল। ইতালির বিখ্যাত সাহিত্যিক ভিক্টোর হুগো বলেছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা খোলা মানে একটি কারাগারের দরজা বন্ধ হওয়া। কিন্তু হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে গড়েছিলÑ যাতে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে কারাগারে যাওয়ার উপযোগী হয়। ছাত্রলীগের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশেষ করে সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে অনেক ষড়যন্ত্রের পরও ছাত্রলীগের ভরাডুবির পর আর কোনো প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নাম পর্যন্ত মুখে আনতে দেয়নি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার। অথচ আমরা জানি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। যা জাতীয় রাজনীতির জন্য ইতিবাচক। ছাত্ররাজনীতি সন্ত্রাসমুক্ত হলে পরমতসহিষ্ণুতার মানবিক গুণসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি হয়।
তাই আমরা বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংসদগুলোকে সক্রিয় করার ইতিবাচক ভূমিকার জন্য। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং প্রতিটি ছাত্র, রাজনৈতিক দল এবং প্রত্যেক দেশপ্রেমিক নাগরিক সচেষ্ট হবে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিতব্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো প্রভাবমুক্তভাবে সম্পন্ন করতে। তাদের ইতিবাচক মনোভাব ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফেরানো অসম্ভব। অন্যদিকে তারা সচেষ্ট হলেই পরাজিত শক্তির সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের যে আয়োজন চলছে, এর মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় বাস্তবায়নের শুভ সূচনা হবে।